রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কালের সাক্ষী দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী বোরহানউদ্দিন চৌধুরী জমিদার বাড়ি

শাহে আলম (বরিশাল) : দ্বীপজেলা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ দেউলা-সাচরা ইউনিয়ন। ওই এলাকার প্রবেশ পথে পাকা রাস্তার পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন বেশ কিছু স্থাপনা। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম এসব স্থাপনাগুলো তৈরি করেছিলেন দক্ষিণ বাংলার তৎকালীন জমিদার বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ীর অনেক ঐতিহ্যই এখন বিলীন হয়ে গেছে। তবে এখনও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত বসত বাড়ি এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা। সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে  ভোলা জেলার একটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে এই চৌধুরী বাড়ী। যাকে ঘিরে রয়েছে শত বছরের পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য। যা বর্তমানে পড়ে রয়েছে অযত্ন আর অবহেলায়। তার বংশধররা ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হিসেবে এই বাড়িসহ গুরুত্বপুর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য সরকারের নিকট এর দাবি জানান।

বংশ পরিচিতি : অনুসন্ধান করে জানা যায়, সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে চলে আসেন শাহ সুজা, তখন তার সহকর্মীরা ছড়িয়ে পড়েন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে, তাদেরই একজন ছিলেন মো. হানিফ। তিনি প্রথমে বসতি শুরু করেন পটুয়াখালী জেলার পটুয়া এলাকায়, এরপর বসতি গড়ে তোলেন দেশের বৃহত্তম গাঙেয় দ্বীপ তৎকালীন ভোলা মহকুমায়। হানিফ সাহেবের পুত্র সন্তান হলেন মো. শরীয়ত উল্লাহ, তার চার সন্তান হলেন যথাক্রমে জহির উদ্দিন হাওলাদার, সমর উদ্দিন হাওলাদার, করিম উদ্দিন হাওলাদার ও কমর উদ্দিন হাওলাদার। এদের মধ্যে জহির উদ্দিন হাওলাদারের ঘরে জন্ম নেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন বিশাল সম্পদের মালিক এবং তৎকালীন ২৭ মৌজার জমিদার। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তাদের ছিল হাজার হাজার একর সম্পত্তি। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ‘চৌধুরীর হাট' গড়ে উঠেছে এই বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর নামেই। এমনকি বর্তমান ভোলা শহরের বিশাল অংশ ছিল তার জমিদারীর অংশ। তৎকালীন আমলে ভোলা শহরে প্রথম যে দু'টি পাকা দালান (ভবন) তৈরি হয়েছিল, তার একটির মালিক ছিলেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী, অন্যটি রজনী করের ভবন হিসেবে পরিচিত। বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বসতি গড়ে তোলেন বোরহানদ্দিনের সাচরা ইউনিয়নে। তখন দেউলা-সাচরাসহ পুরো এলাকার জমিদার ছিলেন তারা, পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকারের সময় তার নামানুসারেই ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার নামকরণ করা হয়।

শাহী মসজিদ ও বাড়ীর ইতিহাস : প্রায় দেড়শ বছর আগে নির্মিত এসব স্থাপনা আজো স্বমহিমায় টিকে আছে। বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রতিটি পরতে পরতে দেখতে পাওয়া যায় জমিদারী আর ঐতিহ্যের ছোয়া। বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির দরজায় স্থাপিত শাহী মসজিদটিও বেশ দৃষ্টিনন্দন। দিল্লী থেকে আনা স্বেতপাথর আর বেলজিয়ামের লোহা দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় মসজিদটি। এলাকায় প্রচলিত আছে যে, বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর তিন ছেলে ছিল, কিন্তু তিনি বলতেন- এই মসজিদটিও আমার একটি সন্তান। এই জমিদার বাড়ির স্থাপনাগুলো এখনো দৃষ্টি কাড়ে নতুন প্রজন্মের।

বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির দরজায় মুসাফিরদের জন্য ছিল তিনটি কাচারী ঘর। দূর-দুরান্ত থেকে আগত মুসাফিরদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল এখানে, কিন্তু এখন আর সেসব ঐতিহ্য নেই। মসজিদ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কয়েকশ' একর জমি রেখে গেছেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু সে সব জমির অধিকাংশই বেহাত হয়ে গেছে। বর্তমানে মসজিদের নামে ৮৪ একর জমি থাকলেও তার অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানায় ভোগ দখল চলে গেছে। জানা যায়-উক্ত বেহাত সম্পত্তি উদ্ধারের প্রচেষ্টা চলাচ্ছেন তার বংশধররা।

বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর প্রো-পৌত্র আলহাজ্ব এডভোকেট শহীদুল হক নকীব চৌধুরী জানান, আগামী ২১ বৈশাখ ১৪১৯ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার পালিত হবে বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর ১০০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর বংশধরদের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ ও কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ