শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

একবার মংদু গিয়েছিলাম

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : এক.
এপারে বাংলাদেশের টেকনাফ স্থলবন্দর। ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মংদু শহর। এপার থেকে দেখা যায়। শুনলাম, ভিসা ছাড়াই পাসপোর্ট জমা দিয়ে পারমিট নিয়ে মংদু যাওয়া যায়। ৫০০ টাকা পারমিট ফি। ঠিক করলাম, ঘুরে আসি মিয়ানমারের মংদু শহর। এর আগে মিয়ানমারে কখনও যাইনি। টেকনাফের এক সাংবাদিক স্বেচ্ছায় সহযাত্রী হতে রাজি হলেন। পারমিট সংগ্রহ করে কাদা-পানি পেরিয়ে ইঞ্জিন-চালিত এক নৌকায় গিয়ে উঠলাম। সে বছর পাঁচেক আগের কথা। ভাড়া বা সময়ের দূরত্বের কথা মনে নেই। মিয়ানমারে তখন মুসলিম নির্যাতন চলছে। মংদুতে মসজিদ ভেঙে বানানো হয়েছে সামরিক ছাউনি। এ সংবাদ খবরের কাগজে পড়েছি। তার ছবিও দেখেছি। সেখানকার মুসলমান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব তো আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাও আমার অজানা ছিল না। কৌতুহলটাই ছিল সব চেয়ে বড়। কী ঘটছে মিয়ানমারে। সহযাত্রী সাংবাদিক আমাকে আগেই জানিয়ে দিলেন যে, আমরা যাচ্ছি বটে মংদু। তবে শহরের বাইরে যাওয়া চলবে না। তথাস্তু।
এক সময় মংদুতে পৌঁছে গেলাম। টেকনাফের মতো সেটাকে বন্দর মনে হলো না। মনে হলো একটি গুদারা ঘাট। নৌকা যাচ্ছে, আসছে। যাত্রীরা নামছে। নৌকায় উঠছে। তারপর যে যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। এখানে কাদা-পানির যন্ত্রণা নেই। সোজা উঠে গেলাম ঘাটে। কিছুটা দূরেই একটা চেকপোস্ট। সেখানে সেনাবাহিনীর লোক। দৃষ্টিতে চরম বিরক্তি। হাত বাড়িয়ে দিল। মোবাইল-ক্যামেরা নেওয়া মানা। ফলে তা সঙ্গে আনিনি। সহযাত্রী সাংবাদিক আশ্বস্ত করলেন, ছবি পাওয়া যাবে। পারমিট বাড়িয়ে দিলাম। কী চেক করলেন, কে জানে। হাতে ছিল পানির বোতল। সেনা সদস্য একজন সেটার দিকে ইঙ্গিত করলেন। বোতলের মুখ খুলে বাড়িয়ে ধরলাম। তিনি তাকিয়ে থাকলেন। বললাম, পানি, জল, ওয়াটার। কোনটা বুঝলেন, বলতে পারবো না। বাঁ হাতে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো ইঙ্গিত করলেন। বুঝলাম, চলে যেতে বলছেন। তবে তার মধ্যে ভদ্রতার লেশমাত্র ছিল না।
খানিক পাকা রাস্তা। বেশ ভালো। তার দু’ পাশে রাখাইন ও বর্মী নারী পুরুষেরা দোকান সাজিয়ে বসেছেন। নারীই বেশি। শাক-সবজি, তরিতরকারি, ফল-মূল, প্রধানত শিশুদের জামাকাপড়, স্পঞ্জের স্যান্ডেলÑ এই সব। দোকানিদের পোশাক-আশাক পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন। বর্মী নারীদের নাকে গালে কপালে চন্দন গুঁড়ার পোঁচ। তারা ফর্সা। বাদামি রাখাইনরা অতোটা যতœশীল নন। সুন্দর পথটা হেঁটে একটা ঢাল বেয়ে আমরা নিচে নেমে এলাম। দু পাশে সারি সারি গাছপালা। খানা-খন্দ-গর্তে ভরা একটা সরু রাস্তা। রাস্তা মানে কোনো এক সময় রাস্তা ছিল। এখন আর নেই। সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে অনেক রিকশা। রিকশাগুলো আমাদের দেশের রিকশার মতো নয়। বা””াদের বাইসাইকেলের মতো। পেছনের দু’ পাশে দুটি ছোট চাকা। তার ওপর ঝোলানো দু’ পাশে দুটি ব্যাগের মতো। সেখানে শরীর ছেড়ে দিয়ে যাত্রীদের বসতে হয়। এতে পণ্যও বহন করা হয়। অনেক কসরত করে উঠে বসলাম। মূল শহরে যাব। মনে হচ্ছিল পড়ে যাব অথবা মাটিতে গুঁতা খাব। ভাড়া বর্মী টাকায় ১৬০০ টাকা। তবে বাংলাদেশি এক টাকা সমান বর্মী ১৬ টাকা।
রাস্তার পাশে ড্রেন। ভাঙাচোরা। ড্রেনটি তৈরির পর কোনো দিন পরিষ্কার করা হয়েছে বলে মনে হলো না। ড্রেনের দু পাশে আবর্জনার স্তূপ। এগুলো পরিষ্কার করার কেউ আছে বলে মনে হলো না। বাপ-দাদার নাম মনে করতে করতে এক সময় মূল শহরে গিয়ে পৌঁছলাম। পুরানো সব দোতলা তিন তলা দালানকোঠা। সব কিছুই নোংরা। রাস্তার একপাশে কিছু ফুটপাতের খাওয়ার হোটেল। ক্ষুধা লেগেছিল। কিন্তু খাওয়ার মতো কোনো হোটেলই পছন্দ হচ্ছিল না। প্রতিটি হোটেলে লক্ষ লক্ষ মাছি ভনভন করছে। হোটেলের ফ্লোরগুলোতে কোনো এক সময় পলেস্তারা ছিল। এখন আর নেই। মাছের পদই বেশি। খোলা জায়গায় রাখা ছিল। সেগুলোও মাছিতে ঢাকা। সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম কোনো ভালো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হোটেল নেই? তিনি মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, নেই। খেতে হলে এখানেই খেতে হবে। আর না হলে ফল খাওয়া যেতে পারে। সেগুলো ফ্রেশ। তিনি আরও জানালেন, বাঙালি ব্যবসায়ীরা এলে সাধারণত এখানেই খান। হোটেলে হাত ধোয়ার বেসিন নেই। টয়লেট একবারে নরক।
কী করা যায়, ভাবছিলাম। তখনই দেখলাম, একটি হোটেলে টুকরিতে করে গরম ভাত নামাচ্ছে। নিজের পানি দিয়ে প্লেট ধুয়ে নিলাম। গরম ভাতের সঙ্গে ডিম ভেজে দিতে বললাম। মাছি তাড়াতে তাড়াতে ডিম ভাজি দিয়ে দ্রুত কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে নিলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে রওয়ানা দিলাম বাজারের দিকে। বাজারে ক্রেতা- বিক্রেতাদের মধ্যে মগ আর রাখাইনের সংখ্যা সমান সমান। আমার সহযাত্রী এখানে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করেন। ফলে অনেককে তিনি চিনেন। নাম ধরে ডাকলেন। বাজারে সবই পাওয়া যায়। মাছ-মাংস, তরিতরকারি, ফলমূল, জামাকাপড়, শুঁটকি- সব। আমরা তখনকার মতো শুধু ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সিদ্ধান্ত নিয়ে গিয়েছিলাম, শহরের সীমানার ভেতরে যত দূর আইন মেনে যাওয়া যায়, যাবো। ঘুরে দেখবো।
সহযাত্রী কাউকে ফোন দিলেন। বাংলাদেশি ফোনের নেটওয়ার্ক সেখানে পাওয়া যায়। তিনি নিষেধ সত্ত্বেও কীভাবে তার ফোনটি সঙ্গে নিয়েছিলেন বলতে পারি না। তবে তিনি বললেন, যদি চেকপোস্টে ধরা পড়তেন, তাহলে বলতেন, তার জানা ছিল না। তখন ওরা ফোনটি রেখে দিত। আবার ফেরার সময় মর্জি হলে ফেরত দিত। কিছুক্ষণ পর একজন এসে হাজির হলেন। বাঙ্গালি না রাখাইন বোঝা গেল না। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাংলায় তারা কথা বললেন। একটা জীপের ব্যবস্থা করতে হবে, আমাদের ঘুরিয়ে আনার জন্য। আমরা ঘুরে দেখছিলাম। দেখি একটি তিন তলা হোটেল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একেবারে শুনশান। কাউন্টারে একজন বর্মী তরুণী বসে বসে ফাইল দিয়ে নখ ঘষছিলেন। আমরা জানতে চাইছিলাম যে, এখানে কি কোনো খাবারের ব্যবস্থা আছে? তিনি জানালেন, নেই। আপনাদের এখানকার টয়লেটটা কি ব্যবহার করতে পারি? তিনি টয়লেটের দরজা দেখিয়ে দিলেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এমন কি টিস্যু পেপারও আছে। আমি টয়লেট ব্যবহার করলাম। আর মনে মনে ও প্রকাশ্যে মেয়েটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালাম।
আধা ঘণ্টা নাগাদ একটা জীপ এসে পৌঁছলো। জীপ না বলে তাকে জীপের কঙ্কাল বলা যায়। মনে হলো, ৫০-৬০ বছর আগে কোনো এক সময় এটা একটা জীপ ছিল। জীপের চালক রোহিঙ্গা মুসলমান। আবুল হোসেন তার নাম। তিনি নিজে একজন ইঞ্জিন মিস্ত্রি। ফলে এই যানটিকে তিনি সচল রাখতে পেরেছেন। যানটির ছাদ নেই। ভেতরে সীটের বদলে কাঠের বেঞ্চ। তাতেও বাঁশ-কাঠের জোড়াতালি। বডিটাও বাঁশ, কাঠ আর টিনের জোড়াতালি। সহযাত্রী জানালেন, এখানে জীপ আছে মাত্র কয়েক ডজন। সবগুলোর অবস্থা একই। যাত্রীও টানে, শস্যও পরিবহণ করে। আল্লাহর নাম জপতে জপতে ড্রাইভারের পাশে কাঠের বেঞ্চে বসে পড়লাম। এবং আশ্চর্য, জীপটি চলতে শুরু করলো। আমি আবুল হোসেনকে বললাম, শহরের নির্ধারিত সীমানার বাইরে এক ইঞ্চিও যাবেন না। এক দিনের জন্য এসেছি। কোনো ঝামেলায় পড়তে চাই না। তিনিও মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
মংদু ছোট শহর। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শহর পার হয়ে গেলাম। এরপর দু’ পাশে বিস্তীর্ণ শস্য ক্ষেত। ধান আর ধান। সরু সড়ক। খোয়া পীচ পড়েনি কতো যুগ, কে জানে। যানটি চলছিল ১০-১৫ কিলোমিটার বেগে। এর চেয়ে জোরে চালানোর উপায় নেই রাস্তার কারণে। গাড়ি চালাতে চালাতে তিনি বলে যাচ্ছিলেন : ঐ যে দুরে গ্রামগুলো দেখতে পাচ্ছেন, ওগুলো রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রাম। এসব জমির ফসল তারাই ফলায়। কিন্তু সবটা ঘরে তুলতে পারে না। মগদের একটা অংশ দিয়ে দিতে হয়। এক গ্রামের লোক অন্য গ্রামে যেতে পারে না। পারমিশন লাগে। বিয়ে করতে ট্যাক্স দিতে হয়। পারমিশন তো আছেই। রাতে চলাফেরা নিষেধ। বাড়িতে কোনো আত্মীয় এলে থানায় গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়। কখনও কখনও তারা সরেজমিনে দেখতে আসে। নানা রকম প্রশ্ন করে। কোনো কিছু বিক্রি করলে সরকারকে ও মগদের টাকা দিতে হয়। এই যে আমি জীপ চালাই, তার উপার্জনেরও একটা ভাগ দিতে হয় তাদের। এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্কুল নেই। মগদের স্কুলে আমাদের ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে না। আমাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে সেই ১৯৮২ সালে। কোনো নাগরিক অধিকার আমাদের নেই। তবু পড়ে আছি বাপ-দাদার ভিটা আঁকড়ে। যাব কোথায়? কেন যাব?
গ্রামগুলোর কাছাকাছি গিয়ে আবুল হোসেন গাড়ি থামিয়ে দিল। এটাই শহরের সীমানা। সামনের গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি দেখা যায়। অধিকাংশই জীর্ণশীর্ণ। কুঁড়ে ঘরের মতো। মাঝে মাঝে দু’ একটা দোতলা কাঠের বাড়ি। গরু, মহিষ, ছাগলও দেখা যায়। আমি সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। নিজ দেশে দেশহারা সব মানুষ এরা। এখন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রামগুলো জ্বলছে। সেখানে মগরা কচুকাটা করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের। আর প্রাণ নিয়ে নারী-পুরুষ শিশু বৃদ্ধ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। তাদের পিটিয়ে তাড়াচ্ছে মগ বাহিনী। আর তারা যাতে পেছনে ফিরতে না পারে সেজন্য মিয়ানমারের পিশাচ সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ছে তাদের দিকে। জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার সাজানো সংসার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ