বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২০
Online Edition

অনুকরণীয় শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : বর্তমানে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব লিমিটেড দেশের সেরা ক্লাব। এ গ-ি পেরিয়ে এখন দেশের বাইরের সেরা ক্লাব শেখ জামাল। পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ক্লাব বাংলাদেশের শেখ জামাল। সাফল্যই কথা বলছে দলটির হয়ে। গত তিন বছরে তিনটি টুর্নামেন্ট খেলে সবটিবেই ফাইনালে পৌঁছেছে বাংলাদেশের ক্লাবটি। তার মধ্যে আবার দুটিতে জয় করেছে শিরোপা। তাহলে সহজাতভাবেই ধানমিন্ড অভিজাত পাড়ার ক্লাবটিকে সেরার স্বীকৃতি দিতে কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়। বিদেশের মাটিতে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। সে সময় সদ্যই ধানমন্ডি ক্লাব থেকে নাম বদলে হয়ে গেছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব লিমিটেড। সমালোচকরা কটু কথা বললেও ক্লাবটি এখন বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন করে পরিচয় করাচ্ছে।
অভিষেকেই জয় করেছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। দেশের বাইরেও অব্যাহত থাকে সাফল্যের সে ধারা। এবার তাতে যোগ হলো ভুটানের কিংস কাপ। ফাইনালে ভারতের পুনে এফসিকে ১-০ গোলে পরাজিত করে একরকম ইতিহাস সৃষ্টি করেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে শেখ জামাল। গত চার বছরে নেপাল, কলকাতা ও ভুটানের তিনটি টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার যোগ্য অর্জন করে ক্লাবটি। যার মধ্যে দুটিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি রানার্সআপ হয় বাকি টুর্নামেন্টে। এতেই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পরিচিতির নতুন মাধ্যম হয়ে গেছে শেখ জামাল। গত পাঁচ বছর ধরে দেশের শীর্ষ লিগে খেলা দলটি প্রতি বছরই শক্তিশালী দল গড়ে। যার ফলও সাফল্যের মাধ্যমে পেয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের পেশাদার লিগের তিনবারের চ্যাম্পিয়নরা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ক্লাবেও পরিণত হয়েছে। একটা সময় বাংলাদেশের আবাহনী-মোহামেডানের পাশাপাশি ভারতের ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানরা দাপট দেখিয়েছে। সে রাজত্বে ভাগ বসিয়েছে বাংলাদেশের সেরা ক্লাবটি। বিদেশের মাটিতে নিয়মিত সাফল্য পাওয়ার কারণে এখন বেশি বেশি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্য ক্লাবটির।
দলটি টেক্কা দিচ্ছে আবাহনী-মোহামেডানকে। এমনিতে দেশের বাইরে ক্লাব হিসেবে সবচেয়ে সফল আবাহনী লিমিটেড। ভুটানের কিংস কাপের এবারের আসরের শুরুতে ঢাকা আবাহনী লিমিটেডকে ফেবারিট ভেবেছিল আয়োজক থেকে শুরু করে দেশটির ফুটবল ভক্তরা। ম্যাচের পর ম্যাচ খেলার মাধ্যমে সে ভুলও ভেঙ্গেছে তাদের। যখন আবাহনী গ্রুপ পর্ব থেকেই বদায় নেয় তখন। চার ম্যাচে অংশ নিয়ে একটিতে জয়, একটিতে ড্র আর বাকি দুই ম্যাচে পরাজিত হয়েছে ঢাকার জায়ান্টরা। আবাহনী ব্যর্থ হলেও আলো ছড়িয়েছে শেখ জামাল। পুরো টুর্নামেন্টে দাপটের সাথে খেলেই জয় করেছে শিরোপা। এর আগে আবাহনী ও জামাল দুদলের স্বপ্নই ছিল শিরোপা জয় করা। ভুটানের কিংস কাপে এবারই প্রথম অংশ নিচ্ছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব। যে দলটি নিয়ে কিংস কাপ খেলেছে শেখ জামাল, সে দলটি আইএফএ শিল্ডের অভিজ্ঞতালব্ধ। যদিও অধিনায়ক মামুনুল ইসলামকে টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময় ধারে চেয়ে পায়নি ক্লাবটি। তার অ্যাটলোটিকো ডি কলকাতা অনুমতি না দেয়ায় খেলা সম্ভব হয়নি। আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টটিতে গতবার অংশ নিয়েছিল টিম বিজেএমসি ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। গেল আসরে বলার মতো সফলতা পায়নি ক্লাব দুটি। সাফল্য পাওয়ার মতো তেমন শক্তিশালী ছিল না দল দুটি। হাইতির সনি নরদে, ওয়েডসন এনসেলমি ও নাইজেরিয়ার ফরোয়ার্ড এমেকা ডারলিংটনের কল্যাণেই কলকাতার আইএফএ শিল্ডে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করে শেখ জামাল। ওই আসরে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও, ঠিকই শিরোপা ঘরে তুলেছিলো ফেডারেশন কাপ ও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের। এবার সে আসরের কষ্টটা কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।
অনেকেই চিন্তায় ছিলেন সমসাময়িক সময়ে ঢাকার মাঠে অন্যতম সেরা বিদেশী খেলোয়াড় সনি নরদেকে নিয়ে। গত মওসুম শেষ করে এ হাইতিয়ান এখন ভারতের মোহনবাগানে। জামালের অন্যতম প্রাণভোমড়া সনি নরদে না থাকার অভাবটা এক ম্যাচেও টের পায়নি জামাল।
গতবার শেখ জামালের হয়ে খেলেছিলেন সনি। কিংস কাপে সেই সনিকে দেখা গেছে মোহনবাগানে হয়ে মাঠে নামতে। কিংস কাপের এবারের আসরে ‘এ’ গ্রুপে শেখ জামালের সঙ্গে ছিল স্বাগতিক ভুটানের দুর্ক ইউনাইটেড ভারতের মোহনবাগান ও থাইল্যান্ডের নাখোন রাতসিং মাজদা। আর ‘বি’ গ্রুপে আবাহনীর সঙ্গে রয়েছে আসাম ইলেকট্রিসিটি, নেপালের এমএমসি, থাইল্যান্ডের ওসোতাসপা এফসি ও ভুটানের উজ্ঞান ফুটবল একাডেমি। গত বছর ভুটানের কিংস কাপকে তেমন গুরুত্বই দেয়নি বাফুফে। তাদের কাছে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল থাইল্যান্ডের দুই নিম্নমানের দলের সাথে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলা!
অথচ থাইল্যান্ড না গিয়ে কিংস কাপে অংশ নিলে সাফের প্রস্তুতিটা ভালো হতো বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের। যেমনটা হয়েছিল ২০০৩-এর সাফ ফুটবলের সময়। তখন ভুটানের জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েই সাফে শিরোপা জয়ের আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিল। বাফুফে পাহাড়ঘেরা শীতের দেশটির টুর্নামেন্টের গুরুত্ব না বুঝলেও বুঝেছে শেখ জামাল ধানমন্ডি কাব ও ঢাকা আবাহনী। বিদেশের মাটি থেকে আবাহনীর একাধিক ট্রফি জয়ের কৃতিত্ব আছে। সেখানে শেখ জামালের অর্জন কলকাতার আইএফএ শিল্ডে রানার্সআপ হওয়া। ২০০৪ সালে এই কিংস কাপের সেমিতে বিদায় নিয়েছিল আবাহনী। এবার আর শেষ চারে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি ক্লাবটির।
এখন মেখ জামাল দেশের বাইরে নিয়মিত টুর্নামেন্টে খেলার ওপরই জোর দিয়েছে। দেশের দুই ঐতিহ্যবাহী দলের একটি মোহামেডান লিগ শিরোপা পায়নি গত এক যুগ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু করে দেখাবে, সেই সুযোগই পায় না তারা এখন। এবারের কিংস কাপেই যেমন খেলার আগ্রহ দেখিয়েছিল দলটি। কিন্তু লিগ চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হিসেবে শেখ জামাল ও আবাহনী নিয়ে নিয়েছে সেই সুযোগ। তবে আবাহনীও সুযোগ কাজে লাগানোর মতো দল নয় এখন। এই মওসুমে জামাল, রাসেল ঘর গুছিয়ে ফেলার পর তৃতীয় স্তরের দল সাজিয়েছে তারা। কিংস কাপ সামনে রেখে শেখ জামাল লম্বা প্রস্তুতি নিয়েছে, চ্যাম্পিয়নশিপই ছিল তাদের লক্ষ্য। সেখানে আবাহনী অল্পকিছু দিনের অনুশীলনে ভুটান গেছে, ক্লাব থেকেই বলা হচ্ছিল, এটা নতুন মওসুমের প্রস্তুতি টুর্নামেন্ট তাদের। অথচ দেশের ঐতিহ্যবাহী দলটির ঐতিহ্যই হলো যেকোনো ম্যাচে জয়ের জন্য নামা আর যেকোনো টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্যই খেলা। সে আত্মবিশ্বাসটাই এখন ধানমন্ডিরই ক্লাব শেখ জামালের। দেশের পেশাদার ফুটবলে তাদের আগমনই চমক জাগিয়ে। প্রথমত, তারা দ্বিতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ কোনো কিছুই খেলেনি। ২০০৪ সালে প্রথম বিভাগ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যাওয়া ধানমন্ডি ক্লাবের নাম বদলেই ২০১০ সাল থেকে তাদের নিজেদের পথচলা শুরু। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ফুটবল উন্নয়নের স্বার্থেই শর্তযুক্তভাবে শেখ জামাল ধানমন্ডিকে সরাসরি পেশাদার লিগে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই শর্তগুলো যে তারা ঠিক ঠিকই পূরণ করতে পেরেছিল তার প্রমাণ প্রথম আসরেই তাদের শিরোপা জিতে নেয়া।
সেই শিরোপায় পাতানো ম্যাচের দাগ থাকলেও এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়, প্রথম মওসুমে দেশসেরা সব তারকা দলে ভিড়িয়ে তারা চ্যাম্পিয়ন দলই গড়েছিল। কে ছিলেন না সেই দলে! মামুনুল ইসলাম, জাহিদ হাসান, জাহিদ হোসেন, আরিফুল ইসলাম, এনামুল হক, ওয়ালি ফয়সাল, রেজাউল করিম, আতিকুর রহমান মিশু, গোলরক্ষক আমিনুল। অর্থাৎ প্রথম আসরেই বিশাল বাজেটের দল গড়ে ধানমন্ডির ক্লাবটি। পেশাদার লিগের ক্লাব হিসেবে নিজস্ব মাঠের চাহিদা ছিল, শেখ জামাল পূরণ করে সেটিও। ধুলো ওড়া ধানমন্ডির ন্যাড়া মাঠ শেখ জামাল ক্লাবের পরিচর্যায়ই সাজে নতুন করে। ক্লাবের অন্য কার্যক্রমেও পেশাদারি ছাপ। শুরু থেকেই লিমিটেড কোম্পানি তারা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রথম থেকেই এবং এখনো দলটির পৃষ্ঠপোষক এই ব্যাংকটি। প্রথম মওসুমে লিগ শিরোপার পাশাপাশি ফেডারেশন কাপে রানার্সআপ ট্রফি জেতে ধানমন্ডির এই দল। কমলাপুর স্টেডিয়ামে সেই আসরে আবাহনীর বিপক্ষে এক জমজমাট ফাইনাল উপহার দিয়েছিল তারা। ফুটবলের মান যখন পড়তির দিকে, স্টেডিয়ামে যখন দর্শক খরা- এমন একটা সময়ে জৌলুসের সঙ্গে দেশের ফুটবল অঙ্গনে শেখ জামালের নাম লেখানো সত্যিই বড় ঘটনা হিসেবে ধরা দেয়। এ পর্যন্ত মোট চারটি মওসুম খেলেছে তারা পেশাদার ফুটবলে। দ্বিতীয় মওসুমের প্রথম আসর ফেডারেশন কাপ আর নেপালে সাফল পোখরা কাপ জিতলেও লিগ তাদের ভালো যায়নি, বারবার কোচ বদল হয়েছে। সার্বিয়ান কোচ জোরান কার্লোভিচ টিকতে পারেননি, সাইফুল বারী টিটু, আবু ইউসুফ, এমনকি শ্রীলঙ্কার পাকির আলীও দায়িত্ব নিয়েছিলেন; তারাও খুব বেশি দিন স্থায়ী হননি। ২০১২-১৩ মওসুমে শেখ জামালেই খেলোয়াড় হয়ে আসা নাইজেরীয় জোসেফ আফুসির কাঁধে ওঠে দলের দায়িত্ব।
এই মওসুমটা কোচ, খেলোয়াড় সবার জন্যই ছিল দারুণ চ্যালেঞ্জিং। সে সময় খাতা-কলমে সেরা দল গড়ে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র। স্থানীয়দের মধ্যে দ্বিতীয় সেরারাই তখন শেখ জামালে, সঙ্গে দুই বিদেশী সানডে চিজোবা ও মাইক ওতোজারেরি স্ট্রাইকিং জুটি- এই খেলোয়াড়রাই পুরো মওসুমে রাসেলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছেন। লিগ, ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপ-তিনটি টুর্নামেন্টেই ফাইনালে খেলেছে; কিন্তু শিরোপা জেতা হয়নি। শেষ মুহূর্তের গোলে হলেও তিনটি ট্রফিই জিতেছে শেখ রাসেল।
পরের মওসুমে এই আক্ষেপ ঘোচাতেই শেখ রাসেলের ঘর ভেঙেই তারা দল গড়ে। রেকর্ড মূল্যে কিনে নেয় সনি, মামুনুলদের। সভাপতি মঞ্জুর কাদেরের এই চেষ্টা যে বৃথা যায়নি, ফেডারেশন কাপের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো লিগ শিরোপাও জিতে নেয় তারা। লিগের মাঝপথে আইএ শিল্ডে খেলতে গিয়ে গড়ে আরেক কীর্তি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় দল হিসেবে টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শুধু নয়, টানা দুই ম্যাচে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে কলকাতার ফুটবল ঐতিহ্যকেই নাড়িয়ে দিয়ে এসেছিল তারা। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই শেখ জামালের আন্তর্জাতিক খ্যাতি। সেই অবস্থান হারাতে চায়নি বলেই ২০১৪-১৫ মওসুমেও তাদের বিগ বাজেটের দল। প্রথম চ্যালেঞ্জটিই নেয় তারা কিংস কাপের। ভুটানের এই আসরেও অংশ নেয় মোহনবাগান, সঙ্গে শক্তিশালী পুনে এএফসি, নেপালের চ্যাম্পিয়ন মানাং মার্সিয়াংদি ও থাইল্যান্ডের দল নাখং রাচাসিমা। ফলে টুর্নামেন্টের গুরুত্ব বাড়ে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও।
আবাহনী গ্রুপ পর্বে বিদায় নিলে কী হবে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেখ জামাল সেই যে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে, তা সমুন্নত রাখতেই আরেকবার ঝাঁপায়। ঠিকই কেউ তাদের বাধা হতে পারেনি। মোহন বাগানকে মুখ লুকাতে হয় পাঁচ গোলের লজ্জা নিয়ে, গত আসরের চ্যাম্পিয়ন এমএমসির-ও আত্মসমর্পণ। ফাইনালে পুনের বিপক্ষে শেখ জামালই ছিল ফেভারিট। আইএফএ শিল্ডে ভাগ্যদেবী তাদের ফিরিয়েছিলেন, এবার আর পারেননি। ভুটানের রাজার হাত থেকে ট্রফি নিয়েই তারা দেশে ফিরেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ