রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কী বই চান? নীলক্ষেতে আসুন!

সুবিন্যস্ত এমন বইয়ের সারি চোখে পড়বে রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকার ফুটপাত জুড়ে। নতুন-পুরানো সব বিষয়ের বই মেলে এখানে -সংগ্রাম

সাদেকুর রহমান : একজন প্রত্ন বিষয়ক অনুসন্ধিৎসু সংবাদকর্মী আ ক ম যাকারিয়া রচিত ‘বাংলাদেশে প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থটির আদি সংস্করণ খুঁজে খুঁজে হয়রান। প্রথমে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশ করলেও এর কোন কপি সেখানে পাওয়া যায় না। পরে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থটি প্রকাশ করলেও এর দাম রাখা হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির প্রায় চারগুণ। তদুপরি সাম্প্রতিক সংস্করণের কোন কোন ছবি ও তথ্য নিয়ে ইতিহাসমনস্ক অনেক পাঠকের মনেই প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্নাতীত গ্রন্থের খোঁজ করতে গিয়ে অনেক বইয়ের দোকান চষে বেড়িয়েও যখন হতাশ, ঠিক তখনি কোন একজন বইপোকা বন্ধুর পরামর্শে নীলক্ষেতে গিয়ে দুর্লভ এ গ্রন্থটি পান। সেই শিল্পকলা একাডেমির ছাপা বইটি কিছুটা জীর্ণ হওয়ায় বিক্রেতা দেড়শ’ টাকা দাম চাইলেও সংবাদকর্মী মাত্র একশ’ টাকায় তা কিনে নিতে সক্ষম হন। ওই সংবাদকর্মী জানান, তিনি প্রায়ই নীলক্ষেতে আসেন, পছন্দের রেফারেন্স বই কিনে নেন অনেকটা সুলভ মূল্যে।
জহুরুল ইসলাম নামে বেসরকারি ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী  জানান, নীলক্ষেতে পুরোনো বই দেখতে গিয়ে একদিন হঠাৎ-ই আহমদ ছফার ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ বইটি তার চোখে পড়ে। পাতা উল্টে দেখতে পান, বইটি তিনি ১৯৯৬ সালে অটোগ্রাফসহ উপহার দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত একজন কবি ও সাংবাদিককে। সেই বই এখানে, জহুরুল বিস্মিত হন! বইটি কিনে ফেলেন। তার ভেতরে চাপা উত্তেজনা বইতে থাকে, খুবই আনন্দিত হন। এরপর থেকে নীলক্ষেতে যাওয়ার অভ্যাসটা নিয়মিত হয়ে গেছে। ওদিকে গেলেই একবার পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরে আসেন।
ওই সংবাদকর্মীর বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ গ্রন্থ কেনা কিংবা জহুরুল ইসলাম বইয়ের পাতায় কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার একটি জীবন্ত অটোগ্রাফ পেয়ে যাওয়ার গল্পের মতো প্রতিদিনই হয়তো এমন ঘটনা ঘটছে। সঙ্গতকারণেই সেসব ঘটনার খবর রাখা হয় না নাগরিক সাধারণের। তবে এটা প্রতীয়মান হয়, এক সময়ের জনমানবহীন এলাকাই হালের নীলক্ষেত, যা কিনা বইয়ের খনি, জ্ঞানের আকর। পুরনো বইয়ের পাশাপাশি এখানকার দোকানগুলোতে পাওয়া যায় বিষয়ভিত্তিক অনেক নতুন দামী ও দুর্লভ বইও। মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের সবদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিরামহীন বেচা-কেনা চলে এখানে।
মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার বর্ণনা মতে, নীলক্ষেত বাংলাদেশের ঢাকা শহরের একটি এলাকা। এটির পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমে মিরপুর রোড ও ঢাকা নিউ মার্কেট, উত্তরে এলিফ্যান্ট রোড, এবং দক্ষিণে আজিমপুর ও পিলখানা এলাকা অবস্থিত। বইয়ের বাজারের জন্য নীলক্ষেত বেশ পরিচিত।
এর নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, বৃটিশরা এদেশে আসার পর থেকেই ইউরোপিয়ানরা বিভিন্ন এলাকায় নীল চাষ শুরু করে। সেই সময় ঢাকার নীলক্ষেত এলাকার বিরাট প্রান্তরজুড়ে নীল চাষ করা হতো। দীর্ঘকাল ধরে সেই নীল চাষ চলে। সেই এলাকাটিতে নীল উৎপন্ন হতো প্রচুর। প্রচুর নীল উৎপন্ন হতো বলেই আজও নীলক্ষেতের নামের সাথে নীল শব্দটি জড়িয়ে আছে। লোকজন এলাকাটিকে চিনেছেও এ নামে। নীলক্ষেত এলাকার নামকরণ করা হয় নীলচাষের স্থান থেকে। যেসব জমিতে চাষাবাদ করা হয় সেই জমিকে ক্ষেত নামে অবহিত করা হয়। এটা বেশ আগের রীতি। নীল এবং চাষাবাদের ক্ষেত এই দুয়ের মিশ্রনে নাম হয় নীলক্ষেত।
আগে নীলক্ষেত এলাকায় কোন বসতি ছিল না। শুধুই নীল চাষ হতো। ১৮৪৭ সালের দিকে ঢাকায় ৩৭টি নীলকুঠি ছিল। তবে পরবর্তীতে নীলক্ষেত এলাকাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বৃটিশদের প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৬১ সালে নীলক্ষেত এলাকায় গড়ে উঠে বস্তি। এই বস্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ছোটখাটো দোকান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের প্রসিদ্ধ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই বিক্রি শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। ধীরে ধীরে জমে উঠতে শুরু করে বইয়ের মার্কেট। ১৯৭৪ সালে এখানের সব বস্তি ভেঙে দেয়া হয়। কিছুদিন পর পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠে বাক্কুশাহ মার্কেট ও গাউছুল আযম মার্কেট। যার প্রায় পুরোটাই লেখাপড়ার সামগ্রী নিয়ে। কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোকপি, বই, খাতা-কলম ইত্যাদি মূল হলেও সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু খাবারের দোকানও। বর্তমানে প্রিন্টিং প্রেস হিসেবেও নীলক্ষেতে রয়েছে বেশ খ্যাতি।
নীলক্ষেত এলাকাটি ঢাকা শহরের পুরানো বই বেচা- কেনার কেন্দ্রস্থল। সিটি করপোরেশন মার্কেটের বিপরীত পাশে, নীলক্ষেত মোড় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ পর্যন্ত বিস্তৃত নীলক্ষেতের পুরোনো এ বইয়ের বাজার। এখানে শতাধিক বইয়ের দোকান রয়েছে, যা বই কেনা- বেচার ব্যবসায় জড়িত। দেশের কোথাও কোন বই না পাওয়া গেলে শেষ ভরসা নীলক্ষেত! বাংলাদেশে পঠন-পাঠন হয়, এমন সব ধরনের বই-ই মিলে এখানে। মূল বই না হোক ফটোকপি পাওয়া যাবেই, যেটা ‘নীলক্ষেত ভার্সন’ হিসেবে পরিচিত! এসব দোকানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় দেশী-বিদেশী ম্যাগাজিন, উপন্যাস, রিসার্চ পেপার, জার্নাল, রেফারেন্স বই, নামি-দামি দেশী-বিদেশী লেখকের বই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন, বিশ্বখ্যাত নতুন-পুরনো সাহিত্যসমূহের বাংলা অনুবাদসহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী ক্যাটালগ ও ইংরেজি, ফরাসি, আরবিসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার বই। আরও পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের থ্রিলার ও আত্মোন্নয়নমূলক দেশী-বিদেশী লেখকের বই।
নীলক্ষেতের পুরোনো বই ব্যবসায়ীরা জানালেন, বইগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। সবই যেহেতু পুরোনো বই, তাই এগুলো কেউ না কেউ বিক্রি করার পরই নীলক্ষেতের বাজারে আসে। সাধারণত ভাঙারির দোকান, বাংলাবাজার ও ফেরিওয়ালার কাছ থেকেই বইগুলো বাজারে ওঠে। মাঝেমধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগার থেকেও পুরোনো সংস্করণের বইগুলো আনা হয়। অনেকে আবার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইও বিক্রি করেন।
পুরোনো বই বিক্রেতা শাহাব উদ্দিন বললেন, ‘১৫ বছর হইয়া গেছে পুরান বই বেচতাছি। আমরা সব ধরনের বই-ই বেচি। এখানে পাওয়া যাইবো না এমন কোনো বই নাই। যেসব বই আর নতুন পাওয়া যাইবো না, সেগুলার পুরান সংস্করণও এইখানে আছে। তয়, খুঁজে নিতে হইবো।’
নীলক্ষেতের এ বাজারে মিলবে ইংরেজি মিডিয়াম এবং বাংলা মিডিয়ামের সকল বই। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সকল বিভাগের সব ধরনের বইয়ের দেখা পাবেন এখানে। এমনকি গবেষণার ওপরও পাওয়া যাবে নানা রকম বিষয়ভিত্তিক বই। পাঠ্যবই ছাড়াও রয়েছে গল্প, কবিতা, কৌতুক, সাধারণ জ্ঞান, চাকরি ও ভর্তির প্রস্তুতিমূলক সহায়ক বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন ইংরেজি বইও নজরে পড়বে এ বইয়ের বাজারে।
জাকির হোসেন নামে আরেকজন বিক্রেতা বলেন, ‘কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাই বেশি আসে। এখানে আইসা কেউ বই বেচে দেয়, কেউ কেনে। চাকরি, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক বই আর পাঠ্যবই-ই বেশি বিক্রি হয়। গল্পের বইও বেশ চলে।’
এদিকে, নীলক্ষেতের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে ছিল দ্বন্দ্ব। ১৯৮২ সালে নীলক্ষেত মার্কেটের জমির মালিকানা নিয়ে মামলা হয়। ১৯৯৪ সালে এটি খাসজমি হিসেবে কোর্টের রায় হয়। ১৯৯৬ সালে নিলামে জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত হলেও তা সম্ভব হয়নি। এরপর দখল বিবেচনায় সরকারি রেটে বিক্রি করার কথা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রতিটি ব্যবসায়ীক মার্কেটেই থাকে একটি সমিতি। কিন্তু নীলক্ষেত মার্কেটে পরিলক্ষিত হয় ভিন্ন চিত্র। জমির মালিকানাকে কেন্দ্র করেই ১৯৮২ সালে ইসলামিয়া মার্কেট বণিক বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড ও ১৯৮৪ সালে বাবুপুরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের জন্ম হয়। এখনো দুটি সমিতি বিদ্যমান থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বলেই দাবি করছেন সমিতির সদস্যরা। বরং একই কাগজে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করা হয় বলে জানিয়েছেন তারা।
নীলক্ষেতের বইয়ের মার্কেটে গড়ে উঠেছে বেশকিছু খাবারের দোকানও। ডাকাডাকিতে বেশ জমজমাট থাকে ফুটপাত ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোকানগুলো। সব খাবার পাওয়া গেলেও তেহারি আর কাচ্চির জন্য বিখ্যাত এই দোকানগুলো। ছোট গলির নীলক্ষেত বই মার্কেটের বড় আশঙ্কা হলো দুর্ঘটনার। কোনোভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে হয়ত রক্ষা পাবে না একটি দোকানও। পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে উঠা পাকা, অর্ধপাকা কিংবা কাঁচা দোকানগুলো চলছে ঝুঁকির মধ্যেই। কোথাও দেখা যায় না অগ্নিনির্বাপক কোনো যন্ত্র। নিরাপত্তার জন্য নেই কোনো সতর্কতা। অবশ্য অদূরেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি স্টেশন রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ