ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

ঢাকা ওয়াসার টপ ম্যানেজমেন্টে শূন্যতা প্রশাসনের সর্বস্তরে লেজেগোবরে অবস্থা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ব্যস্ত থাকেন বিদেশ সফর আর সভা-সেমিনার নিয়ে। ফলে ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাই দায়িত্ব পালন করেন। নিয়ম অনুযায়ী ডেপুটি ব্যবস্থপনা পরিচালক (ডিএমডি) থাকার কথা ৪ জন। আছেন মাত্র এক জন। তাও তিনি ডেপুটেশনে এসেছেন। নেই প্রধান হিসাব কর্মকর্তা। প্রধান প্লানিং অফিসারও না থাকার মত। ৭ জন ডেপুটি সেক্রেটারীর জায়গায় দৃশ্যমান মাত্র ২ জন।

এই চিত্রটি নাগরিক সেবার জন্য খ্যাত প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার! এক কথায় জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা সেক্টরের টপ মেনেজমেন্ট বলতে কিছুই নেই। অনেকটা লেজেগোবরে অবস্থা বিরাজ করছে প্রশাসনের সর্বস্তরে। সর্বক্ষেত্রে শূন্যতা বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে লোক না থাকায় কাজকর্মে দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেখানে উর্ধ্বতন প্রয়োজনীয় জনবলই নেই সেখানে সেবা নিশ্চিত হবে কিভাবে? প্রশাসনের এই লেজেগোবরে অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্লানিং, প্রজেক্ট বাস্তবায়নসহ অনেক কিছুই হচ্ছে না। ভেতরে বাইরে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ঢাকা ওয়াসা চালায় কে? ওয়াসার প্রশাসনে এমন স্থবিরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বোর্ড চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক দুই জনেই বিষয়টি একে অপরের উপর দায় চাপিয়ে দেন। একজন বলেন এটি বোর্ডের দায়িত্ব আর অন্যজন জানান এটি এমডিই ভালো জানতে পারেন।

ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তার সাথে এ নিয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যান ড. প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফার নিয়ন্ত্রণেই সবকিছু। প্রশাসনিকভাবে তার এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকারী না থাকলেও সরকার দলীয় লোক হওয়ায় তিনিই সব সিদ্ধান্ত নেন। এমডিও এখানে গৌণ।

ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপক (ডিএমডি) পদ রয়েছে ৪টি। এগুলো হচ্ছে ডিএমডি প্রশাসন (এডমিন), ডিএমডি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (ও এন্ড এম), ডিএমডি গবেষণা-পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (আরপিডি) এবং ডিএমডি বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক (অর্থ)। এখন বর্তমানে মাত্র একজন ডিএমডি পদে আছেন। তাও তিনি ডেপুটিশনে (যুগ্ম সচিব) এসেছেন। ওয়াসার কাজ তেমন একটা বুঝেন না বলে প্রচার রয়েছে। 

জানা গেছে, ডিএমডি অর্থ পদে সর্বশেষ সৈয়দ গোলাম আহমদ দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরীর বয়স সীমা পার হবার পরও তাকে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। প্রায় দুই মাস আগে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। আরপিডিতে সর্বশেষ ছিলেন ড. প্রকৌশলী মো: লিয়াকত আলী। ৪ মাস আগে তিনিও অবসরে যান। ডিএমডির ওএন্ডএম পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানি পরিশোধন, উৎপাদন বৃদ্ধিসহ নাগরিক সেবার মূল কাজটিই এখান থেকে করা হয়। এখানে বছর খানেক ধরে কেউই নেই। ডিএমডি প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটিশনে আসা মো: মাহবুবুর রহমান। প্রধান হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে আশিক আবদুল বাকি সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ এক বছরের মত পদটিতে কেউ নেই। ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পদ হ&&চ্ছ আরপিডি। গবেষণা, প্রজেক্ট বাস্তবায়ন, বিদেশীদের কাছে প্রজেক্ট তুলে ধরাসহ ওয়াসার উন্নয়নমূলক কাজের তদারকি করা হয় এখান থেকে। পদটিতে কেউ না থাকায় উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। সূত্র জানায়, ডেপুটি সেক্রেটারী থাকে ৭ জন। এখন আছেন মাত্র ২ জন। এর মধ্যে একজন অবসরে যাওয়ার পথে।

ওয়াসার টপ ম্যানেজম্যান্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে কোন লোক না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। চীফ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় তিনটি দায়িত্বে আছেন। তিনি তার মূল দায়িত্বের পাশাপাশি ডিএমডি ফাইন্যান্স এবং প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করছেন। অথচ প্রধান হিসাব রক্ষণকর্মকর্তার পদটি প্রমোশন যোগ্য। কিন্তু এখানে কাউকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। প্রধান প্রকৌশলী এসডিএম কামরুল আলম চৌধুরী তার মূল দায়িত্বের পাশাপাশি ওএন্ডএম এবং আরপিডিরও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে লোক না থাকায় ওয়াসার আর্থিক কোন সাশ্রয়ও হচ্ছে না। বরং ক্ষতির দিকটাই বেশী। এ ছাড়া নাগরিকরা তাদের প্রয়োজনীয় সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এসব পদে যাদের কাজ করার কথা তাদের পদোন্নতি না দেয়ার কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেকেই অভেযোগ করেছেন, দলীয় লোকদের বসানোর জন্যেই এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। মাস দুয়েক আগে কয়েকটি পদের বিপরীতে তড়িগড়ি করে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। কোন রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়াই এখানে ওএন্ডএম পদে আবারো মো: লিয়াকত আলীকে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে ওয়াসায় ক্ষোভ দেখা দেয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্রটিসহ ক্ষোভের মুখে নিয়োগ বাতিল করতে বাধ্য হয় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, ওয়াসার ভেতরে দায়িত্বপালনকারী সিনিয়র অফিসারদের তোপের মুখে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য হয়। এমনকি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বিতর্কিত বোর্ড চেয়ারম্যানকে বাদ দেয়া হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হলেও নিজের পছন্দের কাউকেই নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার দলীয় বোর্ড চেয়ারম্যান। 

একদিকে টপ ম্যানেজম্যন্টের অনুপস্থিতি অন্যদিকে এমডির বিদেশ সফর ও সভা সেমিনার নিয়ে ব্যস্ততা থাকার প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যে কাজটি এক সপ্তাহের হবার কথা সেটি কয়েক মাসেও হচ্ছে না। এক হিসেবে দেখা যায়, বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই এমডি বিদেশে থাকেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, শূন্য পদ পূরণের দায়িত্বতো আমার না। এটা ওয়াসা বোর্ডের ব্যাপার। পদ গুলো যখন পূরণ হবে তখন সবাই দেখবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে তো চেয়ারম্যানকে বাদ দেয়া হয়েছে তাহলে তিনি কিভাবে বিষয়টি দেখবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। আমি মিটিংয়ে আছি।  

এ ব্যাপারে ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফা এ প্রতিবেদককে বলেন, এটা নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? এমডিকে জিজ্ঞেস করুন। এমডিতো আপনার কাছে জানতে বললেন, এটা জানানোর পর তিনি বলেন, আমি যতটুকু জানি ওয়াসার শীর্ষ এ পদগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের একজন এডিশনাল সেক্রেটারীর নেতৃত্বে একটি কমিটি হয়েছে। তারাই নিয়োগের ব্যাপারটি দেখবেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বোর্ড চেয়ারম্যান নেই কেন জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য না করে বলেন আমি মিটিংয়ে আছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ