রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া: প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়

খন রঞ্জন রায় : নবীন প্রজন্মের শিক্ষা চর্চার উপর নির্ভর করে জাতির সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ। জাতির বুদ্ধিবৃত্তি, সুকুমার বৃত্তি, মেধাবৃত্তি, সংস্কৃতিচর্চায়, সৃজনশীল হওয়ার যে রূঢ় বাস্তব মাধ্যম সেটি অবশ্যই শিক্ষা। অপশক্তি অবিশ্বাস আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে সক্রিয় শক্তি হিসেবে মুক্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় শিক্ষা সাংস্কৃতিক চর্চা। সমাজের সকল অপশক্তি অপরাধীর দুর্বৃত্তপনার অপ্রতিরোধ্য গতিরোধ ও নির্মূলে দায়িত্বশীলতা নিষ্ঠা বিকশিত করে সংস্কৃতি। আমাদের সমাজ জীবনে চারপাশকেন্দ্রিক অবক্ষয়, অস্থিরতা, বিপর্যয়, বিভীষিকা মোকাবিলার দুর্জয় শক্তি সাহস উপলব্ধি ঘটায় শিক্ষা সাংস্কৃতিক বন্ধন।

হিংসা হানাহানি সম্পদ ঐশ্বর্য্য লুটতরাজের গ্লানি সংকট মোচনে বুদ্ধি বিবেকের মূর্তপ্রতীক হিসাবে আবির্ভূত হয় আত্মজ সংস্কৃতি। সংস্কৃতির এই অবলম্বনগুলোকে ইতিবাচক রূপে উপস্থাপনের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা সর্বোপরি আরাধনা। মুক্তিরযুদ্ধ করে দেশ ও জাতি স্বাধীনতা পেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘ চার দশকে আপন ভাষা সংস্কৃতি ঐশ্বর্য বিষয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আত্মোপলব্ধির সাংস্কৃতিক বৈকল্যে নিপতিত হয়ে নির্বোধের প্রশান্তিতে মগ্ন হয়েছে। উত্তরাধিকার হিসাবে শিক্ষা সংস্কৃতির উন্মক্তো হিংস্র আক্রমণে প্রতিরোধ তাগিদ অনুভব অর্জন থেকে সামগ্রিক বিচ্যুত হয়েছে।

জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, বিদ্যায়-বুদ্ধিতে, মেধায়-সমৃদ্ধিতে, আত্মজিজ্ঞাসায় বসবাসযোগ্যতায় বিশ্বস্ত অবস্থান নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন শিক্ষা সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া হতে পারে যোগ্য স্থান, ভারসাম্যপূর্ণ নিশ্চিত পরিকল্পনার অংশ।

প্রাচীন সমতট জনপদের ঐতিহাসিক ঈসা খাঁর প্রথম রাজধানী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। মেঘনা, তিতাস নদী বিধৌত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ১৮৩০ সালে পরগনার স্বীকৃতি পাওয়া ১৮৬৯ সালে পৌরসভায় উন্নীত সমৃদ্ধ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অধিকারী এই জেলা। ২৫ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটারের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দূরত্ব ঢাকা থেকে মাত্র ১০২ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ঘনত্বের বিচারে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে নবম স্থানে। বিশ্বব্যাপী নিরাপদ সংস্কৃতি প্রচার-প্রসারে এই জেলার অধিবাসীরা কাক্সিক্ষত শৃঙ্খল সচেতন ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। চাকরি নিয়ে বিদেশ গমনে এই জেলার তরুণদের অবস্থান বৃহত্তর চট্টগ্রামের পর দ্বিতীয় স্থানে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কলা-কৌশলে প্রভাবশালী অবস্থান নিশ্চিত করেছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই জেলার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত প্রতিটি সংগ্রাম সাফল্যে সুখ্যাতিতে এই জেলার তরুণদের আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ হৃদয়গ্রাহী আবেগ অনুভূতির জোরালো লক্ষ্য স্থির হয়েছিল।

খনিজ, শিল্প, যাতায়াত, নৌ, রেল, সড়ক এর বিড়ম্বনাহীন ব্যবস্থা এই জেলার অন্যতম আদর্শ। দেশে আবিষ্কৃত ১৯টি গ্যাসফিল্ডের মধ্যে কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আছে ৩টি। তিতাস, মেঘনা আর সালদা গ্যাস ফিল্ড দেশের জ্বালানী ব্যবস্থাকে করেছে নির্ভরশীল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত তানজেব মসলিন, ব্রিটিশ আমলের রাধিকার বেতের টুপি হাল আমলের আশুগঞ্জ সারকারখানা, চম্পক নগরের ঐতিহাসিক নৌকা, জেলাবাসীর আর্থিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে বিদেশমুখী হয়েছে। নতুন প্রজন্ম সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের চিন্তা-চেতনায় ১৯২২ সাল থেকে দৈনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়মিত প্রকাশ হয়ে মানবকল্যাণে দুর্মর জ্বলন্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

১৮৭৫ সাল থেকে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৩৬ সাল থেকে সরকারি মডেল বালিকা বিদ্যালয়, ১৩৩৪ হিজরী থকে রামকানাই জামিয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া মাদরাসা, ১৮৯৯ সাল থেকে নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, অটল বিহারী কুটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এলাকার বিদ্যোৎশাহীরা শিক্ষা সংস্কৃতি দক্ষতায় অবতীর্ণ হয়ে জীবনকে উৎসর্গ করে  গেছেন।

১৬৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরফান্নেসা মসজিদ, নাটঘর শিবমন্দির, কালিকচ্ছ বাসুদেব মূর্তি, কালভৈরব মন্দির, ষোড়শ শতাব্দীর আরফাইল মসজিদ, দেবগ্রাম বৌদ্ধ বিহার, এন্ডারসন স্মৃতি সৌধ, নিউজিয়াম ও আর্কাইভ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন করছে। এখানের ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় সামাজিক অস্থিরতায় বিভক্ত হলেও লোকজ কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালনে সমব্যথী।

ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, কবি, সাহিত্যিক, সৈনিক, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, ওস্তাদ, শহীদ, বুদ্ধিজীবী, দানবীর, ছন্দবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সঙ্গীতজ্ঞের জন্ম ধন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া। খাঁ পরিবারে জন্ম নেয়া জ্ঞান তাপস ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীত চর্চা সাধনা ও আরাধনায় দেশের গ-ি ছাপিয়ে বিশ্বখ্যাত করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে।

সমকালীন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাসীর জ্ঞান বিজ্ঞান, শিক্ষা সংস্কৃতির অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধন ব্যতিত নিজস্ব অস্তিত্ব বিপন্নের মুখোমুখি হবে। সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে সংস্কৃতি নির্ভর সমাজ বিনির্মাণের পরিকল্পনায় বিশ্বজনীন হওয়া অবশ্য করণীয়।

সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে পারে ইতিহাস রচনার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ