ঢাকা, রোববার 21 October 2012, ৬ কার্তিক ১৪১৯, ৪ জিলহজ্জ ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

ভাষা সৈনিক অলি আহাদের ইন্তিকাল

স্টাফ রিপোর্টার : না-ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রখ্যাত রাজনীতিক, ভাষা সৈনিক এবং স্বাধীনতা  গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রামে সদা সক্রিয় অলি আহাদ। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ক'দিন লাইফসাপোর্টে থাকার পর গতকাল শনিবার সকালে তিনি ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই ভাষা সৈনিকের প্রতি শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। দু'দফা নামাযে জানাযা শেষে বিকেলে বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

মৃত্যুকালে অলি আহাদের বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহযোদ্ধা-সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে।

আজন্ম যোদ্ধা এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট মোঃ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় সংসদের স্পীকার আব্দুল হামিদ এডভোকেটসহ বিশিষ্টজনেরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক জানিয়ে আরো বিবৃতি দিয়েছে মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ, যুব ন্যাপ, মহিলা ন্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্রদল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ ভাসানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন।

বাদ আসর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত নামাযে জানাযায় অন্যদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, খায়রুল কবীর খোকন, মোশাররফ হোসেন এমপি, মুসলিম লীগের সভাপতি নুরুল হক মজুমদার অংশ নেন।

বাদ জোহর তার প্রথম নামাজে জানাযা কেন্দ্রীয় শহীদমিনারে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে তার লাশ রাখা হয়। প্রথম জানাযায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বিএনপর সিনিয়র নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, বরকত উল্লাহ বুলু, খায়রুল কবীর খোকন, চিকিৎসক নেতা এজেডএম জাহিদ হোসেন, কবি আব্দুল হাই শিকদার, চাষী নজরুল ইসলাম, রাজনীতিক শফিউল আলম প্রধান, শওকত হোসেন নীলু প্রমুখ।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, রওশন আরা, আওয়ামী লীগের পক্ষে সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, বিএনপির পক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা প্রমুখ।

এছাড়াও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন কফিনে ফুল দিয়ে ভাষাসৈনিকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

দুপুর পৌনে ১টার দিকে সদ্য মরহুম ভাষাসৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খালেদা জিয়া শমরিতা হাসপাতালে যান। এ সময় তার রূহের মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। চীন সফর শেষে ঢাকায় ফিরে হযরত শাহজালাল (রঃ) বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি অলি আহাদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাসপাতালে যান।

অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার ফারহানা বলেন, ‘‘বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকদিন ধরে হাসপাতালে চারজন ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছিলেন আববা। গত রোববার নিউমোনিয়াসহ আরো কয়েকটি রোগে গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসের সংক্রমণে (ইনফেকশনে) ভুগছিলেন। গত মার্চ থেকে এটা বেড়ে যায়।’’ গত ক'দিন এ হাসপাতালে লাইফ সপোর্টে রাখা হয় তাকে। গতকাল সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অলি আহাদের স্ত্রী প্রফেসর রাশিদা বেগম জানান, ‘‘তার কোনো গুরুতর রোগ ছিল না। গত মার্চ থেকে নিয়মিত অসুস্থ হতে থাকেন। এর মধ্যে মার্চ থেকে এপ্রিল টানা দুই মাস হাসপাতালে ছিলেন। মাঝে অবস্থার উন্নতি হলে বাসায় নেয়া হয়। মাঝে মাঝে অসুস্থ হলে তাকে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আবার বাসায় চলে যেতাম।’’ তিনি জানান, ‘‘২০০৩ সালে বাথরুমে পড়ে গিয়ে তার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন থেকেই তিনি মূলত বিছানায় ছিলেন।

স্বাধীনতা ও মক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অলি আহাদকে ২০০৪ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের সূচনালগ্নেই গ্রেফতার হয়েছিলেন এই রাজনীতিক। জীবনের অনেকটা সময় তাকে কারাগারেও থাকতে হয়েছিল। এক সময়ে আওয়ামী লীগে থাকা এই নেতা স্বাধীনতার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের গড়া দলে যোগ দেন। আজীবন রাজনীতিতে যুক্ত এই ব্যক্তি ডেমোক্রেটিক লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

গত শতকের '৮০ এর দশকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখিও হয়েছিলেন অলি আহাদ। স্বৈরাচারবিরোধী জনমত গঠনের জন্য তার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ ওই সময় নিষিদ্ধ করা হয়। ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিবিদ অলি আহাদের লেখা ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫' সেই সময়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তার একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার নমিনা ফারহানা হাইকোর্টের আইনজীবী।

 

অলি আহাদের মৃত্যুতে মকবুল

আহমদের শোক

ভাষা সৈনিক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ডেমোক্রেটিক লীগের সাবেক সভাপতি অলি আহাদের ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমদ গতকাল শনিবার শোকবাণী প্রদান করেছেন।

শোকবাণীতে তিনি বলেন, অলি আহাদ একজন সৎ, গণতান্ত্রিকমনা ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ছিলেন। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন রাজনীতি করে গিয়েছেন। তার অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত আত্মীয়-স্বজনদের গভীর সমবেদনা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ