মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

যদু

সাইফ আলি : সে শুধু ভাবে। আর পাঁচজন লোকের সাথে তার পার্থক্যটাই এখানে। তার একটাই কথা- কাজ যখন করবো, ভেবে চিন্তেই করবো; না জেনেশুনে কাজে নামে বোকালোক। ধরা খাওয়াটাও তাদের নিত্য নৈমেত্তিক ব্যপার। যেমন ধরুন ঐ কলিমের কথাই বলি, গেলো বছর পেঁয়াজে লাভ দেখে মনে করেছিলো এবারও... কিন্তু হলোটা কি? উল্টা। এবার নির্ঘাত লোকসানে পড়বে বেচারা। আরে বার বার কি আর এক সোনা ফলে। তারপর বকুল মিয়ার কথা ভাবো, মাছের চাষ করে দু’বছর বেশ লাভই করেছিলো, কিন্তু এবার পানিতে যে ঘের শুদ্ধ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সে কি আর জানতো?? বেচারা। তাই বলি, কাজে নামার আগে বহুৎ চিন্তা ভাবনার দরকার আছে। এমন কাজে নামতে হবে যেনো লাভ ছাড়া ক্ষতির মুখ দেখতে না হয়। তার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করে মাথা ঝাঁকানো লোকও আছে। তারা তার আশেপাশেই থাকে। তাদের নিকট সে মোটামুটি আদর্শ বনে গেছে।
গ্রামে ঢুকে দশ মিনিটের হাটা রাস্তা, তারপরেই মসজিদ; গ্রামে একটাই। মসজিদে তেমন লোক হয়না। গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি ছাড়া কারোরই ধর্মেকর্মে মনোযোগ নেই। মনের মধ্যে পাকাপোক্তভাবে ধারণা জন্মে গেছে, ওটা বুড়ো বয়সের হিসাব। মানুষ যখন বুড়ো হয়, মৃত্যুর ভয় জাগে; তখনই তারা মসজিদে-মন্দিরে যায়। আর জোয়ান বয়সটা হচ্ছে কাজের বয়স। টাকা পয়সা কামানোটাই এখানে মুখ্য বিষয় , তারপর বিয়ে-সংসার ইত্যাদি। মসজিদের পাশেই্ একটা চায়ের দোকান, শুধু চায়ের দোকান বললে অবিচার করা হয়। চানাচুর মুড়ি থেকে শুরু করে সুঁই-সুতো সবই পাওয়া যায় এখানে। দোকানের সামনে বাঁশের মাচাং পাতা আছে। এটাই যদুর আড্ডাখানা। সকাল থেকে রাত যখনই তার খোঁজ করা হয় সে এখানেই থাকে। শুধু শুধু বসে থাকলে দোকানির উপর অবিচার করা হয় এ জ্ঞানটুকু তার আছে। আর একারনেই ঘন্টায় ঘন্টায় চায়ে চুমুক পড়ে তার। একা একা চা খাওয়াটা তার ধাতে সয় না। ফলে সর্বক্ষণ চা খাওয়া লোক তার আশেপাশেই থাকে। আগে বলা লাগতো এখন আর তাও লাগে না। চা খেয়ে যাওয়ার সময় বলে যায়- বিলটা দিয়ে দিও যদু ভাই। যদুর তাতে না নেই। খাবেই তো। গ্রামের ভাই-ভাগার মানুষ, এক কাপ চা খাবে সেটা আবার বলা লাগে! কোনোদিন রোগেশোকে যদু যদি নাও আসতে পারে তাও তার নামে বাকি জমে যায়। কে কি খেয়েছে সেটাও বলা লাগে না, টাকার পরিমাণটা বললেই হয়।
যায় হোক, এ বিষয়ে কেউ যদুর সাথে বাজি লাগতে যায় না যে, আশপাশ চৌদ্দগ্রামে তার মতো কেউ দাবা খেলতে পারে। যত বড় খেলোয়াড়ই আসুক না কেনো, পনের থেকে বিশ দান। অভিজ্ঞতার আলোকে খেলে যদু, প্রতিপক্ষের চাল দেখলেই বুঝে ফেলে মনের কথা। অনেকে বলে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। কিন্তু সে তার পছন্দ না। খেলাধুলা নিছক বিনোদনের বস্তু, ওসবে প্রতিযোগিতা থাকতে নেই। আনন্দ ছাড়া আর কিছুই এখান থেকে আশা করা উচিত নয়। পাশে বসে কেউ যদি রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনে তবে মিজাজ গরম হয়ে যায় যদুর- দরকার পড়লে খেল গিয়ে, বসে বসে কি শুনিস??
এভাবে দিনকাল যদুর ভালোই কাটছিলো, বাপ ছিলো এক সন্তান; জমি জমার অভাব নেই। সংসারে আয় রোজগারের জন্য তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। চার বোনের পর যদুর জন্ম হয়েছিলো বর্ষা কালে। নিউমোনিয়া হয়ে ছেলে বাঁচবে বলে আশা ছিলো না কারো। তারপরও কেমন করে যেন আল্লাহ্র হাতে ধরে বাঁচিয়ে দিলো। অতি আদরের যদু তাই ছোটবেলা থেকে হুকুম করে অভ্যস্ত, শুনে নয়। লেখা পড়া করেছে অনার্স পর্যন্ত। মাস্টার্স শেষ করলো না কারণ ভালো লাগে না। এতো লেখাপড়া জেনে কি হবে? চাকরি-বাকরি এখনো দরকার পড়েনি। তবে ইদানীং ভাবছে। আগে মনে করতো ব্যবসা করবে কিন্তু এখন আর সে জোর পায় না। অনেক ভেবে চিন্তে এই তার উপসংহার- শিক্ষা তাকে শিখিয়েছে কিভাবে একজন ভালোমানের চাকর হওয়া যায়। ফলে মালিক হওয়াটা বড়ই কষ্টকর। লাভ ক্ষতির হিসেব সে ঠিকই জানে। কিন্তু ক্ষতিটাকে কিভাবে লাভে পরিণত করা যায় সে হিসেব তার অজানাই থেকে গেছে। এর চেয়ে চাকরি করা অনেক সহজ, মাস গেলে নিয়ম মতো বেতন পাওয়া যায়। কিন্ত সেদিকে তাকিয়েও হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকে না তার। মানুষ কিভাবে পারে এগুলো। রোবটের মতো চলতেই থাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একই রুটিন একই কাজ!! ফলে যদু বেকার থাকাটাই ভালো মনে করে। ভবিষ্যতের চিন্তা করে কূল কিনারা পাওয়া মুশকিল। তাই ওটা নিয়ে চিন্তাও করে না আর।
গতকাল রাতের কথা, যদুর কাছে এই প্রথম কোনো আবদার নিয়ে এসেছেন এলাচি বেগম। ছেলের কাছে কিছুই চান না তিনি শুধু একটা মাত্র আবদার তার। ছেলেকে তিনি বিয়ে দিতে চান। যদুরও তাতে কোনো আপত্তি নেই বলে দিয়েছে। কিন্তু এখন বিষয়টা নিয়ে সে চিন্তিত। কিভাবে সম্ভব?? বেকার ছেলের সাথে মেয়ে দেবে কে? আর দিলেও বউয়ের কাছে রাত দিন যে খোটা খেতে হবে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? বিষয়টাকে হালকা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখন কি করা যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এ কথায় ভাবছে যদু। সঙ্গী-সাথীরা কয়েকজন এসে চা খেয়ে ফিরে গেছে। আজ আর দাবা খেলা জমছে না। মাথায় অন্য চিন্তা নিয়ে দাবা খেলা সম্ভব নয়। দোকানি বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে কিন্ত যদু উত্তর দেয়নি। বিষয়টা সবাইকে জানানো যাবে না। এটা তার জীবনের দ্বিতীয় গোপনীয় কাজ। প্রথমটা ছিলো খাতনা।
তিন-চার দিন চলে গেছে মায়ের কাছ থেকে আর কোনো তথ্য আসেনি। ফলে আজ একটু নিশ্চিন্তেই ঘর থেকে বের হচ্ছিলো যদু, কিন্তু তা আর হলো না। মায়ের ডাক- এই যদু, আজ আর তোর দোকানে বসে কাজ নেই; আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।
-    কোথায়?
-    সেটা তোর জেনে কাজ নেই, আমার পিছে পিছে হাটবি; কোনো প্রশ্ন করবি না।
-    বারে, কোথায় যাবো সেটাও জানতে পারবো না!!
-    গেলেই তো জানতে পারবি।
যদু আর কথা বাড়ালো না, লাভ নেই; এলাচি বেগমের পেট থেকে এর বেশি কিছুই সে বের করতে পারবে না যতক্ষণ না তিনি নিজ থেকে কিছু বলেন। ঘরে বসে নিজে নিজেই ভাবতে লাগলো- এমন কি ব্যাপার যে, আম্মা আগে থেকে বলছে না??
মায়ের সাথে যদু যেখানে এসেছে সেটা তার মায়ের বান্ধবির বাড়ি। এতোকাল পর বান্ধবীর সাথে মায়ের গল্প করার খায়েস জাগলো কেনো তা যদুর মাথায় ঢুকলো না। কথা সূত্রে জানা গেলো তারা প্রায় ৭-৮ বছর পর পরষ্পর মিলিত হয়েছেন। দু’জনে গল্প জুড়েছেন ভালো মতোই, শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। মা-খালাদের গল্পের মধ্যে নিজেকে কেমন বেমানান লাগতে শুরু করেছে। ওর চোখে মুখে মনে হয় ব্যাপারটা প্রকাশ পেয়েছে, কারণ ওর দিকে তাকিয়ে মায়ের বান্ধবী বলেই ফেললেন, তোমার একটু কষ্ট হয়ে যাচ্ছে মনে হয়, কিন্তু কি করবো বলো, তোমার মা যে এই অসময়ে এমন একটা আবদার নিয়ে আসবে তা কে জানতো? ও গেছে খালার বাড়িতে, আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।
পুরো ব্যপারটাই যদুর কাছে ধোয়াটে মনে হচ্ছে। কার কথা বলছে খালা? ও কি কারো জন্য অপেক্ষা করছে?? এলাচি বেগম যদুর দিকে আঁড় চোখে তাকান, আবার বান্ধবীর সাথে গল্প জোড়েন। যদু এদিক সেদিক চিন্তা করে কূল না পেয়ে শেষমেশ থিতু হয়ে বসে আছে। এক কাপ চা খুব টানছে এখন।
-    আপনাদের চা দেবো?
অপ্রত্যাশিত এমন প্রশ্নে, প্রশ্নকর্তীর দিকে না তাকিয়েই যদু বলে ফেললো, জ্বী, হলে ভালো হয়।
-    কিরে, কখন এলি তুই?
-    মাত্রই এলাম। দেখলাম তোমরা খালি মুখে গল্পে মজেছো তাই...
-    এখানে আয়, তোর খালাকে সালাম কর; অনেক আগে দেখেছিলি, মনে থাকার কথা না।
-    আমিও তো চিনতে পারি নি, কতো বড় হয়ে গেছে মেয়েটা...
অপ্রত্যাশিত চায়ের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যার আগমন ঘটলো তার দিকে যদুর প্রথম দৃষ্টি সংকোচমিশ্রিত হলেও সুখকর। এতক্ষণে সে কিছুটা আঁচ করতে পারছে, কেনো তার মা হঠাৎ বান্ধবীর জন্য পাগল হয়ে উঠেছেন। মায়ের অতি আদরে রিনা এখন নিজেই সংকুচিত, দু’একবার যদুর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে সেও। অবশেষে ব্যপারটা যখন দু’জনের কাছেই পরিষ্কার তখন যাবার বেলা। তাড়াতাড়িই আবার আসবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছে এলাচি বেগম। যদুকে তাড়া দিয়ে বললো- কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরীবের আজান দিয়ে দেবে, ওঠ।
আজ আর যদুকে চায়ের দোকানে দেখা যাচ্ছে না। সকাল থেকে বিভিন্ন ছুতায় মায়ের আশপাশে ঘুরঘুর করছে। এলাচি বেগমও সমানে হুকুম করেই যাচ্ছেন। লবনটা দে, তেলটা এগিয়ে দে, তোর বাবাকে বল বাজার করতে হবে না আজ ইত্যাদি।
-    মেয়েটাকে কেমন দেখলি?
-    খারাপ না।
এলাচি বেগম হেসে ফেললো- এবার মনে হয় তোর বাবার কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া উচিত। 
-    মানে?
-    কিছু না করলে তোর হাতে মেয়ে দেবে কে?
-    ও।
বেশ কিছুদিন যাবৎ চায়ের দোকানে বাকি জমেছে, এর মধ্যে যদুর দেখা মেলেনি। কেউ কেউ বলছে, যদু মনে হয় লাইনে আসলো এবার। আবার কারো কাছে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ছাড়া আর কিছুই নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ