শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বর্তমান সংসদের ‘নৈতিক অবস্থান’ নিয়েই উচ্চ আদালতের প্রশ্ন

সরদার আবদুর রহমান : ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতের বহুল আলোচিত রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্তমান জাতীয় সংসদের ‘নৈতিক অবস্থান’ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও অভিমতে সেই দিকটিই সুস্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকদের অভিমত, এই রায়ের পর নৈতিক কারণেই সংসদ ভেঙে দেয়া উচিৎ। 

আপিল বিভাগের আলোচিত রায় এবং বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ ও অভিমতে বর্তমান জাতীয় সংসদের কথা পরোক্ষ হলেও তাদের লক্ষণীয় মূল্যায়ন হলো, নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। এই সংসদ সেরকম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কি-না সে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, আদালত এমনটা ভেবেছিল যে, অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের শূন্যপদগুলো সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হবে। এক্ষেত্রে কোনো সরকারই পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোও সংসদে বা অন্য কোনো ফোরামে এ ইস্যুটি উত্থাপন করেনি। এর ফলে নির্বাচন কমিশন এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এখানে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি। 

সংসদ সদস্যদের সমালোচনা

রায়ে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে না হতে পারলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হয় না। আদালত বর্তমান সংসদের বিষয়ে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উল্লেখ করে, এটা দেখাচ্ছে যে, সংসদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। তারা দেওয়ানি মামলাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর কারণে সংসদ সদস্যরা বিচারকদের কার্যত ‘বস’-এ (কর্তৃত্ব অর্থে) পরিণত হয়েছেন, যা উচ্চ আদালতের বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে হুমকি সৃষ্টি করেছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী সংসদের ৭০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। আরো উল্লেখ করা হয়, অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আইন প্রণয়নসংক্রান্ত সংসদীয় বিতর্কে তারা কম আগ্রহী। এর পরিণাম হল, আজকের দিনে সংসদে পাস করা বেশিরভাগ আইন ‘ত্রুটিযুক্ত’। অসম্পূর্ণ এবং ‘নীচুমানের’ আইন প্রণয়নে তাদের দায়িত্ব উত্তমরূপে পালনের চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অপসারণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে তারা বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। বিচারকদের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের বিচার করা আইনপ্রণেতাদের কাজ নয়। বর্তমান সংসদ সম্পর্কে এটি একটি গুরুতর বর্ণনা বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন 

আদালত তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রায়ে উল্লেখ করে, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই পরাজিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আর সংসদে সহযোগিতা করেনি বিরোধী দল। শেষমেশ ১০ম সংসদীয় নির্বাচনে এসে অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। সংসদ যদি যথেষ্ট পরিণত না হয় তাহলে সংসদকে উচ্চতর বিচারিক ব্যবস্থার বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হবে আত্মঘাতী চেষ্টা। বিচার ব্যবস্থাকে সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা উচিত নয়। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিণত এবং পরিণতি অর্জন করতে হলে কমপক্ষে টানা ৪/৫ মেয়াদ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিত। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বর্তমান সংসদকে পরোক্ষে ‘অপরিণত’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

জনসম্পৃক্ততাহীন নির্বাচন

 ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বাকি ১৪৭ জন একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ফলে ৪ কোটি ৮০ লাখ ২৭ হাজার ভোটার নির্বাচনের আওতার বাইরে থেকে যান। বাকি প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৯ হাজার ভোটার নির্বাচনের আওতায় আসেন। এই ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোট প্রাপ্তির পরিমাণ দেখায় ১ কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার ৮৫০ জন। যার শতকরা হার ৪০.০৪ ভাগ। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি ভোটারই এই নির্বাচনের বাইরে থেকে গেছেন।

বিস্ময়কর ভোটের হিসাব

প্রশ্নবিদ্ধ এই নির্বাচনে বিনাভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত ১৫৩ জনের বাইরে ১৪৭টি আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ৩৯০ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনে গড়ে ২.৬ জন প্রার্থী ছিলেন। তাও এই প্রার্থীদের বেশীর ভাগই একটি দলের বিদ্রোহীরা। নির্বাচনে ৪১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১২টি অংশগ্রহণ করে। যার মধ্যে বিএনএফ-এর মতো সদ্য গজিয়ে ওঠা দলও রয়েছে। এই নির্বাচনে আসনপ্রাপ্ত দলসমূহের ভোটপ্রাপ্তির পরস্পরের ব্যবধানও ছিলো লক্ষণীয়। আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় ৭২.১৪% (আসন ২৩৪), জাতীয় পার্টি ৭% (আসন ৩৪), ওয়াকার্স পার্টি ২.১০% (আসন ৬), জাসদ (ইনু) ১.১৯% (আসন ৫), তরিকত ফেডারেশন ১.০৪% (আসন ২), জেপি (মঞ্জু) .৭৩% (আসন ২), বিএনএফ .৬৩% (আসন ১) এবং স্বতন্ত্র ১৫.০৬% (আসন ১৬)। এটি যে পরিস্কার ভাগাভাগির নির্বাচন ছিলো তাতে একমত দেশের সকল পর্যায়ের পর্যবেক্ষক। এই নির্বাচনে এমন এমপিও আছেন যারা শতকরা ২৫ ভগেরও কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। কয়েকজন আছেন যাদের ভোট প্রাপ্তির হার ৬.৭৫%, ৮.৯৪%, ১২.৭৫%, ১৫.৩৮%, ২০.২৯%, ২১.৩০%, ২২.২১%-এর মধ্যে সীমিত।

রকিবউদ্দীন আহমদ পরিচালিত এই নির্বাচনের এক নির্বাচনী প্রতিবেদনের মুখবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১২টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। উত্তপ্ত ও সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে ১৪৭টি নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হয়। তথাপি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’য়ালার অশেষ রহমতে সকলের সহযোগিতায় ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে ১৪৭টি নির্বাচনী এলাকায় ১৮,২০৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কারণে মোট ৫৯৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।’ এই নির্বাচন দেশী-বিদেশী সর্বমহলে বিতর্ক সৃষ্টি করলে এর আইনি বৈধতা অর্জন করতে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। সেখানে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ফলে সংবিধানের লঙ্ঘন ঘটেনি’ বলে রিট খারিজ করে দেয়া হয়। যেকারণে এই নির্বাচন আইনী বৈধতা অর্জন করে। কিন্তু বর্তমান আপিল বিভাগের রায়ের পর সংসদ নৈতিক দিক থেকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

বিশেষজ্ঞ অভিমত 

এবিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. মকসুদুর রহমান বলেন, আপিল বিভাগ জাতীয় সংসদের বিষয়ে যে সব অভিমত দিয়েছে তা যথার্থ ও সঠিক অভিমত। আইনের দৃষ্টিতে বর্তমান সংসদ বৈধ হলেও নৈতিকতার দৃষ্টিতে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমাদের দেশে যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিরাজমান সে প্রেক্ষিতে সংসদ বহাল রেখে আরেকটি নির্বাচন করা কোনভাবেই সমিচিন নয়। নৈতিক কারণেই এই সংসদ ভেঙে দেয়া উচিৎ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ