সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সৈয়দ মোস্তফা কামাল ঃ প্রেরণার অভিভাবক

জাহেদুর রহমান চৌধুরী : জীবনে চলার পথে বহু মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়ে থাকে। এর মধ্যে কখনো কখনো বিরল গুণের অধিকারী কিছু মানুষ। অনেক গুণে গুণান্বিত, বিশেষ গুণে ভূষিত। বিচিত্র গুণে কেউবা গুণি, মানবীয় গুণ, সামাজিক গুণ, ধর্মীয় গুণ, পিতৃ-মাতৃসুলভ গুণ, ভ্রাতৃসুলভ গুণ, বন্ধুসুলভ গুণ ইত্যাদি। তাঁদের আচার-আচরণ, চলাফেরা দেখে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে কিছু শব্দ। ভাল মানুষ, প-িত মানুষ, বিজ্ঞ মানুষ, চমৎকার মানুষ ইত্যাদি।

তেমনিই একজন ব্যক্তি বিশিষ্ট লেখক গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল। শুধু লেখকই নয়, কথায় কাজে আচরণে অনুকরণীয়। সিলেটের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন প্রতিদিনের উচ্চারিত ব্যক্তিত্ব। প্রতিদিন এ জন্যই বললাম পত্রিকা খুললেই যার লেখা প্রায় পাওয়া যায় তিনি গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল। উনাকে দলমত নির্বিশেষে সকলের অনুষ্ঠানে পাওয়া যায়। সদা হাস্যউজ্জ্বল গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল যখন আলোচনা রাখেন তখন সবাই পিনপতন নীরবতা পালন করে বক্তব্য শুনে, তাই অনেকে বলেন রম্য আলোচক। বক্তব্যের সময় আরবী, উর্দু এবং আল্লামা ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ফররুখ, কবি আফজাল চৌধুরীসহ বিভিন্ন কবিদের উক্তি উল্লেখ করেন। সিলেটের সর্বমহলের কাছে তিনি হলেন সম্মানিত ব্যক্তি।

তাই তো সিলেটের সকল মহলের প্রতিনিধিদের নিয়ে তাকে ২০১২ সালে দেয়া হয়েছে সংবর্ধনা। আর এই সংবর্ধনা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে স্মারক গ্রন্থ।

একজন লেখক সম্পর্কে লিখতে হলে জানতে হয় তার লেখা। লেখার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে। চিন্তার জগত প্রস্ফুটিত হয় তার রচিত গ্রন্থরাজির মধ্যে। বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামালের লেখা যতটুকু পড়েছি এর চাইতে বেশি উনার সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামালের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৯ সালে। আমি তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে বছর হযরত শাহজালাল (র:) নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নাম কতিপয় বিতর্কিত ব্যক্তির নাম সংযোজন করার প্রতিবাদে নামকরণ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। তখন আমরা সিলেটের বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ করি, সেই সুবাদে উনার সাথে পরিচয়। অপরদিকে কল্যাণ ব্রতের কবি আফজাল চৌধুরী ছিলেন সিলেট সংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি। ২০০৪ সালে উনার ইন্তিকালের পর সভাপতি হলেন সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন খান। ২০০৬ সালে উনার ইন্তিকালের পর সংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি হলেন গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল এবং সেক্রেটারি হলাম আমি। তখন থেকে একান্তভাবে কাছে মেশার সুযোগ হয় আমার।

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল শুধু প্রাবন্ধিকই নন। তিনি ছিলেন শিকড় সন্ধানী লেখক। সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে লিখেছেন অনেক গ্রন্থ। সৈয়দ মোস্তফা কামালের মানবীয় গুণাবলী ছিল অতুলনীয়। তিনি নবীনদের উৎসাহিত করতেন, প্রেরণা দিতেন। সাহিত্য সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কম হলে তিনি বলেন উপস্থিতি বেশি না হলে সমস্যা নেই, যারা এসেছে তাদেরকে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ আমাদের সমাজের মানুষ এগ্রিক্যালচার বুঝে, কিন্তু ক্যালচার বুঝে না।

তিনি হলেন তৌহিদে বিশ্বাসী। কারণ প্রায় সময় বলতেন যারা আদর্শের প্রতি অনড় তাদেরকে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসবে, এমন লোককে দাওয়াত দেবে না, যারা আল্লাহকে খুশী রাখে আবার শয়তানকেও খুশী রাখে।

সিলেট সংস্কৃতি কেন্দ্রের আলোচনা সভা, সমাবেশ, র‌্যালি যখনই কোন অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিয়েছি সাথে সাথেই তিনি রাজী হয়ে যেতেন। দু’টি ঘটনা না বললেই নয়। ২০০৯ সালের ১লা মে শ্রমিক দিবস উপলক্ষে সংগীত পরিবেশনার আয়োজন করি দুপুর ২ টায় কোর্ট পয়েন্টে। কিন্তু ১১ টায় জানলাম ২ টায় করা যাবে না রাজনৈতিক সমস্যা আছে। তাই ১২ টায় করতে হবে। যথারীতি সবাইকে ফোন করে বলি। অনেকে সময় পরিবর্তন করার জন্য আপত্তি করলেন কিন্তু সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবকে ফোন করার সাথে সাথে চলে আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন না কেন সময় পরিবর্তন হল।

২০১২ সালের ৬ মার্চ সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রতিনিধি সম্মেলন হয়, এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার আবুল কাশেম মিঠুন, সভাপতি সৈয়দ মোস্তফা কামাল। সম্মেলনের দাওয়াত দেয়ার সময় তিনি বললেন, আমি অসুস্থ বাসা থেকে বের হতে পারছি না, তাই আমার জন্য দোয়া করবে। কিন্তু সম্মেলনের দিন যখন আবার ফোন করি, তখন তিনি বললেন আমি সম্মেলনে যাব আমাকে নিয়ে যাবে। যথারীতি উনাকে সম্মেলনে নিয়ে আসি। অথচ তিনি ছিলেন অসুস্থ। এভাবেই সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত যখনই অনুষ্ঠান হতো সকল অনুষ্ঠানে যথাসময়ে যাকে পেয়েছি তিনি হলেন সৈয়দ মোস্তফা কামাল। উনার এই আন্তরিকতা আজীবন স্মরণ থাকবে।

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন ষাট দশকের শক্তিমান কল্যাণ ব্রতের কবি আফজাল চৌধুরী ফাউন্ডেশনের সভাপতি। সেই সুবাদে উনার সাথে আরো গভীর সম্পর্ক ছিল। আফজাল চৌধুরী ফাউন্ডেশনের ব্যানারে প্রায় সময়েই সিলেটে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু হবিগঞ্জ শহরে কোন অনুষ্ঠান হয়নি। ২০১২ সালে ফাউন্ডেশনের এক সভায় কবি মুকুল চৌধুরী, শাহ নজরুল ইসলাম সবাই পরামর্শ দিলেন হবিগঞ্জ শহরে একটি আফজাল চৌধুরী স্মরণ সভা করার জন্য। সেই স্মরণ সভা হবে আফজাল চৌধুরী ফাউন্ডেশনের ব্যানারে। যখন সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবকে বললাম, আপনাকে হবিগঞ্জ যেতে হবে, যেহেতু আপনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি। বলার সাথে সাথেই অসুস্থ থাকার পরও তিনি রাজী হয়ে গেলেন। এর পর উনাকে নিয়ে ১৯ মার্চ ২০১২ হবিগঞ্জ প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ সভা। সেই সভায় বৃন্দাবন সরকারী ডিগ্রী কলেজের একাধিক সাবেক প্রিন্সিপাল, পৌরসভার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, অনেক মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সৈয়দ মোস্তফা কামালকে সবাই যেভাবে সম্মান দেখালেন তাতে অভিভূত হই।

হবিগঞ্জে স্মরণ সভা করার মাস খানিক পরে শুনতে পেলাম সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেব গুরুতর অসুস্থ। তাই উনাকে দেখার জন্য আমি, মুহাম্মদ জুন্নুরাইন চৌধুরী, তাহেরা ফোয়ারা চৌধুরী উনার বাসায় যাই ও কুশলাদি জিজ্ঞেস করি এবং উনাকে হবিগঞ্জের অনুষ্ঠানের ছবি দেখাই। উনি ছবি দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে উনার দুই ছেলেকে ডেকে বললেন, দেখ তোমাদের বাবা কি কাজ করছে, তোমরা আমার কাজকে স্মরণ না করলেও এরা তা স্মরণ করবে।

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল যখনই কথা বলতেন তাতে স্মরণ করতেন কল্যাণ ব্রতের কবি আফজাল চৌধুরীর কথা। তিনি বলেন আফজাল চৌধুরী আমাকে হবিগঞ্জ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেটে নিয়ে আসার কারণে লেখালেখিতে বেশি সময় দিতে পেরেছি। উনি প্রায়ই বলতেন আফজাল চৌধুরীর মতো আমাদেরকে সাহিত্যে আদর্শের প্রতি অনড় থাকতে হবে। বাতিলের কাছে মাথা নত করা যাবে না। কাব্যিকভাবে বললেনÑ

বাংলার ধ্যানী কণ্ঠ/কবি আফজাল/মর্দে মুজাহিদ রূপে/ভেঙ্গেছে জঞ্জাল/হক পথে করেছে যে/জিন্দেগী যাপন/বাতিলের মোকাবেলায়/জেহাদী জীবন।

সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামালের সাহচর্যে কাটানোর সুযোগ হয়। এই সাহচর্যের কারণে যদি দাবি করি যে, তিনি আমাকে বেশি ভালবাসেন, তবে তা বাড়িয়ে বলা হবে না। আবার এমন দাবি শুধু আমি নই, সিলেট-হবিগঞ্জ পর্যন্ত তাঁর সাথে নিবিড় সংসর্গে আসা যে কোন ব্যক্তিই করতে পারেন। অর্থাৎ ব্যাপারটা এই দাঁড়ালো যে, গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামালের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা যার সঙ্গেই থাকুক না কেন, সে ব্যক্তি অনায়াসেই দাবি করতে পারেন যে, “সৈয়দ মোস্তফা কামাল” তাকেই বেশি ভালবাসেন। যার প্রমাণ এই গণসংবর্ধনা।

শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মোস্তফা কামাল আজ আর নেই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। মহান আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করি, যেন উনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।  আমীন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ