শুক্রবার ০৫ জুন ২০২০
Online Edition

নারী নির্যাতন বন্ধের উপায়

[দুই]
জিবলু রহমান : ২০১২ সালের অক্টোবরে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের তিনজন শিক্ষক মোঃ মাহমুদুর রহমান (বাহালুল), এস এম মফিজুর রহমান ও মোঃ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগের ছাত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক, ছাত্রদের পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন বিভাগের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তাদের যৌন নিপীড়ন ও অনৈতিক আচরণের প্রতিকার দাবি করে সেই সময় কলা অনুষদের ডিন সদরুল আমিন বরাবর চিঠি দেয়া হয়। এ নিয়ে বিভাগীয় একটি তাৎক্ষণিক সভার সিদ্ধান্তে বাহালুলকে বিভাগ থেকে তিন মাসের জন্য অব্যাহতি দেয়া হয়। এরই মধ্যে এক ছাত্রী বিভাগে এসে চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘বাহালুল আমাকে বিয়ে না করলে আত্মহত্যা করব।’ এ ঘটনার পর বিভাগীয় সিনিয়র অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ভুক্তভোগী ছাত্রীরা বাহালুলের অনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণস্বরূপ মোবাইলে ধারণকৃত কথোপকথনের অডিওসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেন। কমিটি সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে সন্দেহাতীতভাবে শিক্ষক বাহালুলের অনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ পায়। পরে এক বছরের জন্য তাকে সব কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতিও দেয়া হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করে যেন চরম নৈতিক স্খলনজনিত কারণে বাহালুলকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়। তিনি ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক-কর্মী হওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। (সূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত ১১ অক্টোবর ২০১৪)
২০১২ সালের আরেকটি আলোচিত ঘটনা হচ্ছে আরবি বিভাগের অধ্যাপক ফখরুদ্দিনের এক স্ত্রীর মাথা ফাটিয়ে দেন অন্য স্ত্রীর সন্তানেরা। এর আগে ফখরুদ্দিন আরো তিনটি বিয়ে করেন। কলা ভবনে আরবি বিভাগে এই শিক্ষকের কে তার আগের স্ত্রীর দুই সন্তান এ কা- ঘটায় বলে বিভাগের শিক্ষকেরা জানান।
২০১২ সালের ৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নূরউদ্দিন আলোর বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে মামলা করা হয়। এর আগে এ ঘটনায় তিনি আত্মগোপনে থাকার পর রাঙ্গামাটিতে থানায় গিয়ে হাজির হন। তার এ ঘটনা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগেরই এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪ রাতে সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠকে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বৈঠকের আগে দুই দফায় প্রায় ৯ ঘণ্টা অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে অবরুদ্ধ করে রাখেন নিজ বিভাগেরই শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, পরীক্ষার খাতায় নম্বর-সংক্রান্ত জটিলতার কথা বলে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তিনি এক ছাত্রীকে নিজ বাসায় ডেকে যৌন হয়রানি করেন। পরেরদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানোর পরও সমাধান না পেয়ে তাকে অবরোধ করা হয়। (সূত্রঃ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদারের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে। ২০১৪ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী বিভাগের অধ্যাপক মজুমদারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির লিখিত অভিযোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কমিটির কাছে।
শিক্ষক মজুমদার মোবাইল ফোনে ছাত্রীটিকে একাধিককার আপত্তিকর প্রস্তাব দিয়েছেন। তার প্রস্তাবে সম্মত হলে বিভাগে ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তাসহ শিক্ষক হওয়ার লোভনীয় সুযোগের ব্যাপারে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন ওই শিক্ষক। ওই ছাত্রী তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
ছাত্রীটি অভিযোগ করেন, প্রথমদিকে তিনি শিক্ষককে নানাভাবে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিন দিন শিক্ষকের যৌন হয়রানির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
ছাত্রীর অভিযোগের প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে প্রমাণসহ তা ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সভাপতির কাছে পাঠানো হয়। অভিযোগের অনুলিপি পেয়ে ৩০ নভেম্বর ২০১৪ বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভা ডাকা হয়। সভায় অধ্যাপক মজুমদারকে বিভাগের পরীক্ষা ও ছাত্রীদের গবেষণার তত্ত্বাবধানসহ সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ৫ ডিসেম্বর ২০১৪)
যৌন নিপীড়নের মতো সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথমে দরকার আইনের সামাজিকীকরণের বাস্তবায়ন। এছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কিছু স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা উচিত। যারা শুধুমাত্র ইভটিজিং বা নারীর শালীনতার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে। পাশাপাশি মিডিয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ ধরনের ঘটনা আগে অনেক ঘটলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি; যে কারণে বারবার ঘটছে। এটি রোধে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার এবং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আইন করা প্রয়োজন।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনোই সমর্থন করি না। এখন সমাজে নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তর পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক মেধাবী হলেও অস্থির একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে আসে, যার প্রতিফলন দেখা যায় এ ধরনের খারাপ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। খুব শক্ত হাতে দমন করতে পারলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কমে যাবে। একই সাথে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে দলাদলির কারণে কেউ যেন পার না পায় সে বিষয়ে দৃষ্টি  দেয়া আবশ্যক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এখন এক ধরনের পরিবর্তন সমাজে লক্ষ করা যাচ্ছে। এ জন্য প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চ স্তর পর্যন্ত এর সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের খাপখাইয়ে নেয়ার উপযোগী পড়াশোনার কারিকুলাম করা দরকার।
শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের আচরণ কখনোই কাম্য নয়। এটি শিক্ষকদের নৈতিক স্খলনের একটি রূপ। এর সর্বোচ্চ শাস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুযায়ী চাকরিচ্যুতি। আগের কোনো অপরাধের শাস্তি না হলে পরে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য এ ধরনের ঘটনাগুলোর আইনানুযায়ী শাস্তি হওয়া দরকার।
আসলে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির মাত্রা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ঘটনা ও যৌন হয়রানির নানান সংবাদ আমাদের সমাজের সুস্থতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের চপেটাঘাত। ভাল সমাজ হিসেবে নারী-পুরুষের সম-নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশের সম-সুযোগ সৃষ্টির বিধান বজায় থাকা জরুরি। অথচ আমাদের সমাজের নারীর জীবন হয়রানি, ধর্ষণ আর এসিড সন্ত্রাস কবলিত হচ্ছে নিত্যদিন। এজন্য এ সমাজ কোনো সুস্থ সমাজের তালিকায় থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানার্জন, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সত্য অনুসন্ধানের তীর্থক্ষেত্র। এই তীর্থস্থান কিছু সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষকের কুকীর্তিতে যেমন কালিমাযুক্ত হয়েছে তেমনি হাসপাতালসহ রাস্তা-ঘাট, বাজার সর্বত্রই নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির মাত্রা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে।
তবে হয়রানির ভয়ে নারীরা পুলিশের কাছে যেতে চান না-এ তথ্য কিছুটা সত্য হলেও পুরোটা ঠিক নয়। কারণ দেশে প্রতিবছর যত মামলা হয়, তার একটি বড় অংশ নারী নির্যাতনের মামলা। এসব মামলার বাদীও নারী। পুলিশ তাদের প্রতি যতœবান না হলে কী করে এসব মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। আবার এটাও সত্য যে কেউ কেউ নিজের কাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল না-ও হতে পারেন। তার সংখ্যাও যে খুব বেশি, সেটা নয়। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা সেটা বড় কথা। আবার অনেক পরিবার আছেন যারা মামলা করেও হতাশ হয়েছেন; অপরাধীদের দ্বারা হুমকির শিকার হচ্ছেন। এসবের প্রতিবিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, অনেকাংশে সমাজের। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ৭ ডিসেম্বর ২০১৫)
যৌন হয়রানি বন্ধ করতে না পাবার দায় অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর। যৌন হয়রানি বন্ধে আমাদের সুপারিশসমূহ হলো-সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ প্রদানের জন্য স্বতন্ত্র সেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অভিযুক্ত দোষী হলে তাকে মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের সামনে নিয়ে আসতে হবে। অভিযোগকারীকে পুলিশি নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ উঠলে তার জাতিগোষ্ঠীসহ সকলকে বয়কট করতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। নারী-পুরুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানসহ রাস্তাঘাটে প্রচার-প্রচারণামূলক স্থায়ী সাইনবোর্ড টাঙানো দরকার। সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বস্তরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা থাকতে হবে; তবে তার অপব্যবহার রোধে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা থাকা দরকার এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার সম্পর্কে আউট লাইন লিপিবদ্ধ করে প্রচার করতে হবে। আর এসব নির্দেশাবলি অনুসরণের মধ্যদিয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ