শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

৬ হাজার কোটি টাকার ঈদ বাণিজ্যের টার্গেটে ভাটা

কামাল উদ্দিন সুমন : ঈদের বাকি আর মাত্র ৫ দিন। তবে গত ৫ বছরের মধ্যে এবারই ঈদ মার্কেটে নেই তেমন জমজমাট। কোনো কোনো মার্কেট বলা চলে ক্রেতাশুন্য। কারণ হিসেবে অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন ঈদুল আযহায় কেনাকাটার প্রথম তালিকায় থাকে কোরবানির পশু। তারপরও মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় গত কয়েক বছর ঈদুল আযহায় বিপণিবিতানগুলোয় বিক্রি বেড়েছিল। তবে এ বছর তেমন জমেনি কেনাবেচা। ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর বিপণিবিতানে পোশাকসহ নানা জিনিসের টুকটাক কেনাকাটা চললেও দেশে দফায় দফায় বন্যার কারণে ফসলহানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সেই কেনাবেচায় চলছে মন্দা।
মৌচাক ফরচুন মার্কের্টের শাড়ির দোকানদার মোশাররফ হোসেন জানান, গত কয়েকে দিনে একটা দামী শাড়িও বিক্রি হয়নি। ক্রেতার সমাগমও কম। একে তো কোরবানি তার উপর এবার মানুষের পকেট মন্দা বলেই মনে হচ্ছে। ফলে আমাদের বেচাকেনায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  ঈদে শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে সব থেকে কেনাবেচা জমবে এমন আশা ছিল বিক্রেতাদের। তবে সেদিনও বিপণিবিতানগুলোর চিত্র ছিল একই রকম। তেমন কোনো ভিড়  ছিল না, বিভিন্ন মার্কেটসহ শপিংমলগুলোয়। নেই কেনাবেচার তেমন হাঁকডাক। অনেকেই এসেছেন ঘুরতে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের মতো জমজমাট কেনাবেচা হয় না এ ঈদে। তবুও এর তুলনায় ঈদুল আজহায় ২০ শতাংশ কেনাবেচা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। সে হিসেবে এই ঈদে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। কিন্তু এ বছর কয়েক দফা বন্যায় জনজীবন বিপন্ন হওয়াসহ ফসলহানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে ঈদের কেনাবেচায়। ফলে গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে।
পীর ইয়ামিনি মার্কেটের  ব্যবসায়ি গোলাম সাদেক বলেন, অন্যান্য বছর এ সময় ‘কাস্টমারদের’ চাপ অনেক বাড়ে। সেখানে এ বছর গুটিকয় ক্রেতা। আজ ভিড় কিছুটা বাড়বে আশা করলেও তা হয়নি। মলে অন্য ছুটির দিনের মতো বিক্রি হচ্ছে।
দেশে তৈরি সব ধরনের সুতি শাড়ি বিক্রি করে নিউমার্কেটের ‘মনে রেখ শাড়ি’ দোকান। ঈদ উপলক্ষে যেমন ক্রেতা সমাগম হওয়ার আশা করেছিলেন, তা হচ্ছে না জানিয়ে বিক্রেতা এনাম বলেন, ঈদের এক সপ্তাহ বাকি। সে অনুযায়ী ক্রেতাদের ভিড় তো অনেক বেশি থাকার কথা। অথচ ক্রেতা তেমন নেই।
তিনি বলেন, বন্যা ও রাস্তার বেহাল দশার কারণে অনেকের গ্রামে ফেরা অনিশ্চিত। এছাড়া ছুটি অনেক কম হওয়ায় বাড়ি যাচ্ছে না অনেকে। এতে বিক্রি খুবই মন্দা। গত কয়েক বছর কোরবানির ঈদেও বেশি বিক্রি ছিল। এখন সামান্য বিক্রিতে মন ভরছে না।
এই বিপণিবিতানের ‘শেলী ফেব্রিক্স’-এ তাকে সাজানো বিভিন্ন ডিজাইনের মেয়েদের আনস্টিচ থ্রিপিস। দোকানটিতে বেশ ভিড় দেখা গেলেও তেমন বিক্রি না হওয়ার কথা বলেন ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, কিছু কাস্টমার থাকলেও বেশিরভাগ কাস্টমারই শুধু দেখছেন। ক্রেতা খুবই কম। বসুন্ধরা, মৌচাক, আনারকলি, ফরচুন, চাঁদনি চক, গাউছিয়া, নূর ম্যানশন ও নিউমার্কেটে ক্রেতা সমাগম ছিল হাতেগোনা। বসুন্ধরা সিটির শমিংমলের এবি ফ্যাশনের বিক্রেতা মিলন বলেন, এর আগে কখনও এমন দেখিনি। দুই ঈদকে কেন্দ্র করেই আগে আমরা লাভ করতাম। রোজার আর কোরবানি ঈদে। এবার দেখছি উল্টো চিত্র-লাভ করব কী, বিক্রিই তো হয় না।
এদিকে লেভেল ২-এ জারা মেইনের জেনারেল ম্যানেজার মনির খান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যেভাবে দাম বাড়ছে, মানুষ খাবে নাকি পোশাক কিনবে। কিন্তু আমাদের তো বাঁচতে হবে। গত এক বছর ধরেই আমাদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে।
পাশে ফ্যাশন হাউজ লুবনান ম্যানেজার সাইদ হোসেন বলেন, প্রতি বছর কোরবানি ঈদের আগে প্রচুর পাঞ্জাবি বিক্রি করতাম। আর এবার তো বিক্রি করতে পারছি না। এখন ঈদের সময় অথচ স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেচাকেনা খারাপ।
রামপুরা থেকে পুরো পরিবারসহ বসুন্ধরা সিটিতে আসা মিজানুর রহমান ঈদের জন্য কী কেনাকাটা করছেন-জানতে চাইলে বলেন, বাচ্চাদের নিয়ে এলাম ঘুরতে। যদি কিছু পছন্দ হয় তাহলে কিনব। কোরবানি ঈদে তো গরু কেনাই আসল। তাই তেমন কেনাকাটার ইচ্ছে নেই।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআই’র সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিন বলেন, ঈদের অর্থনীতি নিয়ে এফবিসিসিআই’র একটি পরিসংখ্যান রয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ঈদুল ফিতরে শুধু নতুন পোশাক কেনাকাটায় যাচ্ছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আর ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় ২০ শতাংশ কেনাবেচা হয়েছে গত কয়েক বছর। সে হিসেবে বাজার হওয়ার কথা পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার।
তিনি বলেন, কিন্তু এ বছর সেই স্বাভাবিক বাজারও নেই। সারা দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা অনেক খারাপ। যার প্রভাব পড়েছে মার্কেটে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের সব খানেই বেচাকেনায় দারুণ মন্দা চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ