ঢাকা, শুক্রবার 31 March 2017, ১৭ চৈত্র ১৪২৩, ০২ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নাট্য ব্যক্তিত্ব ড. আসকার ইবনে শাইখ

মাহমুদ ইউসুফ : সুলতানি আমল, পাঠান আমল, মুঘল আমল, নবাবি আমলে শিক্ষা দীক্ষা, অর্থ বিত্ত, সাহস শক্তি, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে মুসলমানরাই ছিলো উন্নত ও সর্বেসর্বা। পলাশির আ¤্রকাননে সিরাজউদ্দৌলার বিপর্যয়ান্তে মসনদ চলে যায় ইংরেজ খ্রিস্টানদের হাতে। আকস্মিক বজ্রপাতে মুসলমানরা তখন দিশেহারা দিকভ্রান্ত। চাকরি বাকরি, ব্যবসা বাণিজ্য থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলিমদের সরিয়ে দেয়া হয়। তদস্থলে বর্ণহিন্দুদের আসন দেয়া হয়। মুসলিম আমলে উপমহাদেশে প্রায় ৬ লাখ মাদ্রাসা ছিলো। মাদ্রাসার পাশাপাশি বাংলাদেশেই ছিলো প্রায় ১ লাখ স্কুল। এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াকফকৃত ছিলো লাখ লাখ একর জমি। ব্রিটিশরা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে ওয়াকফকৃত লাখ লাখ একর জমি বাজেয়াপ্ত করে। এসব জমি হিন্দুদের কাছে ইজারা দিয়ে হিন্দু জমিদারি পত্তন করে সরকার। বনেদি মুসলমানরাও রাতারাতি ফকির বা দিনমজুরে পরিণত হয়। এভাবে চলতে থাকে পুরো উনবিংশ শতক। এ সময়ে কোলকাতাকেন্দ্রিক যে রেনেসাঁর পয়দা হয় তা পুরোপুরি ছিলো হিন্দুধর্ম ও সমাজের উত্থান। সেখানে মুসলমানরা ছিলো গরহাজির। সরকার পরিচালনা তো দূরের কথা সাহিত্যাঙ্গনেও মুসলমানদের নামগন্ধ ছিলো না। ঈশ^রচন্দ্র, বঙ্কিম, হরপ্রসাদ, সুকুমার সেন, সুনীতিকুমার, তারাশঙ্কর,  কবি রবিন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র কারও সাহিত্যেই মুসলমানদের সমাজ নিয়ে কোনো চিত্র নেই। ছিটেফোঁটা থাকলেও সেখানে ভিলেন হিসেবে হাজির করা হয়েছে মুসলমানদের। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এসে অবস্থার কিছু উন্নতি হয়। এ সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব আলি চৌধুরী, মাওলানা আকরম খাঁ, শেরে বাংলা ফজলুল হক, কাজী নজরুল ইসলাম, আব্বাস উদ্দিন প্রমুখ বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁর জন্ম দেয়। বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ গড়ে ওঠে। যারা মুসলিম মুলুক গঠনে অগ্রসর হয়। 

১৯৪৭ সালে মুসলিম রাষ্ট্র গঠিত হলে ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি অঙ্গন তখন খাঁ খাঁ করছে। সর্বত্র শূন্যতা। স্বভাবতই সময়ের প্রয়োজন ছিলো একজন নাট্য পথপ্রদর্শকের। অধ্যাপক এম. ওবায়দুল্লাহ বা আসকার ইবনে শাইখ (১৯২৫-২০০৯) সে অভাব পূরণ করেন। নাট্যকার, নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যগুরু, নাট্যবীর, নাট্যাচার্য, নাট্যজনক, নাট্যস¤্রাট, নাট্যশিল্পী, নাট্যনির্মাতা, নাট্যকর্মী আসকার ইবনে শাইখ মর্ত্যরে দুনিয়ায় বেঁচে নেই। কিন্তু রেখে গেছেন অনুসরণযোগ্য রীতিনীতি ও কালজয়ী জীবনাদর্শ। আরও দিয়েছেন অফুরন্ত সাহিত্য ও নাট্যভা-ার এবং জীবন সংগ্রামে জয়ী হবার অজেয় মনোভাব। ইসলামি চেতনা লালন করার অপরাধে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অধ্যাপনা থেকে বহিষ্কার করা হয় ১৯৭৩ সালে। আদর্শিক কারণে তাঁর স্বগৃহে প্রতিষ্ঠিত নাট্য একাডেমিকে টিকতে দেয়নি বাম-রাম-ধর্মনিরপেক্ষবাদী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র-শিক্ষকরা। ড. শাইখকে সামজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিকলাঙ্গ করার চেষ্টা হয়েছে বারবার। আর্থিকভাবে পঙ্গু করে তাঁর পরিবারকে ধ্বংসমুখে ফেলার ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে বিভিন্ন উপায়ে। বাইরের কোনো সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই এক হাতে লড়াই করে ময়দানে বিজয়ী হয়েছেন। অফুরন্ত মনোবল, ইমানি শক্তি, সাহস, শৌর্যবীর্য এবং তাওহিদের বলে বলীয়ান ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। 

জীবনাদর্শে তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অনুসারী। জীবনযাত্রার এ দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবন-কথার কিছু কথা’র ১৪তম পর্বে লিখেছেন, ‘‘মানুষের মুক্তিবিধানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রতি আমার কিছুটা দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু এদেশে ইসলামের প্রচলিত রূপের প্রতি ও জনসাধারণের গভীর বিশ^াসের প্রেক্ষাপটে ধর্মবিরোধী, বিশেষ করে ইসলাম বিরোধী, মার্কসীয় আদর্শ এখানে কতটুকু গ্রহণীয় হবে, এই-ই ছিলো আমার দ্বিধাগ্রস্ত ভাবনা। অত:পর কিছুটা অবহিত হলাম যখন ইসলামের নবিজি স. প্রদর্শিত বিপ্লবমুখী জীবনবিধানের বিষয়ে। তখন সকল দ্বিধা দূর হয়ে গেল। বিশ^াস জন্মাল, সর্বরকম দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মুক্তি সনদ রূপে ইসলাম আমাদের জীবনাদর্শ হতে পারে। কিন্তু এই মুক্তিসনদের রূপায়ন যে কঠিনতম কাজ। এত অশিক্ষা-অজ্ঞানতা, এত ব্যাপক দারিদ্র্য ও অন্ধ বিশ^াস। এত বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে ইসলামকে মুক্ত করে সমাজ-দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা------(আসকার রচনাবলি ৭, পৃ ৩০৪-৩০৫) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘----আমি তখন বৈপ্লবিক ইসলামের সেই সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার আশায় যথেষ্ট উৎসাহী। (আসকার রচনাবলি ২, পৃ ১৩৯)  তাঁর রিশতা ছিলো কুরআন সুন্নাহ এবং আল্লাহ রসুল স. ও খিলাফতে রাশেদার আদর্শের সাথে। ধর্মীয় দিক বিবেচনায় তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম। ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষ। নবি করিম স. এর আবির্ভাব সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন: ‘----সর্বত্রই নৈতিকতার চরমতম অবনতি। মানবতার অসহনীয় লাঞ্ছনা! এই-ই যখন মোটামুটি পৃথিবীর তমসাচ্ছন্ন অবস্থা, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সারা পৃথিবীর লাঞ্ছিত মানুষ যখন সুর্দীর্ঘকালের বিরান মাটিতে চাইছিল মানবতার পুন:প্রতিষ্ঠা, তখনই পৃথিবীর সেই অমার্জনীয় গাঢ় অন্ধকারে উদিত হলো এক নতুন চাঁদ। মানুষের ঘরে জন্ম নিল এক চাঁদ-মুখ ! মানুষের মুক্তিদূত। পৃথিবীর কল্যাণ, মানবতার মূর্ত প্রতীক। আরবের সেই মরু-ধূধূ উষর প্রান্তর, মানবতার নামে যেখানে নরহত্যা-নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ সুরাসক্তির অবাধ মত্ততা-পৌত্তলিকতার বর্বরতম প্রকাশ আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে সৃষ্টির নিকৃষ্টতম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে জন্ম নিলেন মরু-দুলাল রহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসানের কথায়,  ইসলাম সার্বজনীন ধর্ম- আল্লাহার একত্ববাদ, বিশ^-ভ্রাতৃত্ব এবং সহিষ্ণুতার মূর্ত প্রতীক। আরব ভূখ-ে ইসলামের আবির্ভাবে আরববাসীদের বহুযুগব্যাপী বিচ্ছিন্নতারই অবসান হল না বরং একটি নতুন ধর্ম, নতুন জাতি ও নতুন সভ্যতা সৃষ্টির সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হলো। ----জোসেফ হেলের মতে, ‘‘মুহাম্মাদ স. এমন একজন মহান ব্যক্তি যাকে না হলে বিশ^ অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তিনি নিজেই নিজের তুলনা’’।’ (আসকার ইবনে শাইখ: কুরআন কাহিনী, পৃ ৯৬)

জাতির জাতীয় জীবনের জয়গানে জাগরূক জনতার জননন্দিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. শাইখ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য তথা দৈশিক কালচারকে শহরের ভদ্র মহোদয়গণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। সমাজের উত্তরণ, মুখোশধারীদের চরিত্র উন্মোচন, শুভশক্তির উদ্বোধন, সত্য ন্যায়ের প্রতিস্থাপন, অন্যায়-অত্যাচার-অনাচারের মূলোৎপাটন, সুখী-সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ, অত্যাচারিতের আহাজারি-রোনাজারি, ঘাত, প্রতিঘাত, সংগ্রাম সংঘর্ষ, ¯েœহ প্রেম, হিংসা দ্বেষ, সুখ দু:খ, হাসি কান্না, বাদ প্রতিবাদ, প্রেম বিরহ, আশা হতাশা, দেশের মাটি-মানুষ, গ্রামীণ জনপদের দু:খ দুর্দশা অঙ্কনের সুনিপুণ কারিগর তিনি। চেয়েছেন মানবতার সার্বিক মুক্তি। অসত্য, অসুন্দর ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর রচনাবলি শানিত ও ক্ষুরধার। এজন্যই তিনি বাংলার মানুষের কাছে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক জহুরুল ইসলাম বলেন, আশকার ইবনে শাইখকে একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে কেউ কেউ মনে করে থাকেন। কখনো কখনো তাঁকে সাম্প্রদায়িক আখ্যাও বহন করতে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় আখ্যাটি নিতান্ত ব্যাখ্যাহীন। সাম্প্রদায়িক কাকে বলে? নিজের ধর্ম ও নিজের সম্প্রদায়ের কথা বললেই যদি তা সাম্প্রদায়িকতা দোষের প্রমাণ হয়, তাহলে অসাম্প্রদায়িক লেখক খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বর্তমান পশ্চিম বাঙলার নাট্যসাহিত্যে ‘জমিদার দর্পণ ও ‘ছেঁড়া তার’ বাদ দিলে এমন একটি সাহিত্যকর্ম পাওয়া যাবে না, যার মধ্যে মুসলিম সমাজ জীবনের বাস্তব চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়।----( আসকার রচনাবলি ১ম খ-, পৃ ১৯৪-১৯৫) আসলে মুসলমানদের নিয়ে কিছু লিখলে, তাদের পক্ষ নিলে বা নারায়ে তাকবির শ্লোগান দিলেই সাম্প্রদায়িক আখ্যা পেতে হয় সেকুলার দরবার থেকে। আর অমুসলিমদের তথা বর্ণহিন্দু, খ্রিস্টান, উপজাতি, বৌদ্ধদের গুণকীর্তন গাইলেই অসাম্প্রদায়িক হওয়া সম্ভব?

নাটক রচনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় প্রতিভাধারী বড়মাপের বরেণ্য নাট্যকার হলেন ড. শাইখ। শতাধিক নাট্যকর্ম সৃষ্টি করে রেখে গেছেন নাট্যপিপাসুদের জন্যে। সাহিত্য রসিকদের জন্য রেখে গেছেন সাহিত্যকর্ম, সঙ্গীত প্রিয়দের জন্য রেখে গেছেন গান, ইতিহাসবোদ্ধাদের জন্য রচনা করেছেন ইতিহাসের কিতাব, আরও কথকতা। বাস্তবিকই তিনি ছিলেন এক মহানুভব বাংলাদেশি সত্তা। দেশ-মাটি-মানুষের গান অনুরণিত হয় তার নাটকের প্রতিটি ডায়ালগে। তার রচনাকীর্তি কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়; বরং নি:সন্দেহে তা শান্তিপ্রিয় পৃথিবীর মহামূল্যবান আকররূপে পরিগণিত। বাংলা নাট্যসাহিত্যের মূল্যায়ন তাঁকে ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির গবেষক ও পাঠকদের এক মহামূল্যবান হীরকখ- হলো ড. শাইখ।

জীবনশিল্পী, মননশিল্পী ড. শাইখ ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় বুদ্ধিজীবী। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার অধিকারী এ মহান ব্যক্তি একটা সুষ্ঠু, সুন্দর স্বাভাবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শোষণ, বঞ্চনাহীন একটি আদর্শিক রাষ্ট্র। যেখানে মানবাধিকার পূর্ণ রক্ষিত থাকবে। সকল ধর্ম, মত, বর্ণ, সম্প্রদায়ের সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, যেখানে থাকবে না অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, অত্যাচার। যে সমাজ রাষ্ট্র গড়েছিলেন মহানবি স. আবুবকর রা. ও  উমার রা.। জাতীয় পর্যায়ে আল্লাহর আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন কাম্য ছিলো তাঁর। কুরআনিক হুকুমত কায়েমে সচেষ্ট ছিলেন আমৃত্যু। 

তথ্যপঞ্জি ঃ

১. আসকার রচনাবলি ৭, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা বই মেলা ১৯৯৬, জানুয়ারি ১৯৯৬

২. আসকার ইবনে শাইখ: বাংলা মঞ্চ নাটকের পশ্চাতভুমি, একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬, সাতরং প্রকাশনী, গ্রিনরোড, ঢাকা

৩. আসকার ইবনে শাইখ: ক্রুসেডের ইতিবৃত্ত, মদিনা পাবলিকেশন্স, বাংলাবাজার ঢাকা

৪. উইকিপিডিয়া; ১২ মার্চ ২০১৭

৫. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক

৬. আল মাহমুদ: মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বাাশিশুএ ৬২১, তৃতীয় মুদ্রণ মে ২০০৮

৭. আসকার ইবনে শাইখ: কুরআন কাহিনী, জনপ্রশাসন পাবলিকেশনস, ফোন: ০১৯১১-৪৩৪৮৪৭, প্রকাশকাল ২০০৮ ৩/ক পুরানা পল্টন, ঢাকা ১০০০

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ