রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ কিশোরগঞ্জ

বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে কিশোরগঞ্জ জেলার অবস্থান। ঐতিহ্যবাহী নদীর পুরো ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী বিধৌত একটি সমৃদ্ধ জনপদের নাম কিশোরগঞ্জ। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উত্তর পূর্ব অংশ কিশোরগঞ্জের অবস্থান। পৃথিবীর মানচিত্রের উত্তর গোলার্ধের ২৪০২ থেকে ২৪০ ৩৮ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯০০ ০২ থেকে ৯০০ ১৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে কিশোরগঞ্জ অবস্থিত। কিশোরগঞ্জের উত্তরে নেত্রকোনা ও মোমেনশাহী জেলা। পূর্বে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ও নরসিংদী জেলা, পশ্চিমে গাজীপুর ও মোমেনশাহী। কিশোরগঞ্জ জেলার মোট আয়তন ২৬৮৮ বর্গ কি. মি. তার মধ্যে স্থলভাগ ২৪৭৪ বর্গ কি. মি. এবং জলভাগ ৮৩ বর্গ কি. মি.। সমগ্র বাংলাদেশের তুলনায় কিশোরগঞ্জ জেলা শতকরা ১.৭৭ ভাগ এলাকা। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম জেলা কিশোরগঞ্জ ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ জেলায় জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ৬টি। ২০০১ সালের ৪র্থ আদমশুমারী অনুসারে কিশোরগঞ্জ জেলার মোট জনসংখ্যা ২৫,৯৪,৯৫৪ জন। পুরুষ ১৩,২০,১১৭ জন এবং মহিলা ১২,৭৪,৮৩৭ জন। সাক্ষরতার হার ৫৫% ভাগ। প্রতিবর্গ কিলোমিটারে লোকসংখ্যার ঘনত্ব হচ্ছে ১০৪৫ জন। কিশোরগঞ্জ ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। কিশোরগঞ্জে রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। কিশোরগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল ছিল এক সময়ে বিশাল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। কিশোরগঞ্জ জেলা তখন মোমেনশাহী অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৬৫০ ঈসায়ী সাল পর্যন্ত কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মা মোমেনশাহী অঞ্চল শাসন করেন। একাদশ শতাব্দী পাল রাজারা শাসন করেছে। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে সেন রাজবংশের লোকেরা এই অঞ্চল শাসন করেছে। ১২০৪ ঈসায়ী সালে মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর দিল্লীর মুসলিম শাসকরা এ অঞ্চল শাসন করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষাদিকে বৃহত্তর মোমেনশাহীতে মুসলিম রাজত্বের সূচনা হলেও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে শুরু হয়েছে আরো পরে। মধ্যযুগের শুরুতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলেই কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে মুসলিম শাসন শুরু হয়। মুসলিম শাসনের শুরুতে বার ভূইয়ার অন্যতম মসনদে আলা ঈশা খাঁকে ‘মর্জুবানে ভাটি' বা ‘ভাটির রাজা' হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ঈশা খাঁকে কেন্দ্র করেই কিশোরগঞ্জের ইতিহাস বহুল আলোচিত হয়েছে। তিনি বিশাল ভাটি অঞ্চল মোমেনশাহী, ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, নোয়াখালী, ফরিদপুর, পাবনা, রংপুরসহ বিরাট রাজ্যের অধিপতি ছিলেন, ঈশা খাঁকে দমন করার জন্য মোগলরা বহুবার চেষ্টা করেছে। ঈশা খাঁও বহুকাল ধরে মোগলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। ১৫৮৬ ঈসায়ীতে এক অতর্কিত আক্রমণে ঈশা খাঁ মোগলদেরকে পরাজিত করেন এবং রাজধানী খিজিরপুর পুনরুদ্ধার করেন। পরে তিনি সোনারগাঁয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৫৯৯ সালে ঈশা খাঁ ইন্তেকাল করেন। পরে ঈশা খাঁর পুত্র মুসা খাঁন মসনদে আলা বার ভূইয়াদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মুগল শাসনের অবসান হলে সুজাউদ্দিন খান, সরফরাজ খান, আলীবর্দী খান এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলা বিহারের শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে শাসনকার্য পরিচালনা করে। ১৭৮৭ সালের ১ মে মোমেনশাহী জেলার সৃষ্টি হয়। ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়নি। এর আগে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামের মতে কিশোরগঞ্জ নামের পূর্ব নাম ছিল হয়বতনগর। রেনেলের মানচিত্রেও কিশোরগঞ্জ শহরের অবস্থান দেখা যায় হয়বতনগর গ্রামে। বীর ঈশা খাঁর প্রভাব প্রতিপত্তির এবং আত্মীয়-স্বজনদের অবস্থান ছিল হয়বতনগরের। জমিদারদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এই এলাকায়। এর দক্ষিণ পাশের গ্রাম ছিল কাটাখালি। কাটাখালি গ্রামটি কোন ঐতিহ্যবাহী গ্রাম ছিল না। কিশোয়ার থেকে কিশোরগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। কিশোয়ার উর্দু শব্দ, এর অর্থ নবীন বা নতুন। কিশোরগঞ্জ মহকুমা গঠনের সময় একটি নির্দিষ্ট এলাকার সীমানা চিহ্নিত করে নামকরণ করা স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট নতুন এলাকাকে ফার্সী ভাষায় কিশোয়ার বলে থাকি। এই কিশোয়ার থেকে কিশোর এবং এলাকা শব্দের ফার্সী অর্থ গন্ধ থেকে কিশোরগঞ্জ হয়েছে বলে মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামের গবেষণায় জানা যায়। ঐ সময়ে কিশোরগঞ্জের অন্যান্য নামগুলোও ফার্সী ভাষা থেকে নেয়া হয়েছে। যেমন- বিন্নাটি (বিন+আটি), নগুয়া (নওগাঁও), ভিন্নগাঁও (ভিন+গাঁও) ইত্যাদি। আরো কয়েকজন লেখকের ধারণা- বত্রিশ এলাকার নন্দ কুমার প্রামাণিকের নাম থেকে কিশোরগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়েছে। এ মতামত দুর্বল পর্যায়ের। কারণ কিশোরগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়েছে ১৮৪৫ সালের পর কোন এক সময়ে। নন্দ কুমারের সময়কাল ছিল ১৮১০ সাল পর্যন্ত। তাছাড়া মূল নামটিতে কিশোর না থাকায় এ মতামতের গ্রহণযোগ্যতা নেই। প্রভাবশালী গ্রাম হয়বতনগরের পরেই কিশোরগঞ্জের নামের উৎপত্তি হয়েছে। কিশোয়ার থেকে কিশোরগঞ্জ হয়েছে এ মতামতটি এ যাবত প্রাপ্ত মতামতের মধ্যে অধিক গ্রহণযোগ্য। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে কিশোরগঞ্জ মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ রাজত্বের অবসানের পর মোমেনশাহী জেলা ছিল পূর্ব বাংলার বৃহত্তম জেলা। পরবর্তীতে পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম জেলা ছিল মোমেনশাহী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ১২ বছর পর ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ মহকুমা কিশোরগঞ্জ জেলার মর্যাদা লাভ করে। কিশোরগঞ্জ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গর্ব করার মত। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী জেলা কিশোরগঞ্জ। এ জেলার সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস অতি প্রাচীন। ষোড়শ শতাব্দীতে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলকে বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে আখ্যায়িত করা হতো। কালে কালে অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মীর জন্ম হয়েছে এ জেলায়। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন এমন প্রাচীন কবিগণ হলেন নারায়ণ দেব, দ্বিজবংশী দাস, চক্রবর্তী, রামেশ্বর নন্দী, সঞ্জয়, মাধব চার্য, কৃষ্ণদাস, নিত্যান্দ দাস, গঙ্গা নারায়ন, জগন্নাথ দাস, মুক্তারায় নাগ প্রমুখ এর মধ্যে কবি চন্দ্রবর্তী বাংলার ১ম মহিলা কবি ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীতে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবি লেখক সৃজনশীল সাহিত্য চর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তারা হলেন পুঁথি সাহিত্যর জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব মুন্সী আজিম উদ্দিন (করিমগঞ্জ), মুন্সী আবদুর রহীম, কিশোরগঞ্জ একটি নদীমাতৃক জেলা। কিশোরগঞ্জ জেলার ভিতর দিয়ে অসংখ্য নদী প্রবাহিত হয়েছে। মোট নদীর দৈর্ঘ্য ১১৫.৭০ বর্গ কি. মি.। উল্লেখযোগ্য নদ-নদীগুলো হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র, ধনু, নরসুন্দা, মেঘনা, সিংগুয়া, সুতী, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী, ঘোড়াউতরা, সোয়াইজানী। জেলার নদী বন্দর ২টি ভৈরব ও চামটা ঘাট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ