রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

গুম-খুন থেকে বাঁচতে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান বিশিষ্টজনদের

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সেমিনার হলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন আয়োজিত ‘গুম একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রাখেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান -সংগ্রাম

 

# গুম খুনের সঙ্গে জড়িতদের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে-- মাহমুদুর রহমান 

# গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক আইন কৌশলগত অবলম্বন হতে পারে-ফরহাদ মজাহার 

স্টাফ রিপোর্টার : গুম বিষয়ক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, রাজনৈতিক ভিন্ন মত দমন করতে সন্ত্রাসের নিকৃষ্টতম পন্থা গুমের আশ্রয় নিয়েছে রাষ্ট্র। গুম হত্যা থেকে বাঁচার জন্য হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা দুটোই উদ্ধার করতে হবে। এতে অভিযোগ করা হয়, যে দেশে গুমের মতো ঘটনা ঘটে আর বিচার বিভাগের কোন সক্রিয় ভূমিকা থাকে না সেই দেশের বিচার বিভাগও আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধী। গুম প্রতিরোধে ৬৯ এবং ৯০ এর মত গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান বক্তারা।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে এক সেমিনারে তারা একথা বলেন। ‘গুম একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করেন জনগণতান্ত্রিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠন। সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, বিশিষ্ট সমাজচিন্তক ও কবি ফরহাদ মজাহার। দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ড্যাব নেতা এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আক্তার হোসেন খান, এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, সাবেক মহাসচিব এম এ আজীজ, বিএফইউজের সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ডিইউজের সাধারণ সম্পাাদক জাহাঙ্গির আলম প্রধান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, সাবেক কোষাধ্যক্ষ বদিউল আলম, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক কাজিম রেজা ,ছাত্রদল নেতা আবুল হাসান প্রমূখ বক্তব্য রাখেন। 

সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করতেই এই অবস্থা। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক ভিন্ন মত দমন করা। আর গুম করে ভীতি তৈরি করা সন্ত্রাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট পন্থা। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশ থেকে স্বাধীনতা নির্বাসিত হয়েছে। এর দুটি অংশ একটি হলো-সরকারের ভেতরের অংশ। আরেকটি বাইরের।

তিনি উল্লেখ করেন, এর একটি উদ্দেশ্য হলো- বর্তমান সরকারের জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকা। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশকে উপনিবেশিক ভাবছে। এর অর্থ দেশের স্বাধীনতার কোন উপাদান অবশিষ্ট নেই। গুম হত্যা থেকে বাঁচার জন্য গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা দুটোই উদ্ধার করতে হবে। এজন্য তিনি ৬৯ এবং ৯০ এর মত শ্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এক সময় আমরা একজন শ্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। কিন্তু এখন এরশাদ ও হাসিনা মিলে ডাবল শ্বৈরাচার ক্ষমতায় বসে আছে। 

মাহমুদুর রহমান জেলের থাকার সময় একজন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলেন, জেলে থাকা অবস্থায় আমার পাশে একজন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বলেছেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির নির্দেশে অন্তত একশ’জনকে তিনি হত্যা করেছেন। এজন্য তার কোন অনুশোচনা নেই। তাহলে এসব ঘটনার জন্যতো রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের হুকুমের আসামি করা যায়। তারা মনে করছেন যে, অপরাধ করে তারা বেঁচে যাবেন। কিন্তু তারাই প্রমাণ করেছেন যে, ৪৫ বছর আগের অপরাধেরও বিচার করা যায়। তাহলে আজকে যারা গুম খুন করছেন তাদেরও একসময় আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে। 

গুম খুন থেকে বাঁচতে আন্দোলন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ওপর জোর দিয়ে এই পেশাজীবী নেতা বলেন, আজকে অনেকেই বন্দুকের নলকে ভয় পান। মনে রাখা দরকার, জনগণ মাঠে নামলে বন্দুকের নল ঘুরে যাবে। আন্দোলনে নামতে পারলে জালিমের পতন অনিবার্য। 

মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনগুলোর বরাত দিয়ে প্রবন্ধে ফরহাদ মজাহার দেখান, ২০০৯ সালের পর থেকে খুন গুম হত্যা বিশেষভাবে বেড়েছে। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৯ থেকে -২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৭০টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ৬৩ জন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এদের মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে গুম হয়ে যাওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম ইলিয়াস আলী ও সালাহ উদ্দিন আহমেদ। সালাহ উদ্দিনের ক্ষেত্রে দেখা যায় তিনি শুধু গুম হননি। তাকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের মেঘালয়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য যে, রাজনৈতিক নেতাদের গুম করে ফেলার ক্ষেত্রে ভারতীয় যোগসাজসের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। 

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ৫ বছরে ২৭৪জনকে গুম করে ফেলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ জনের লাশ পাওয়া গেছে। অথাৎ তারা জীবিত নাই, এই তথ্যটুকু অন্তত জানা গেছে। ১৫৯ জনের মধ্যে অনকেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে অথবা কোন না মামলায় আটক দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাকি ৮০ জনের কোন পাত্তা নেই। ২০১৯-এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত অন্তত ৩০জন নাগরিককে গুম করে ফেলা হয়েছে। 

ফরহাদ মজাহার বলেন, বাংলাদেশে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি আন্তর্জাতিকভাবে এতোটাই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে যে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের বিবৃতি দিতে হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক গুম অপহরণ ও বিচার বহির্ভূত হত্যকাণ্ডেরর ঘটনাগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে। ঘটনার শিকার যারা সেইসব নাগরিকদের যথাযথ সহায়তা দিতে হবে। সরকারের উচিত গুম ও অপহৃত ব্যক্তিদের সন্ধান করা এবং তাদের আত্মীয়দের তদন্তের অগ্রগতি জানানো। 

প্রতিবেদনে ছয় মাস আগে বিরোধী দলের তিন নেতার সন্তানের অপহরণ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেসময় জাতিসংঘের ‘গ্রুপ অব ইনভলান্টারি এনফোর্সড ডিসাপেয়ারেন্স’ বাংলাদেশ সরকারকে তাদের খুজে বের করার কথা বলে। হুম্মাম কাদের চৌধুরী ইতিমধ্যে মুক্তি পেলেও আরো দুই জন মীর আহমেদ বিন কাশেম ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ হিল আমান আল-আজমী এখনো রাষ্ট্রের কাছে বন্দি আছেন। 

গুম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, গুম করার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিককে সকল প্রকার আইনী সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা শুরু নয়, সে যেন কখনো জীবিত থেকে আইনী পরিমণ্ডলে প্রর্ত্যাবর্তন করতে না পারে তার সম্ভাবনা নিশ্চিত করা। এতে অভিযোগ করা হয়, যে দেশে গুমের মতো ঘটনা ঘটে আর বিচার বিভাগের কোন সক্রিয় ভূমিকা থাকে না সেই দেশের বিচার বিভাগও আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধী। 

রাষ্ট্র কেন এই সন্ত্রাসী ভূমিকা নেয় এমন প্রশ্নের ব্যাখ্যায় প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, এর প্রধান কারণ নাগরিকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতংক তৈরি করে গণতন্ত্র ও গণবিরোধী শাসন অব্যাহত রাখা। এর প্রতিরোধ করতে হলে আন্তর্জাতিক আইন একটি কৌশলগত অবলম্বন হতে পারে। এর প্রতিকারে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা খুবই আবশ্যক হয়ে ওঠছে বলে মত দেন প্রাবন্ধিক। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবাদ না থাকায় গুম খুন এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। আর এর সাথে সম্পৃক্তরা নিজেদের আইনের উর্ধ্বে ভাবছে। ফলে তার যা খুশি তাই করছে। তিনি এর জন্য শক্তিশালী প্রতিবাদ আশা করেন এবং এই প্রতিবাদে জন সম্পৃক্ত করার কথা বলেন। এজন্য আরও হাজার হাজার মাহমুদুর রহমান এবং ফরহাদ মজাহার তৈরির পরামর্শ দেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আক্তার হোসেন খান বলেন, বর্তমানে একটি ট্রাইব্যুনাল চালু আছে। এই ট্রাইব্যুনাল বন্ধ হবে না। ২০ বছর পরে হলেও আজ যারা মানবতা বিরোধী অপরাধ করছেন তাদের সেখানে বিচার করা হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার দেশ চালানোর কিছু স্তম্ভ আছে। এর মধ্যে গুম খুন ধর্ষন একটি স্তম্ভ। তিনি সরকারের অন্যায় আচরণের পরিসংখ্যান করে জনগণের কাছে পৌছানোর পরামর্শ দেন।

সাংবাদিক নেতা এম আবদুল্লাহ বলেন, বিএনপির ভিশন ২০৩০ দেওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরে আবার গুম খুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গুম খুনের বিরুদ্ধে আবারো সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান তিনি। 

সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, গুম খুনের বিরুদ্ধে ঘুরে দাড়াতে হবে। নইলে আগামি প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়ী থাকতে হবে। 

শহিদুল ইসলাম বলেন, গুম খুনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। জোট থাকলেও এক দলের নেতাকর্মী গুম কিংবা খুনের শিকার হলে অন্য দলের পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয় না। এজন্য তিনি একটি রূপরেখা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, প্রতিবাদের ক্ষেত্রে সোস্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা দরকার। 

 সাংবাদিক নেতা এম এ আজীজ মনে করেন বর্তমান সরকার উৎখাত না হলে গুম খুন বন্ধ হবে না।অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গুম খুন করা হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা টাকার বিনিময়ে গুম খুন করে থাকে বলেও অভিযোগ করেন এই শিক্ষক নেতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ