রবিবার ৩১ মে ২০২০
Online Edition

চলচ্চিত্রের হিন্দি গানে কাজী নজরুল

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : নজরুল কবি প্রতিভার সর্বোত্তম বিকাশ ঘটেছে তার সঙ্গীত সৃষ্টিতে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগ-স্রষ্টা কবি, অনন্য সাধারণ গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত স্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম বাংলায় অসংখ্য গান রচনা করেছেন। তার রচিত গানের সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপিত না হলেও এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সে সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
নজরুল রচিত এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সাড়ে তিন হাজার গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গান হিন্দি ভাষায় এবং কিছু কিছু গান উর্দু ও ফার্সি ভাষায় রচিত। মূল হিন্দি ভাষায় গান রচনা করা ছাড়াও নজরুল তার উর্দু ও ফার্সি ভাষায় রচিত। মূল হিন্দি ভাষায় গান রচনা করা ছাড়াও নজরুল তার অনেক বাংলা গানের হিন্দি রূপান্তর করেছেন। তিনি যেমন অনেক হিন্দিু গানের রচয়িতা, তেমনি সুরকারও।
নজরুল আরবী, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় যে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ছিলেন, তিনি যে তার বহু কবিতা-গান ও অন্যান্য রচনায় অসংখ্য আরবি-ফার্সি, উর্দু-হিন্দি ও সংস্কৃত শব্দ ও শব্দবন্ধ নৈপুণ্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন, তা সুবিদিত।
গবেষণায় জানতে পারা যায়, নজরুল ৩টি হিন্দি ছায়াছবিতে কাহিনীকার, গীতিকার ও সুরকার ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। চবি ৩টি হলো, বিদ্যাপতি (১৯৩৮ খ্রি.), সাপেড়া (১৯৩৯ খি.) ও চৌরঙ্গী (১৯৪২ খ্রি.)।
বিদ্যাপতি ছায়াছবি (হিন্দি) ১৯৩৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর করাচি ও বম্বেতে একযোগে মুক্তি লাভ করে। এই হিন্দি বিদ্যাপতি ছবিতে নজরুলের লেখা গান ও সুর ব্যবহৃত হতে পারে বলে অনেকে অনুমান করেন। এই হিন্দি ছবিতে মোট ক’টা গান ছিল এবং সেগুলো সঠিক কার রচনা ছিল, কোন কোন শিল্পীর কণ্ঠে গীত হয়েছিল এ তথ্য আজও পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়ালের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, নজরুল এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তার বেশ অবদান রয়েছে (তথ্য সূত্র: গানের কাগজ: কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিসংখ্যা, চতুর্থবর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, নভেম্বর ১৯৭৬, প্রবন্ধ : কাজী দা’কে যতটুকু জানি)। এ ছবির মাধ্যমে নজরুলের সুনাম লাহের, করাচি, মুম্বাই, কলকাতা, ঢাকা, সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম হয়ে সুদূর রেঙ্গুন পর্যন্ত পৌঁছায়।
নজরুরেলর সাপেড়া ছায়াছবি হিন্দি ১৯৩৯ সালের ২৪ জুন বোম্বে এবং করাচিতে ছবিটি মুক্তি লাভ করে। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়ালের স্মৃতিচারণের প্রেক্ষিতে জানা যায়, নজরুল এই হিন্দি চলচিত্রের সাথেও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এই ছবির কাহিনীকার গীতিকার ও সুরকার ছিলেন কাজী নজরুল। সব গানের সুরকার নন শুধু তার নিজের রচিত গানের সুরকারও ছিলেন। সাপুড়ে ছবির গান (হিন্দি সাপেড়া) নজরুলকে চলচ্চিত্রে খ্যাতি এনে দেয়।
নজরুলের সর্বশেষ হিন্দি চৌরঙ্গী ছবিটি পরিচালনা করেন এস. ফজলা। ছবিতে গানের সংখ্যা মোট ১৩টি। এর মধ্যে ৭টি গানের গীতিকার ও সরকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। নিচে নজরুলের চলচ্চিত্রের হিন্দি চৌরঙ্গী ছবির ৭টি গান তুলে ধরা হলো-
(১) চৌরঙ্গী হ্যায় ইয়ে চৌরঙ্গী
ইসকী দুনিয়া রংগ বেরংগী
গোরে, কালে আঁয়ে
আপনি আপনি ছ্যব দেখলায়ে
এক ডগরমে সব সংসার
ইসকী দুনিয়া রংগ-বেরংগী
চৌরঙ্গী হ্যায় ইয়ে চৌরঙ্গী

কোই কিসিকো রাহ লাগায়ে
কোই আকর খুদ খো যায়ে
সাধা রাস্তা ফের হাজার
    ইসকী দুনিয়া রংগ-বেরংগী॥
গানটি মেগাফোন রেকর্ডে শিল্পী কণ্ঠে গীত। তবে কোন কোন শিল্পী এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তা জানা যায়নি  মেগাফোন রেকর্ড নম্বর- জেএনজি-১২৫৫ প্রকাশ কাল ১৯৪২ খ্রি.)।
(২) সারাদিন ছাত পিটী হাতে বহু দুখাইরে
তবই তো পেট ভরকে খাইকা না পাইরে।
তু বোল বহিন আজ ঘরে
কা কা পাকাই হ্যায়
তু ওভী চুলহো তক্ বারো নাহি
বাচ্চা ভুকায়ে হ্যায়
হমহুঁ কুছ খাওয়া নাহী বানাওয়া নাহি।
সাস্ মোরী জুলমী ভোর উঠ
সাতায়ে হ্যায়
বৈরেণ, ননদ, বহুতে র্হ জায়ারে
সারাদিন ছাত্ পিটা হাত হুঁ দখাইরে॥
চৌরঙ্গী চৌরঙ্গী এবং সারাদিন ছাত পিটি গান দু’টো মেগাফোন কোম্পানীর গ্রামোফোন রেকর্ডে বাণীবদ্ধ করা হয়েছিল।
(৩) ক্যায়সে খেলন জাবে সাবন মে কজরিয়া
বদরিয়া খের আয়ী গোবীয়া
ক্যায়সে যাইও তু এ্যাকেলা
 কোই সঙ্গনা স্যহেলা
গুণ্ডে ঘের লে হ্যাঁয় তোরী ডগরিয়া
 কেতনো চঢ় গেলো সুলা

কেইনো চঢ় গেলো ফাঁসি
বাদারিয়া ঘের আয়া গোরিয়া।
তেরা দেখ গোরা চেহারা
করে হ্যায় ঘরকে সো সো ফেরা
লম্বা লম্বা বাঁধে পগরিয়া
বাদারিয়া ঘের আয়া গোরিয়া
ভৌজি বুলালা তোর গোরা
হমরে সুন্নে লাগে গোলী
কাছে পড়লল বাটেড হামরি ডগ্রিয়া।
ক্যায়সে খেলন জাবে সাবন্ মে কজরিয়া॥
এই গানটি কোনো গ্রামোফোন রেকর্ড করা হয়েছে কিনা জানা যায় না।
(৪) আ-জারি নিন্দিয়া তু আ-কিউ না যা
বাবুকী আঁখো মে ঘুম মিল যা।
রোয়ে জো বাবু মেঁ রোয়ে না দুঁ
হাল ওয়াইয়া আয়ে মেঁ পেড়ে লে দুঁ
আগান মাগান কা পালনা রেশম লাগা ডোর
দিল্লী সে মুগলানী বুল্ ওয়া য়া বৈঠী নেবে লোর
আজারি নিন্দিয়া তু আ কিউ না যা।
এই গানটিও কোনো গ্রামোফোন রেকর্ডে বাণীবদ্ধ করা হয়েছে কিনা জানা যায় না।
(৫) জো উম্পে গুজরতি হ্যায় কিসনে
উসে জানা হ্যায়
আপনিহি মসিবত হ্যায়
আপনিহি ফাসানা হ্যায়॥
ইয়া উইথে খা ফা হামসে
ইয়া হম হ্যায় খাফা উনসে
কাল উনকো জামানা থা
আজ আপনা জামানা হ্যায়॥
আঁসুতো বহুতসে হ্যায়
বন্ধ জায়ে সো মোতি হ্যায়
রহ যায়ে সো দানা হ্যায়॥
এই গানটিও কোনো গ্রামোফোন রেকর্ড হয়েছে কিনা জানা যায় না।
(৬) উহ্ কবকে আয়েভি আওর গ্যায়েভী
নজর মে আবতক সমা র‌্যাহে হ্যায়।
হয়ে চল আ’হে হ্যায় উহ ফির র্যহে হ্যায়
ইয়ে আ’রাহে হ্যায় উয়ো যা’ র‌্যাহে হ্যায়॥
বাহার রংগ ও শাবা বহা কেয়া
তামাম হাসতি ঝুঁকি হুয়ি হ্যায়
জিধার ও ন্যজরে ঝুকা র্যাহে হ্যায়
আব আগে জো কুছভা হো মোকাদ্দর
রহেগা লেকিন হয়ে নকশ দিল পর
হাম উনকা দ্যমন প্যকড়– র্যহে হ্যায়
উমো আপনা দ্যমন ছোড় রাহে হ্যায়॥
এই ৬টি গান ছাড়াও নজরুলের ফজলী ব্রাদার্সের ‘হিন্দী চৌরঙ্গী’
ছায়াছবিতে আর মাত্র চার লাইনের একটি গান পাওয়া যায়-
(৭) হাম ইশকে মারো কা
এতনাহি ফাসানা হ্যায়
রোণেকা নেহি কোই
সাহনেকো জামানা হ্যায়।
নজরুলের এই ৭টি ‘হিন্দী চৌরঙ্গী’র ছায়াছবির গান ও সুর সে সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল।
চিরকালের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যাবার আগে কাজী নজরুল ইসলাম সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ফজলী ব্রাদার্সের ‘হিন্দী চৌরঙ্গী’ ছবির সূত্রে। তাতে গীত রচনা এবং দুর্গা সেনের সঙ্গে যুগ্মভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করছিলেন নজরুল। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিদ্রোহী কবি বাকরুদ্ধ হয়ে যাবার দু’মাস পরে (নজরুল বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই)। এরপর নজরুল আর সশরীরে কোনো চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত হতে পারেননি। এ এক অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস।
তথ্য সূত্র :
(১) চলচ্চিত্রে নজরুল ১৯৯৩, ঢাকা : আসাদুল হক
(২) চলচ্চিত্রের জগতে নজরুল ১৯৯৭ : ঢাকা- অনুপম হায়াৎ
(৩) বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, পাঁচ দশকের ইতিহাস : আবদুল্লাহ জেয়াদ
(৪) অপ্রকাশিত নজরুল : সংগ্রহ সম্পাদনা আব্দুল আজীজ আল-আমান, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা।
(৫) বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস ১৯৯৮, কলকাতা : প্রণব কুমার বিশ্বাস
(৬) অপ্রকাশিত নজরুল (২য় খ-) : সংগ্রহ ও সম্পাদনা ব্রহ্ম মোহন ঠাকুর, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ