ঢাকা, বুধবার 16 MAY 2012, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল' উপন্যাস প্রকাশে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা

স্টাফ রিপোর্টার : জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিতব্য ‘দেয়াল' উপন্যাস প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হাইকোর্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে ভুল তথ্য সংশোধনী না করা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ‘ভুল সংশোধনের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না' জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। সরকারের তথ্য সচিব, শিক্ষা সচিব ও সংস্কৃতি সচিবকে আগামী ১২ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সরকারের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ভুল তথ্যের বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন।  এরপর গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ স্বতপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

আদালত বলেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তিনি বর্তমানে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার ওপরে আদেশ দিয়ে তাকে আমরা বিব্রত করতে চাই না। আবার নতুন প্রজন্ম ভুল ইতিহাস জানুক সেটাও চাই না। যেমন বিষাদ সিন্ধু যেভাবে আছে জনগণ সেটাই জানে।

এ কারণে আদালত শিক্ষা, তথ্য ও সংস্কৃতি সচিবকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ও সাক্ষ্য বিবরণ হুমায়ূন আহমেদের কাছে সরবরাহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে তিনি ভুল সংশোধনের সুযোগ পান। 

সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এবিএম আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যা সম্পর্কিত ভুল তথ্য সংশোধনী না করা পর্যন্ত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল' উপন্যাস প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত।

প্রসঙ্গত, হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিতব্য রাজনৈতিক উপন্যাস ‘দেয়াল'-এর দুটি অধ্যায় গত ১১ মে দৈনিক প্রথম আলোর  সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হয়। এতে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের একটি বিবরণ রয়েছে।

সোমবার হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ তোলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গত সোমবার আদালতে এটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের ওই উপন্যাসে হত্যাকান্ডের বিবরণ যথাযথভাবে প্রকাশ পায়নি। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ তাদের মাঝখানে রাসেলকে নিয়ে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থরথর করে কাঁপছিল। ঘাতক বাহিনী দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকল। ছোট্ট রাসেল দৌড়ে আশ্রয় নিল আলনার পেছনে। সেখান থেকে শিশু করুণ গলায় বললো, তোমরা আমাকে গুলী করো না। শিশুটিকে তার লুকানো জায়গা থেকে ধরে এনে গুলীতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হলো।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ঘটনার একটি স্বীকৃত বিবরণ রয়েছে। তাতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে রমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে রাসেলকে হত্যা করা হয়।

মঙ্গলবার এটর্নি জেনারেলের উদ্ধৃতি দিয়ে আলতাফ হোসেন বলেন, হুমায়ূন আহেমেদের একটি অপ্রকাশিত বইয়ের পত্রিকায় প্রকাশিত অংশে ভুল তথ্য রয়েছে। প্রকৃত সত্য হলো বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে মায়ের কাছে যেতে চাইলে তাকে হত্যা করা হয়। সেই দৃশ্যের বর্ণনার কাছে বিষাদ সিন্ধুও হার মানায়। এই ভুল সংশোধন করা না হলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। শুনানি শেষে তিনি সচিবকে ভুল সংশোধনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

আদালত ডেপুটি এটর্নি জেনারেলকে সঠিক ইতিহাস জানতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পেপারবুক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে সহায়তা করতে বলেছেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, তার উপন্যাসে শেখ রাসেলের হত্যা করার বিষয়টি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

প্রথম আলোর ১১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেয়াল হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিতব্য রাজনৈতিক উপন্যাস। এ উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭৫ সালে ঘটে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ড ও অন্যান্য রাজনৈতিক ঘটনা। সাময়িকীর পাঠকের জন্য সুবিশাল এ উপন্যাসের দুটি অধ্যায় এখানে ছাপা হলো'

এর একটি অংশে বলা হয়, ‘ঢাকা মসজিদের শহর। সব মসজিদেই ফজরের আজান হয়। শহরের দিন শুরু হয় মধুর আজানের ধ্বনিতে। আজান হচ্ছে। আজানের ধ্বনির সঙ্গে নিতান্তই বেমানান কিছু কথা বঙ্গবন্ধুকে বলছে এক মেজর, তার নাম মহিউদ্দিন। এই মেজরের হাতে স্টেনগান। শেখ মুজিবের হাতে পাইপ। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি এবং ধূসর চেক লুঙ্গি।

শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কী চাও? মেজর বিব্রত ভঙ্গিতে আমতা-আমতা করতে লাগল। শেখ মুজিবের কঠিন ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিব আবার বললেন, তোমরা চাও কী?

মেজর মহিউদ্দিন বলল, স্যার, একটু আসুন।

কোথায় আসব?

মেজর আবারও আমতা-আমতা করে বলল, স্যার, একটু আসুন।

শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কাজ করতে পারেনি, সে কাজ তোমরা করবে?

এই সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে ছুটে এল মেজর নূর। শেখ মুজিব তার দিকে ফিরে তাকানোর আগেই সে ব্রাশফায়ার করল। সময় ভোর পাঁচটা চল্লিশ। বঙ্গপিতা মহামানব শেখ মুজিব সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লেন। তখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে তার প্রিয় পাইপ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ