ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন করা কঠিন হবে -সাখাওয়াত

স্টাফ রিপোর্টার : অশ্রু সিক্ত নয়নে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে বিদায় নিলেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বিদায়ের আগে তিনি ৫ বছরের কাজের মূল্যায়ন করেন এবং নিজের সম্পদের হিসাব দেন।

গতকাল মঙ্গলবার বিদায়ের সময় আরএফইডি'র (রিপোর্টার্স ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি) পক্ষ থেকে বিদায়ী এ কমিশনারের হাতে ফুল তুলে দেন সাংবাদিকরা।

এ সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বারবার চোখ মুছে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করেন এবং এক সময় বলে ওঠেন, ‘এই ৫ বছরে এটাই আমার প্রাপ্তি।

তিনি বলেন, ‘আজ আমার মেয়াদের ৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৭ সালের এ দিনেরই এক বিকেলে আমি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কমিশনে যোগ দিয়েছিলাম। আমার এক সপ্তাহ আগেই বিদায়ী নির্বাচন কমিশনাররা ইসিতে আসেন এবং একই ব্যবধানে বিদায় ও নিলেন।'

শেষ কর্মদিবসে এসে বিদায়ী এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নতুন কমিশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলে বিপদে পড়তে পারেন। তাদের উচিত হবে পুরনো কমিশনের অর্জন ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়া।'

তিনি বলেন, কাউকে নির্বাচনে ‘ইন্টারফেয়ার' করার সুযোগ দিলে নির্বাচন কখনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। বরং এতে কমিশনের প্রতি মানুষের এখন যে রকম আস্থা আছে তা কমতে শুরু করবে।'

বিদায়ী কমিশনের অপর দু' কমিশনারের মতের সঙ্গে গলা মিলিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলে বিদ্যমান ব্যবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন করা কঠিন হবে। এমপিরা স্বপদে বহাল থাকলে তারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেন। বর্তমান সংবিধানের অনেক কিছুই পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।'

নিজের অতৃপ্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাখাওয়াত বলেন, ‘ঢাকা সিটি নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জ নিতে পারিনি। সারাদেশের সার্ভার স্টেশনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সার্ভারের সংযোগ দেখে যেতে পারলাম না। আর কমিশনের নিজস্ব ভবনের গোড়াপত্তনও করে যেতে পারলাম না। এটাই অতৃপ্তি।'

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সদস্য পদ বাতিল করতে না পারা অতৃপ্তি কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এটা আদালতের বিষয়। বিজ্ঞ আদালত যে রায় দিয়েছেন তা সবাইকে মানতে হবে। তবে আমরা শুরু করতে চেয়েছিলাম। এটা হলে হয়তো ভালো হতো।'

২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল উল্লেখ করে বিদায় বেলায় সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সেই সময় ত্রিমুখী চাপের মধ্যে কাজ করেছি। রাজনৈতিক দলদুলোর ঐকমত্য হচ্ছিল না। তৎকালীন সরকারের মধ্যেও দু'ভাগ হয়ে গিয়েছিল। অন্তত দু'বার আমি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে নির্বাচন করার পথে ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকায় দু'বারই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসি।'

এ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ২০০৮-এর ডিসেম্বরে এক নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি, অন্য নেত্রীর সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হওয়ার যোগফল হচ্ছে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন!' অবসর জীবনে বই লিখবেন বলেও জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের শেষ মুহূর্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে সরকারের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কাজ করতে গেলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটেও থাকে।সার্বিকভাবে সরকারের সহযোগিতায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে এ প্রতিষ্ঠানকে আজ আমরা চাইলেও এতো উপরে নিয়ে আসতে পারতাম না।'

সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার সহযোগিতা ছাড়া কোনও নির্বাচনই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে গিয়ে আমরা সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, সামরিক বাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসার বাহিনীর সহযোগিতা পেয়েছি। বিশেষ করে অনেক কঠিন কাজ করতে গিয়ে শামসুল হুদা ও ছহুল হোসাইনকে অনেক সময় চাপ দিয়েছি। এজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।'

 

সম্পদের হিসাব দিলেন:

নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়াদ শেষ পর্যন্ত গত ৫ বছরে নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদের বিবরণী সাংবাদিকদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন।

স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব অনুযায়ী মোট ৯১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র গচ্ছিত রয়েছে। বর্তমানে কর প্রদত্ত গচ্ছিত অথের্র মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র বাবদ মোট ৫৩ লাখ টাকা জমা আছে।

এর মধ্যে ট্রাস্ট ব্যাংকে ৪৪ লাখ ও সোনালী ব্যাংকে ৯ লাখ টাকা। অর্থ প্রাপ্তির উৎস  দেখিয়েছেন-আট বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র বাবদ গচ্ছিত ১৩ লাখ টাকা থেকে পাওয়া অর্থের পরিমাণ-৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কমিশনার হিসেবে গত ৫ বছরের বেতনভাতা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ৩০ লাখ টাকা, বাড়ি ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সেনাবাহিনী থেকে পেনশন ভাতা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ৫ লাখ ও বই বিক্রি বাবদ মোট অর্জিত আয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এসব উৎস থেকে প্রাপ্ত মোট অর্থের পরিমাণ ৮৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

 

২০১২-১৩ অর্থ বছরে প্রদর্শিত অর্থ :

ডিওএইচএস এ ৫কাঠা জমির নির্মাণ সংস্থাকে আংশিক বিক্রির অগ্রিম বাবদ ৫৫ লাখ টাকা প্রাপ্ত হতে ৪০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র কেনা, শেয়ার বাজারে ১১ লাখ টাকা এবং বরিশালের পৈত্রিক ভিটা বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ৪২ লাখ টাকা (এর মধ্যে ২ হাজার ব্যয় হয়েছে)।

টেলিফোন/ চিকিৎসা ও ভ্রমণ (দেশ-বিদেশ) :

ইসিতে দায়িত্বকালীন ৫ বছরে চিকিৎসা বাবদ ৮ হাজার ৪০০ টাকা, টেলিফোন বিল ১৫ হাজার ২০০ টাকা, দেশে ভ্রমণ বাবদ ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা এবং বিদেশে ভ্রমণ বাবদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৮০১ টাকা। গত বছরের অর্জিত অর্থ থেকে কর কর্তন করেছে ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭ হাজার, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২১ হাজার ৪০৩ টাকা, ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ২০ হাজার ১৯১ টাকা এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৯১ টাকা নিয়ে মোট কর কর্তন হয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার  টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ