ঢাকা, রোববার 21 October 2012, ৬ কার্তিক ১৪১৯, ৪ জিলহজ্জ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

সীমান্তে হত্যা-মৃত্যু বন্ধ হবে তো?

নাজমুল হক : বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে নতুন করে শুরু হয়েছে হত্যা। কোন আশ্বাসই মানছে না তাদের এই বাহিনী। কোন বিধিনিষেধ বা প্রতিবাদকে তোয়াক্কা না করে সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর হিংস্র পশুর মত আচরণ করছে তারা। বিগত দিনে বাংলাদেশীদের আটক করে চোখ তুলে নিলেও বর্তমানে পাখির মত গুলী করে হত্যা করছে মানুষদের। দেশের গণমাধ্যমগুলো ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর বিরুদ্ধে সোচ্ছার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ থেকেও বিজিবিসহ সরকার প্রতিবাদ করছে। ভারত সরকার বিভিন্ন সময় সীমান্তে হত্যা বন্ধ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও বিএসএফ সীমান্তের জওয়ানদের লেলিয়ে দিচ্ছে। সচিব পর্যায়ে আলোচনার সাথে সাথে হত্যা করে লাশ উপহার দিচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, লাভ হলো কি আলোচনায়? নাকি আলোচনার ফল হিসেবে তারা বাংলাদেশকে লাশ উপহার দিচ্ছে।

ভারত বাংলাদেশের বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের ৩০টি সীমান্তবর্তী জেলা ভারতের সাথে রয়েছে। এ সব জেলা দিয়ে দুই দেশের মানুষের বিনা পাসপোর্টে যাতয়াত রয়েছে। প্রতিদিন দুই দেশের হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পরিবার-পরিজন বা নিকট আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ সীমান্তে যে নির্যাতনের হলি খেলায় মেতে উঠেছে তাতে সে দেশের সচেতন মহল, মানবধিকার সংগঠন, বুদ্ধিজীবীদেরও হতবাক করেছে। তারা সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জিরো পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, হত্যা করছে। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুর সীমান্তে মিজানুর রহমানের চোখ উপড়ে হত্যা করে- যা পৃথিবীর জঘন্য ও ঘৃণ্য হত্যার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে, সীমান্তে মানুষ পরিবার নিয়ে নিরাপদ মনে করছে না। ৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা সীমান্তে ৩ জন বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে যায়। ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকে আটককৃতদের হাজির করা হয়। কিন্তু তারপরও আটককৃতদের ফেরত না দিয়ে ভারতীয় থানায় হস্তান্তর করে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের কুমিল্লার একটি সীমান্তে বিনা উস্কানিতে এক বাংলাদেশীকে যে ভাবে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে, ভারতীয় টেলিভিশনের ভিডিও ফুটেজ দেখে হতবাক হয়েছে সারা বিশ্ব। সভ্য সমাজের মানবতা যেন ভূলুণ্ঠিত হয়। সভ্যতার পিঠে চরম ছুরিকাঘাত করে বিএসএফ যে উল্লম্ফন করে, বাংলাদেশের নিরীহ নাগরিককে বিবস্ত্র করে যে ভাবে পিটিয়েছে, সেই ঘটনা গত ৯ ডিসেম্বর ২০১১-এর ঘটনা, অথচ আমাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী কিংবা কোন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে কখনো এর কোন ইঙ্গিত দেওয়া হয় নি। ঐ ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ হলে যতটা ভারতে তোলপাড় হয়েছে বাংলাদেশে তা হয় নি। চলতি বছরে একটি হিসেবে ৩১ জনকে বিনা বিচারে হত্যা করেছে বিএসএফ। কিন্তু তার পরেও যেন কোন প্রতিকার নেই।

সীমান্ত চোরাচালান হয় এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। দুই দেশের মানুষ চেরাচালানের সাথে জড়িত। তবে এর সাথে বাংলাদেশ ও ভারতের বড় বড় মাপের মানুষ জড়িত। বাংলাদেশী সীমান্তে তবে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষ যারা দু'বেলা দু'মুঠো খাবারের জন্য গরু আনতে ভারতে যায় তাদের হত্যা করা হয়। এ যাবৎকাল গরুর রাখাল ছাড়া বিএসএফ আর কারোর উপর নির্যাতন করতে পারেনি। কারণ বিএসএফের দাবীকৃত টাকা গরু রাখালরা দিতে পারে না। বাংলাদেশকে মাদকের আখড়ায় পরিণত করতে বাংলাদেশী সীমান্তে ১৫০ এর অধিক ফেন্সিডিলসহ কারখানা, দুই শতাধিক মদের কারখানা স্থাপন করেছে। যেখান দিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বড় বড় চালানের মাধ্যমে ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ীরা ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু সেখানে তারা আঘাত হানতে পারে না।

বাংলাদেশ ও ভারতে চোরাচালান প্রতিরোধে আইন আছে। আমি স্বীকার করি গরু আনতে ভারতে যায় বাংলার মানুষ। কিন্তু গরু চোরাচালানের অপরাধে কাউকে গুলী করে হত্যা করা হবে এমন আইন দু্ই দেশে নেই। ভারত থেকে গরুসহ মাদক আমাদের দেশে আসে। কিন্তু এখনও কোন মাদক ব্যবসায়ীকে সীমান্তে হত্যা করা হয় নি। আথচ ২ হাজার টাকার গরুর রাখালদের হত্যা করা হচ্ছে। আর প্রতিবাদ করলে পরদিন আবারও গুলী করা হচ্ছে।

আর এমনটা হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার কারণে। প্রতিবারই আলোচনার পরে লাশ পড়ছে, নিঃস্ব হচ্ছে সীমান্তের কোন না কোন গরীব, দিন আনা দিন খাওয়া মায়ের কোল। সংসার তছনছ হয়ে পড়ছে। কিন্তু কোন প্রতিকার নেই। তাদের দিকে কেউ দেখে না, কথা বলে না সরকার। তীব্র প্রতিবাদের ভাষা তাদের জানা নেই। কারণ এ সকল মানুষ যে গরীব। তারা নেতা নির্বাচন করতে ভোট দিতে পারে, প্রভাবিত হতে পারে, কিন্তু কাউকে প্রভাবিত করতে পারে না। ফলে কেউ তাদের দিকে দেখে না। ঈশ্বরও যেন তাদের দিকে চোখ তুলে তাকায় না।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে আনতে হবে পররাষ্ট্র নীতিতে। বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে। নতজনু পররাষ্ট্র নীতি পরিহার করে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করতে হবে। বিজিবিকে পাল্টা জবাব দিতে হবে।

 লেখক : রোভার মো. নাজমুল হক, রোভার স্কাউট, ই-মেইল :nazmulrover@gmail.com.

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ