ঢাকা, শনিবার 30 May 2020, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৬ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকে আরও ৩১৩৬ কোটি টাকার জালিয়াতি

সরকারি খাতের সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকে আরও ৩ হাজার ১৩৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে জালিয়াতির ঘটনা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির পরিমাণ আরও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকায়। আগে এর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। হলমার্কের জালিয়াতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকা অঞ্চলের নয়টি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়েছে ৫১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। একই ব্যাংকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫টি শাখায় আরও ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করার ক্ষেত্রে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে এসব অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে এসেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অগ্রণী ব্যাংকের তিন শাখার ব্যবস্থাপককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের ৩৫ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনটি দুই ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের তদারকি ও জাল-জালিয়াতি কেন হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব বিষয়ে কি পদক্ষেপ নিয়েছে সেসব বিষয়েও প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই বিভাগ থেকে তা জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। ২ জুলাই ওই কমিটির বৈঠকে এই প্রতিবেদনগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে।
বৈঠকে সরকারি খাতের সোনালী, অগ্রণী এবং বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত নানা অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনকে আহ্বায়ক করে গঠিত উপকমিটির বাকি তিন সদস্য হলেন- আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, এবি তাজুল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তদন্ত কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরুর সভাপতিত্বে এ সভায় কমিটির সদস্য, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটি সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে সোনালী, অগ্রণী এবং বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেংকারি নিয়ে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। তিনি বলেন, এজন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, কমিটি তিন ব্যাংকের আর্থিক কেলেংকারির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে।
এছাড়া প্রতিবেদনে বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি ও চার ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জালিয়াতির বিষয়ে ব্যাংকগুলো কি ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সেগুলো আলোচনা করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংকের সাবেক শেরাটন হোটেল শাখা কর্তৃপক্ষের পেশাদারিত্বের প্রতি চরম অবজ্ঞা, বেপরোয়া ও নিজ ক্ষমতাবহির্ভূত ব্যাংকিং করায় এই বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বাকি ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে কোনো সম্পদ নেই। হলমার্ক গ্রুপের কাছে সোনালী ব্যাংকের এখন পর্যন্ত ফান্ডেড বা নগদ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩ কোটি এবং নন-ফান্ডেড বা পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডের অংশের ১ হাজার ২২৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। ৩১ মে পর্যন্ত হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫২৪ কোটি টাকার ঋণ আদায় করা হয়েছে। পরোক্ষ ঋণের বিষয়ে বিশদ পরিদর্শন আপাতত বন্ধ আছে। ওইসব ঋণ আদায়ের কোনো ব্যবস্থাও এখনও নেয়া হয়নি। কেননা ওইসব ঋণ গ্রাহক পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা নগদ ঋণের পরিণত করা হবে। এরপর ব্যাংক তা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারবে।
এদিকে সোনালী ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে দেয়া নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধার অর্থ পরিশোধ করছে না ব্যাংক। ফলে ১১টি ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা করেছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক ৭টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ১টি, যমুনা ব্যাংক ৩টি, আইএফআইসি ব্যাংক ২টি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৬টি, ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক ২টি, ন্যাশনাল ব্যাংক ৮টি, উত্তরা ব্যাংক ৫টি, অগ্রণী ব্যাংক ১৬টি, সাউথইস্ট ব্যাংক ১টি এবং প্রাইম ব্যাংক ২টি মামলা করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতির সম্পর্কে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সংঘটিত অনিয়ম সম্পর্কে বেসিক ব্যাংকের নতুন পর্ষদকে অভিহিত করা হয়েছে। তারা ওই জালিয়াতির ঘটনার বিষয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করছেন। এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর বেসিক ব্যাংকের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের যেসব গ্রাহকের হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত যাদের পাওয়া গেছে তাদের ঋণ নবায়ন করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহককে দেয়া ঋণের দায় স্বীকার করানো হচ্ছে। পরে গ্রাহক আবার খেলাপি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অগ্রণী ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৫১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যাপ্ত জামানত না নিয়ে ঋণ বিতরণ, ঋণ পরিশোধে গ্রাহকের সক্ষমতা বিচার না করা, ব্যাংকিং বিধি ভঙ্গ করার মাধ্যমে এসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করায় ওই পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে ব্যাংকের। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক এলাকা কর্পোরেট শাখা থেকে ইলিয়াস ব্রাদার্স ২২৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা, এপিটি ফ্যাশন ওয়্যারস ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং আগ্রাবাদ শাখা থেকে এসকেএম জুট মিলস ২০ কোটি ১৮ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নিয়েছেন। এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা কর্পোরেট শাখার ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলামসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যান্য শাখার বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এছাড়া ঢাকার প্রধান শাখা থেকে এসডিএস ইন্টারন্যাশনাল ১৫০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, একই শাখা থেকে সাত্তার টেক্সটাইল মিলস ৪৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, একই শাখা থেকে গুডউইল বেসিক কেমিক্যালস ১৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা, আমিনকোর্ট শাখা থেকে ওয়ানটেল কমিউনিকেশনস ১৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা থেকে রুমা লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ ৩৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা, পুরানা পল্টন শাখা থেকে সাউদ টেক্সটাইল মিলস ১২ কোটি ৭২ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়েছে।
এছাড়া গ্রাহকরা ঋণের টাকা ফেরত না দেয়ায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ আরও ১ হাজার ২২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখা থেকে ৫১৩ কোটি টাকা নিয়েছে ৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে- নূরজাহান সুপার অয়েল ৬৫ কোটি ৪৮ লাখ, খালেক অ্যান্ড সন্স ২০৬ কোটি ২১ লাখ, মুহিব স্টিল অ্যান্ড সাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ ৯২ কোটি, চিটাগাং ইস্পাত ৭৪ কোটি, ইমাম মোটরস দেড় কোটি, রুবাইয়াত ভেজিটেবল অয়েল মিলস ৭৪ কোটি টাকা।
আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা থেকে নেয়া হয়েছে ৪১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাররীন ভেজিটেবল অয়েল ৩০৬ কোটি ৩৮ লাখ, এমএম ভেজিটেবল অয়েল মিলস ৬০ কোটি, শিরিন এন্টাররপ্রাইজ ৫২ লাখ টাকা। আসাদগঞ্জ কর্পোরেট শাখা থেকে জাসমীর ভেজিটেবল অয়েল ৮৬ কোটি এবং মিজান ট্রেডার্স ৬০ কোটি টাকা নিয়েছে।
নিউমার্কেট কর্পোরেট শাখা থেকে তাসমিন ফ্লাওয়ার মিলস নিয়েছে ২৮ কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক এলাকা কর্পোরেট শাখা থেকে নেয়া হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিদ্দিক ট্রেডার্স ১০৯ কোটি, এমএস ওয়্যারিং অ্যাপারেলস ৩ কোটি এমএস গার্মেন্ট ৫৬ লাখ, মাসুদা ফেব্রিক্স ১ কোটি ৩০ লাখ এবং এ্যাপ্ট পিলেট ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে সরকারি ব্যাংকগুলোতে জালজালিয়াতির জন্য চারটি কারণ শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব।
এসব দুর্বলতা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়েছে। সূত্র জানায়, দুদক এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করেছে। এর মধ্যে আসামি করা হয়েছে ৫৪ জনকে। এদের মধ্যে রয়েছেন গ্রুপের এমডি খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরী, চেয়ারম্যান, তার স্ত্রী নওরিন হাসিবসহ গ্র“পের রয়েছেন ১৩ জন এবং বাকি ৪১ জন হলেন ব্যাংক কর্মকর্তা।
বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ব্যাংকের নতুন পর্ষদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা এটি পর্যালোচনা করে ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করছেন। এটি তৈরি হলে পরবর্তীকালে অর্থ মন্ত্রণালয় বেসিক ব্যাংকের বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেবে। ইতিমধ্যে ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়েছে। ব্যাংকের আগের পর্ষদ বাতিল করে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে।-দৈনিক যুগান্তর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ