ঢাকা, রোববার 21 October 2012, ৬ কার্তিক ১৪১৯, ৪ জিলহজ্জ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেও কার্ড মেলেনি নারী কৃষকের

বিডিনিউজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর এক বছর গেলেও কৃষিকার্ড পাননি বলে অভিযোগ করেছেন এক নারী কৃষক। কুষ্টিয়ার খাদিমপুরের নারী কৃষক আম্বিয়া খাতুন শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন কৃষিকাজে নারীর বিড়ম্বনার চিত্র। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি কৃষিকার্ড দেয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি এখনো তা হাতে পাননি। এই কার্ডের আওতায় সরকারের ভর্তুকি মূল্যে কৃষকরা সার, তেল ও বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু কার্ড না হওয়ায় সেই সুবিধা পাচ্ছেন না আম্বিয়া। নারী কৃষকদের রক্ষা, তাদের সামাজিক স্বীকৃতি এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ ও ত্বরিত পদক্ষেপ চেয়েছেন এই নারী কৃষক। কাকরাইলের ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (আইডিইবি) মিলনায়তনে গ্রামীণ জীবনযাত্রার টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইন্যাবল রুরাল লাইভলিহুড-সিএসআরএল) আয়োজিত ‘জাতীয় কৃষক শুনানি-তে অংশ নিয়ে নিজের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন আম্বিয়া খাতুন। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ‘অক্সফাম' এবং তাদের সহযোগী প্রচারণা সংস্থা ‘গ্রো' এ শুনানির আয়োজন করে। অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন এলাকার আরো চারজন কৃষক তাদের বক্তব্যে কৃষি উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এরা হলেন- যশোরের সেকান্দারপাড়ার রঞ্জন কুমার বিশ্বাস, নাটোরের বড়াইগ্রামের রসুন চাষী জেকের আলী তরফদার, শেরপুরের বলাইরচর এলাকার মাতলুম হোসেন ভুট্টো এবং সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের হীরণ চন্দ্র দাস। মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্বামীর ঘরে যাওয়া আম্বিয়া খাতুন বলেন, শূন্য হাতে শুরু করেও নিজের প্রচেষ্টায় অন্যের জমি বর্গা চাষ করে তিনি তিন বিঘা জমির মালিক হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী পঙ্গু হওয়ায় তিনি নিজেই কোদাল দিয়ে কুপিয়ে জমিতে ফসল ফলান। এরপরেও তিনি কৃষি বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। যশোরের বর্গাচাষী রঞ্জন কুমার বিশ্বাস বলেন, পাঁচ বিঘা জমি বর্গা চাষ করে এ বছর তিনি ১০২ মণ ধান ফলিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ মণ ধান তিনি ভূমি মালিককে দিয়েছেন। বাকি ৬৭ মণ ধান বাজারে বিক্রি করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫২০ টাকা দরে। অথচ পাঁচ বিঘা জমি চাষে রঞ্জনের ব্যয় হয়েছে ৬১ হাজার টাকা। ‘‘জমি চাষের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নেয়া ১৫ হাজার টাকা শোধ করলে আমার আর সংসার চলবে না’’ বলেন তিনি। নাটোরের রসুন চাষী জেকের আলী বলেন, এক মণ রসুন চাষে ব্যয় হয় প্রায় এক হাজার ৬০০ টাকা। অথচ বাজারে দেশী রসুনের কেজি প্রতি দাম মাত্র ৮৫০ টাকা, যা দুই বছর আগেও ছিল দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, গ্রামের বাজারে দেশী রসুনের দাম না থাকলেও শহরে রসুন বিক্রি হয় ১০০ টাকা কেজি দরে। দেশী রসুন বিক্রির ব্যবস্থা না হলেও অবাধে আসছে ইতালি ও ভারতের রসুন। এগুলোর দামও চড়া। তাই বিদেশ থেকে রসুন আমদানি বন্ধ করে দেশীয় রসুনের মূল্য নিশ্চিত করার আহবান জানান তিনি। শেরপুরের ভুট্টো বলেন, অনেক টাকা খরচ ও কষ্ট করে তিনি ক্ষেতে রসুন, পেঁয়াজ, টমেটো, লাউ ও চিচিঙ্গা লাগিয়েছিলেন। কিন্তু বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সরকার থেকে কোন  প্রণোদনা বা সহায়তা পাননি। কেউ খবরও নিতে আসেনি তার। সুনামগঞ্জ বিশ্বম্ভরপুরের হীরণ বলেন খরায় ফসলের ক্ষতির কথা। এ গৃহস্থের প্রায় তিন একর জমির ফসল গত বছর খরার কারণে নষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেচের পানির ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। স্থানীয়ভাবে এমন কোন সুযোগও ছিল না।

এ ব্যাপারে সরকারের সহায়তা চান হাওর অঞ্চলের এই কৃষক। সিএসআরএলের সমতলভূমি প্রচারণা কার্যক্রমের প্রতিনিধি সুলতানুল আলম স্বাধীন বলেন, কৃষকদের উৎপাদন এবং ভোক্তাদের স্বার্থ দুটিই রক্ষা করে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য কৃষি উপকরণের মূল্য কমিয়ে উৎপাদিত ফসলের মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজটি করতে একটি ‘জাতীয় মূল্য কমিশন' গঠন জরুরি। অনুষ্ঠানের অতিথি কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খালেদ এসব দাবি ও সমস্যার সমাধানে কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘‘কৃষকরা সংগঠিত না হলে এসব সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। কারণ আমরা সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে জন্ম নিলেও আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে ‘ধনবাদী' বা ‘পুঁজিবাদী'। তাই কৃষকদের সমস্যা সমাধানে সংগঠিত হতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের থেকে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে।’’ ন্যায্যমূল্য পেতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ফসল কৃষকদের ঘরে রাখতে কৃষিঋণসহ আর্থিক সহায়তা দেয়ার আশ্বাসও দেন কৃষি ব্যাংক চেয়ারম্যন। বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, কৃষকদের সমস্যা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। তথ্য কমিশনের কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, আমাদের ১৫ কোটি মানুষের ৭৪ শতাংশই গ্রামীণ। প্রায় সাড়ে ১১ কোটি গ্রামীণ মানুষের ৫৪ শতাংশ প্রান্তিক চাষী। এসব চাষী ফসল ফলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। কিন্তু আবাসন কোপানিগুলো তাদের কৃষি জমি নষ্ট করছে। এজন্য দেশের প্রান্তিক চাষীদের কথা আবারো নতুন করে ভাবতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ