ঢাকা, রোববার 21 October 2012, ৬ কার্তিক ১৪১৯, ৪ জিলহজ্জ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

৫৭টি মামলায় সাজা পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৮৫ খালাস ১০৫ জওয়ান

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : তৎকালীন বিডিআর সদর দফতর পিলখানাসহ  দেশের বিভিন্ন ইউনিটে বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআর আইনে দায়ের করা ৫৭টি মামলার বিচার কার্য শেষ হয়েছে। এ ৫৭টি মামলার ৬ হাজার ৪১ আসামীর মধ্যে ৫ হাজার ৯৮৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে। খালাস পেয়েছেন মাত্র ১১৫ জন। তারা তাদের চাকরি ফিরে পাবেন। সাজাপ্রাপ্তরা কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই সাজা শেষে বাড়িতে ফিরবেন।

এদিকে হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা দুটির বিচার কাজ চলছে পুরান ঢাকার বক্শী বাজারের উমেশ দত্ত রোডে স্থাপিত মহানগর দায়রা জজের অস্থায়ী আদালতে। এই দুটি মামলার আসামী ৮ শতাধিক। তাদের মধ্যেও বিদ্রোহ মামলার আসামী আছেন।

বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় বর্তমানে বিজিবির সদর দফতরে পরিণত। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি কথিত দাবি আদায়ের নামে পিলখানায় বিদ্রোহ শুরু করে তৎকালীন বিডিআর জওয়ানরা। এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দেশের অপরাপর বিডিআর ইউনিটে। দু'দিনব্যাপী বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের মাধ্যমে। যার ফলে তথাকথিত বিদ্রোহে প্রাণ হারায় চৌকস ও দক্ষ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআর সদর দফতরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রথমে ৬টি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এ আদালতের সংখ্যা হয় ১২। এই তদন্ত আদালতের মাধ্যমে বিডিআর আইনে বিশেষ আদালত গঠন করা হয়। ২০০৯ সালের ২৪ নবেম্বর রাঙ্গামাটির রাজনগরে ১২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৯ আসামীদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ মামলার বিচার শুরু হয়। ২০১০ সালের ২ মে এই মামলার প্রত্যেক আসামীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়।

বিডিআর সদর দফতরে বিচার শুরু হয় ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে। গতকাল শনিবার পিলখানায় সদর রাইফেল ব্যাটালিয়ন ইউনিটের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানের মাধ্যমে বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা ৫৭টি মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন হলো।

বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭টি মামলায় আসামী করা হয় ৬ হাজার ৪১ জনকে। তার মধ্যে বিচার চলাকালে মারা যায় ২ জন আসামী। বাকিদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয় ৫ হাজার ৯৮৫ জনকে। আসামীদের মধ্যে সাক্ষ্য প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৯টি মামলায় খালাস পান ১১৫ জন। এরা এতদিন যাবত জেল খাটলেও বিচারের রায় ঘোষণার পর তারা মুক্তি লাভ করেন। বিডিআর আইনেই তারা তাদের পদ মর্যাদা অনুযায়ী চাকরি ফিরে পাবেন এবং এতদিনকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। বিনা কারণে জেল হাজত ভোগ করায় তারা কোনো ক্ষতি পূরণ পাবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামাজিক মান মর্যাদাও ফিরে পাবেন না বলে অনেকের অভিমত।

সূত্র মতে, পিলখানায় থাকা ১১টি ইউনিটের মধ্যে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিজিবির অনেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ব্যাটালিয়নের সদস্য সিপাই সেলিম রেজা। তিনি বিদ্রোহে নেতৃত্বে দেয়া থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যমুনায় বৈঠক পর্যন্ত করেন। সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ২৭ এপ্রিল বিচার কার্যক্রমের দিন সিপাহী সেলিম রেজা প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় সাংবাদিকদের দেখে মন্তব্য করতে থাকেন, ‘ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে'। তিনি আরো বলেন, ভিকটিমরাই বিচারক। তাদের কাছ থেকে সঠিক বিচার পাওয়া যাবে না। আমরা সিভিল কোর্টে বিচার চাই।

একই বছর ৪ নবেম্বর বিচার চলাকালীন দরবার হলের আদালত থেকে বেরিয়ে প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে সিপাহী সেলিম রেজা সবার দৃষ্টি কাড়েন। দরবার হলের কিছুটা দূরে গিয়ে তিনি চিৎকার করে লাফাতে লাফাতে বলতে থাকেন, এই জাতির বিবেক সাংবাদিক। মিডিয়া বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের কথা বলে না। মিডিয়ার দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। সারা দেশের ৫৭টি ইউনিটের ৬ হাজার ৪৬ জন আসামির বিরুদ্ধে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার বিচার চলে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ২৪ নবেম্বর রাঙ্গামাটির রাজনগরে ১২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের আসামিদের বিরুদ্ধে প্রথম বিচার শুরু হয়। তবে প্রথম রায় ঘোষণা করা হয় ২০১০ সালের ৭ এপ্রিল পঞ্চগড়ে ২৫ রাইফেল ব্যাটালিয়নের আসামীদের বিরুদ্ধে। ঢাকার বাইরে সর্বশেষ রায় ঘোষণা করা হয় ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল দিনাজপুরে। এ রায়ের মধ্যদিয়ে ঢাকার বাইরে সব ইউনিটের রায় ঘোষণা শেষ হয়।

সূত্র জানায়, পিলখানার ১১টি ইউনিটে আসামীর সংখ্যা চার হাজার ৯৪ জন। এর মধ্যে ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রেকর্ড উইংয়ের ১১১ জন আসামীর রায় ঘোষণা করা হয়। এতে প্রত্যেককেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয়। ২০১১ সালের ১১ মে বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় ঢাকা সেক্টর সদর দফতরের ৮৪ জন আসামীর সবাইকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়। একই বছরের ৬ জুন রাইফেল সিকিউরিটি ইউনিটের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড সিকিউরিটি ইউনিট) ১১৩ জন আসামীর মধ্যে ১০৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। আর চারজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। গত বছর ২৭ জুন বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় ২৪ বিজিবি (আগের বিডিআর) ব্যাটালিয়নের ৬৬৬ জন আসামীর মধ্যে ১০৮ জনকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে ৯ জন। ৫৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সিগন্যাল সেক্টরের ১৮৭ আসামীর মধ্যে ১৮২ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয়েছে। বেকসুর খালাস পেয়েছেন পাঁচজন। ২০১২ সালের ৫ মে ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৩১০ আসামীর মধ্যে ৩০৯ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে একজনকে। চলতি বছরের ১৬ জুন রায় দেয়া হয়েছে ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৬২১ আসামীর। তাদের মধ্যে ৬১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ১০ জন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। গত ১৪ জুলাই বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) হাসপাতাল ইউনিটের ২৫৫ জন আসামীর মধ্যে ২৫৩ জনের সাজা হয়েছে। খালাস পেয়েছেন দু'জন। গত ১২ আগস্ট বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সব পরিদপ্তর ও আরএসবি (রাইফেল স্পোর্টস বোর্ড) ইউনিটের ৩৩৬ জন আসামীর মধ্যে ৩৭ জনকে সর্বোচ্চ সাত বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। বেকসুর খালাস পায় সাতজন। ২৯২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৬৭৫ জন আসামীর রায় ঘোষণা করা হয় ২৮ আগস্ট। রায়ে ৬৬৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা দেয়া হয় ১১৩ জনকে। খালাস পান ৮ জন। গতকাল শনিবার সর্বশেষ সদর রাইফেল ব্যাটালিয়ন ইউনিটের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানের মাধ্যমে শেষ করা হলো তিন বছর আগের বিডিআর বিদ্রোহের বিচার। ৭২৩ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সাজা প্রদান করা হয় ৬৪ জনকে। খালাস দেয়া হয়েছে ১০ জনকে। এই মামলায় আসামীর সংখ্যা ছিল ৭৩৫ জন। বিচার চলাকালে দুই আসামীর মৃত্যু ঘটায় আসামীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩৩ জনে।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন নিহত হন। রক্তাক্ত বিদ্রোহের পর সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর নাম বদলে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। সদর রাইফেল ব্যাটালিয়ন ইউনিটের মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হল বিডিআর আইনের কার্যকারিতা। বিদ্রোহের ক্ষেত্রে এখন থেকে নতুন বিজিবি আইন কার্যকর হবে, যাতে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। বিদ্রোহের মামলার বিচার শেষ হলেও পিলখানায় হত্যা-লুণ্ঠনের মামলার বিচার চলছে ঢাকার জজ আদালতে। ওই মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্রোহের শেষ রায়ে সাজা ৭২৩ জনের : সদর রাইফেল ব্যাটালিয়ন ইউনিটের ৭৩৩ জওয়ানের বিরুদ্ধে মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হল তিন বছর আগের বিডিআর বিদ্রোহের বিচার কার্যক্রম। গতকাল শনিবার পিলখানার দরবার হলের এজলাসে এই মামলার রায়ে ৭৩৩ আসামীর মধ্যে ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন আদালত প্রধান বিজিবির ঢাকা সেক্টরের প্রধান কর্নেল এহিয়া আজম খান। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে ৬৪ জনকে। সর্বনিম্ন চার মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে ১৯ জনকে। ১৭৬ জনকে চার বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। দন্ডিতদের কারাদন্ডের পাশাপাশি ১০০ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। দন্ডিতরা সবাই সীমান্ত রক্ষাবাহিনীর চাকরি হারালেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ১০ জন। এই ১০ জন চাকরি ফেরত পাবেন।

সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ১১ জুলাই বিদ্রোহের অভিযোগ দায়ের করা হয়। দুই আসামীর মৃত্যু হওয়ায় ৭৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ