সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

২০১৭ সাল হবে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বছর

  • বাংলাদেশের দারিদ্র্য মুক্তিতে চীন সহযোগিতা করবে

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ সফররত চীনা প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যকার আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দু’দেশের মধ্যে ২৬টি বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই সম্পন্ন হয়েছে। বৈঠকে তারা অর্থনৈতিক করিডোর, সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। 

বৈঠক ও চুক্তি সম্পন্ন শেষে যৌথ বিবৃতিতে মি. জিনপিং বলেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক এখন নতুন যুগের সূচনা করেছে। ২০১৭ সাল হবে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বছর। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় ও শক্তিশালী হলো। বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে চীন সহযোগিতা করবে।

গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এসব চুক্তি ও সমঝোতায় সই করেন। একই সঙ্গে উদ্বোধন করা হয়েছে ছয়টি প্রকল্প। তবে এসব চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারক সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এর আগে বেলা ২টা ৫৮ মিনিটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টাইগার গেটে এসে নামলে শি জিনপিং এর সাথে করমর্দনে কুশল বিনিময় করেন এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর লালগালিচা বিছানা পথ ধরে দুই নেতা এগিয়ে যান বৈঠক স্থলের দিকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরপর পরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী কক্ষে দুই দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকটি শেষ হয় ৪ টা ১০ মিনিটে। এরপর ৪ টা ১৫ মিনিট থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একে একে ২৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। পাশাপাশি ৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সচিবদের উপস্থিতিতে এসব চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

জানা গেছে, চুক্তিগুলো দু’দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য যোযোগাযোগ প্রযুক্তি, ভৌত অবকাঠামো সড়ক-সেতু, রেল যোগাযোগ ও নৌপথে যোগাযোগ, কৃষি, সমুদ্র-সম্পদ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক।

দুই নেতার বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এসব চুক্তির মধ্যে ১২টি ঋণ ও অবকাঠামো চুক্তি, বাকিগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর শি জিনপিং চাইনিজ ভাষায় ১০ মিনিট বক্তব্য দেন। পরে একজন দোভাষী তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে ইংরেজিতে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যকেও চীনা ভাষায় অনুবাদ করা হয়। 

যৌথ বিবৃতিতে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই সফর আমাদের জন্য প্রত্যাশিত। আমরা চীনের এক অঞ্চল, এক দেশ নীতি সমর্থন করি। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুসহ দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, জ্বালানি, রেলওয়ে, সমুদ্র, শিল্পখাত, অর্থনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক ২৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা ৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছি। দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় ও শক্তিশালী হলো।

তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন ছিলো দারিদ্র্যতা, ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়া, আর সেটিই আমাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে চীন সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরো গভীর এবং দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বক্তব্যের শুরুতেই বাংলাদেশে আসতে পেরে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান। দুই দেশ ভাল বন্ধু, ভাল প্রতিবেশি এবং ভাল সহযোগী। এই সফর দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

এ সময় তিনি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি, যোগাযোগ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে চীন সহায়তা করবে। দুই দেশই উচ্চতর পর্যায়ে সম্পর্ক দৃঢ় করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক করিডোর, সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে আমরা একমত হয়েছি।

জিনপিং বলেন, ২০১৭ সাল হবে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বছর। ইতিহাসের নতুন মাত্রায় দুই দেশের সম্পর্ক জনগণের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা ও সমুদ্রসীমা রক্ষায় যৌথভাবে কাজ করতে চায় চীন। চীন বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।

 এর আগে দুপুর পৌনে ১২টায় ২২ ঘণ্টার রাষ্ট্রীয় সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট জিনপিং ঢাকায় আসেন। তিনি এয়ার চায়নার একটি বিশেষ ফ্লাইটে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাকে বহনকারী চীনের বিশেষ বিমানটি বাংলাদেশের আকাশসীমায় এসে পৌঁছলে সেটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে বিমানবাহিনীর চারটি জেট বিমান। 

বিশেষ ফ্লাইট থেকে বিমানবন্দরে নেমে এলে তাকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় লাল-সবুজের শাড়িপরা একটি শিশু। এরপর তিনি অভিবাদন মঞ্চে গিয়ে গার্ড অব অনার নেন এবং গার্ড পরিদর্শন করেন। তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল চীনা প্রেসিডেন্টকে গার্ড অব অনার দেয়। 

জিনপিং ঢাকায় ৭৯ সদস্যের চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট লী জিয়ান নিয়ানের বাংলাদেশ সফরের পর দীর্ঘ তিন দশক পর কোন চীনা প্রেসিডেন্ট এই প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসেন। তবে জিনপিং-এর এটা দ্বিতীয় ব্যক্তিগত সফর। এর আগে তিনি দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ