রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

তাংকুর ভয়াল ছোবল থেকে জাতিকে বাঁচান

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : তাংকু মানে তামাক। টোবাকো। বিশ্বজুড়ে এক মরাণাতঙ্কের নাম। অথচ এই তাংকুকে একশ্রেণির মানুষ চুমু দিচ্ছেন। আলিঙ্গন করছেন প্রতিদিন বারবার। কিন্তু তামাকের কল্কি অথবা বিড়ি-সিগারেটের পাছায় চুমুক দেয়া আর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবার কাজটি যে এক তা কে কাকে বোঝায়? যক্ষ¥াকে ইংরেজিতে বলে টিউবারকিউলোসিস। তাংকুর ইংরেজি টোবাকোর সঙ্গে এই টিউবারকিউলোসিসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা একমত।

তামাকসেবনের ভয়াবহ পরিণাম অবহিত হবার পর বিশ্বব্যাপী বিশেষত উন্নত বিশ্বে মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা দেখা গেলেও বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে কোনও ভালো লক্ষ¥ণ দেখা যায় না। উল্টো ধূমপানের প্রতি একশ্রেণির মানুষ ঝুঁকছে বেশি। কিশোর-তরুণদেরও ধূমপানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্কুল-কলেজসহ মাদরাসার ছাত্ররাও কেউ কেউ সিগারেটে অভ্যাস্থ হয়ে পড়ছেন। মহিলাদেরও কারুর কারুর ধূমপানে আসক্তি বাড়ছে আজকাল।

তাংকু হচ্ছে নিকোটিনের আধার। এটি ভয়াবহ বিষ। এবিষ প্রসেস করে দেহে ইঞ্জেক্ট করলে অল্পক্ষণের মধ্যেই মানুষ অক্কা পেতে পারে। নিকোটিন গোখরো সাপের বিষের চাইতেও বিষাক্ত। অথচ মানুষ এবিষে অহরহ চুমু দেয়। নিকোটিন ছাড়াও তামাকে আরও অসংখ্য উপাদান রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানান। এর সবটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। সত্যি বলতে কী এসব উপাদানের একটিও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সামান্যতম উপকারী নয়।  তামাক শুধু যক্ষ¥ারোগের জন্যই দায়ী নয়। ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানিসহ কিডনি, লিভার ও যকৃতেরও নানারোগ সৃষ্টি করে এই তামাক। ধূমপানজনিত রোগের কারণে পৃথিবীতে প্রতিবছর ষাট থেকে সত্তর লাখ মানুষ মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়ছে। আমাদের দেশেও বছরে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ শুধু ধূমপানজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে এক তথ্যে জানা যায়। প্রকৃতপক্ষে এ মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারনা করা হয়। কারণ এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

ধূমপান কেবল বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা বা কল্কিটানাই নয়। জর্দা, গুল, খাইনি বা সাদাপাতা চিবানোকেও বোঝায় না। বিড়ি, সিগারেট ও হুক্কার মাধ্যমে তাংকু পুড়িয়ে এর ধোঁয়া সেবন করা হলেও জর্দা, গুল ও খাইনিসেবনে তাংকু নামক বিষপাতা সরাসরি গলাধঃকরণ করেন মানুষ। এসবের মাধ্যমে ধোঁয়ার দূষণ না ছড়ালেও এর ব্যাপকতাও কিন্তু ভয়াবহ।

শহুরে নারীদের একটি অংশ সিগারেট পানে অভ্যস্ত হলেও গ্রামীণ নারীদের অনেকেরই জর্দা, গুল, সাদাপাতা চিবানোর বদ অভ্যাস আছে। এসবের সঙ্গে সঙ্গে সস্তায় মেলে এমন বিড়িতেও কম যান না তাঁরা। অনেকে দাঁতে ব্যথা হলে চিকিৎসা না করিয়ে গুল অথবা সাদাপাতা ব্যবহার করেন। এতে ব্যথাবেদনা সাময়িকভাবে কিছুটা কমে বটে। তবে পরবর্তীতে তা মারাত্মক হয়। এই জর্দা, গুল, সাদাপাতায় অভ্যস্তরা অনিরাময়যোগ্য রোগ মুখের ক্যান্সারসহ বহুবিধ জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হন।

তাংকু বা তামাক মারাত্মক বিষাক্ত জেনেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাষ করছেন অনেকে। তামাক বা সিগারেট-বিড়ি কোম্পানি থেকে এজন্য ঋণ দেয়া হয় প্রচুর। অনেকে এ লোভেও তাংকুর চাষ করেন। যে জমিতে একবার তামাকের চাষ হয় সে জমিতে অন্তত দশবছর আর কোনও ফসল হয় না। হলেও তা ভালো হয় না। তামাকের জমিতে ধান, গম, ভুট্টার চাষ করলে নিকোটিনের প্রভাব পড়ে। আবার এর অশুভ প্রভাব পড়ে যারা এশস্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। তামাক যে কতবড় ঘাতক তা জানলে কৃষকরা নিশ্চয়ই এর চাষ করতেন না। কিন্তু তাঁদের এসব তথ্য জানতে দেয়া হয় না কখনও।

ধূমপায়ী নিজের যেমন বারোটা বাজান, তেমনই অন্যেরও। ধূমপানের ধোঁয়া যে কেবলই পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে তাই না। ধূমপায়ীর ধারেকাছে যারা থাকেন তাদেরও ব্যাপক ক্ষতি করে। এটাকে পরোক্ষ ধূমপান বলে। বিশেষজ্ঞদের মতে সরাসরি ধূমপানের চেয়ে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি অনেক বেশি। তাই যারা পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করছেন তারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। এদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী আইনে মামলা ঠুকে দেয়া যেতে পারে সহজেই।

ধূমপায়ীরা এতোই কাণ্ডজ্ঞানহীন যে নিজের প্রিয় সন্তানের কল্যাণচিন্তার অবকাশ পর্যন্ত পান না। তাঁরা সন্তানের সামনে পর্যন্ত দ্বিধাহীনভাবে বিড়ি-সিগারেট ফোঁকেন। যারা এমন অমানবিক কর্ম করেন তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা দরকার অবিলম্বে। এরা নিরোগ জাতিগঠনের অন্তরায়। এরা কেবল আত্মঘাতী নন। জাতিঘাতকও বটে। যারা আত্মঘাতী কর্ম করেন তাঁরা অপরাধী। আইনে তাঁদের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু যারা জাতিঘাতক তাঁদের অপরাধ অনেক বেশি। অথচ জাতিঘাতকদের আইনের আওতায় আনবার কোনও ব্যবস্থা নেই বলেই চলে।

প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও এ আইন কেউ মানেন না। রাস্তাঘাটে, বাজারহাটে, দোকানে এখনও ধূমপান করেন একশ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন। অধূমপায়ী কেউ বাধা দিলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন অনেকেই। আইনানুযায়ী পুলিশ এদের জরিমানা করতে পারে। কিন্তু পুলিশতো নিজেরাই এ বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনি। অন্যের জরিমানা করবে কেমনে? বিবেক বলে একটা কিছু আছে না

উল্লেখ্য, যানবাহনে আজকাল ধূমপান অনেক কমেছে। বিশেষত মহানগরীতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের যাত্রীরা ধূমপান প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্য যাত্রী সাধারণকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। তবে বাস-মিনিবাসের ড্রাইভার-হেলপাররা ধূমপানের বদ অভ্যাস এখনও ভুলতে পারছেন না। তাঁরা ড্রাইভিং সিট ও বাস-মিনিবাসের গেটে সমানে ধূমপান করেন। এব্যাপারে কিছু বলেও তেমন লাভ হয় না। কিন্তু কেন? তাঁরা যদি এ বদ অভ্যাস অব্যাহত রাখেন, তাহলে যাত্রীদের ধূমপান না-করবার ফায়দাটা কী?

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিড়ি-সিগারেট, জর্দা, গুল প্রস্তুত হয়। সৈয়দপুর, হারাগাছ, যশোরসহ আরও অনেক স্থানেই বিড়ি, সিগারেট, জর্দার কারখানা আছে। এসব কারকানায় নারী এবং শিশুরাও শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এদের বেশির ভাগই যক্ষ¥সহ নানারোগে আক্রান্ত হয়ে অল্পবয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসা পর্যন্ত করা হয় না তাদের।

দেশে অনেক বিড়ি-সিগারেট ও জর্দা-গুলের কারখানা আছে, যেগুলো থেকে শুল্ক নেয়া হয় না। নেয়া হলেও খুব সামান্য। ফলে অনেক কমদামে এসব নেশাদ্রব্য বেচাকেনা হয়। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনে বিড়ি-সিগারেটের বিজ্ঞাপন বন্ধ থাকলেও এসব সস্তায় পাওয়া যায় বলে অনেকেই ধূমপানে উৎসাহিত হচ্ছেন। বিড়ি-সিগারেটের কোম্পানি থেকে যে শুল্ক পায় সরকার, তার চাইতে ডাবল খরচ হয় আক্রান্তদের চিকিৎসা করাতে। তাই ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে এখাতে শুল্ক বাড়ানো জরুরি বলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

তাংকু বা তামাক এমনই বিষাক্ত যে, এর সবুজ গাছ কোনও পশু বা গরু, ছাগল, খরগোস, ঘোড়া, হাতি, ভেড়াতেও খায় না। খায় শুধু মানুষ। পশু, পোকা-মাকড় সবজানে তামাক বিষ। এর ধারেকাছে যাওয়া ঠিক নয়। তাই তামাকের ধারেকাছে ওরা কেউ যায় না। কিন্তু সৃষ্টির সেরা মানুষ এই বিষপাতা তাংকু খায় নানাভাবে। এমনকি চুন ও মশলা দিয়ে এর শুকনো পাতাও হজম করে ফেলে দৃশ্যত। তবে এর পরিণাম টের পায় যখন টিবি, ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি শরীরের বিভিন্ন অংশে বাসা বাঁধে।

আমাদের এক প্রিয় সহকর্মী ছিলেন আমির খাসরু। খুব ভালো সাংবাদিক কলামিস্ট ছিলেন। আমি তাঁকে ভালোবেসে খাসরুহ বা বিশেষ আত্মা বলে মাঝেমাঝে সম্বোধন করতাম। তিনি চোখের সামনে ধুঁকেধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। তিনি চেইন স্মোকার ছিলেন। একটু পরপরই সিগারেট টানতেন। জর্দাসহকারে পানাসক্তও ছিলেন। মানে ডাবল নেশাখোর। লিভার, ফুঁসফুঁস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি বসতাম সংগ্রামের সম্পাদকীয় বিভাগে। সিগারেট জ্বাললেই তাঁকে আমি বাইরে তাড়িয়ে দিতাম। এজন্য আমি তাঁকে বহু বকাঝকা করেছি। কিন্তু বদ অভ্যাসটা ছাড়াতে পারিনি। আজ মনে হয়, এ অভ্যাস ছাড়াতে পারলে তিনি হয়তো এখনও আমাদের মাঝে থাকতেন। দেখতে-শুনতে আমার চেয়েও তরুণ ও জীবন্ত ছিলেন তিনি। আল্লাহ মরহুমের বেহেশত নসিব করুন। আমিন

ভাং-গাঁজার চাইতেও তাংকু মারাত্মক নেশা। কারণ ভাং-গাঁজা বেশি খেলে মানুষ ভারসাম্য হারায়। বেহুঁশ হয়। অভিভাবকদের চোখে পড়লে তা থেকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা চলে। কিন্তু তাংকু এমন নেশা যে সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না। অনেকদিন পর এর ঠেলা গায়ে লাগে। তাই তাংকুকে স্লো পয়জন বা নিরব ঘাতক বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাংকুর করাল গ্রাস মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করায়। তাই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে এক্ষণই সাবধান করে দেয়া জরুরি। তাংকু বা তামাক কোনও রোমান্সের নাম নয়। এ হলো ভয়াল মৃত্যুর ছোবল এর আগ্রাসন থেকে জাতিকে রক্ষা করা সময়ের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ