রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রতি ইউনিটের মূল্য ৭ টাকা ৭১ পয়সা করার প্রস্তাব কোম্পানিগুলোর

কামাল উদ্দিন সুমন : আবারো বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম। পাইকারি ও খুচরা গ্রাহক উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। বিইআরসির কর্মকর্তারা প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই শেষ করেছেন। এজন্য গণশুনানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিইআরসি কার্যালয়ে এই গণশুনানি শুরু হবে। বিইআরসির সচিব মুহা. মাহবুবর রহমান স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে গণশুনানির কথা জানানো হয়। 

অপর দিকে বিইআরসির সদস্য মোহম্মদ আজিজ খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনের জন্য এই শুনানীর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

 সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার পরিবর্তনের জন্য গণ শুনানীর আয়োজন করা হয়েছে ২৫ সেপ্টম্বর। বিইআরসির কাওরান বাজার কার্যালয়ে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের শুনানি হবে ২৬ সেপ্টেম্বর। এছাড়া পল্লী বিদ্যুতের ২৭ ডিপিডিসির ২৮ সেপ্টেম্বর ডেসকোর ২অক্টোবর ওজোপাডিকো ৩ এবং নওজোপাডিকোর শুনানি হবে ৪ অক্টোবর। 

বিইআরসির সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে পাইকারি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ (৭২ পয়সা) বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আর বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ হারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। 

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পিডিবি এবং বিইআরসির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য এবার যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তাতে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডেসকো) ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৮ দশমিক ৮৬,পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১০ দশমিক ৭৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর কথা বলেছে। 

বিদ্যুতের দাম ছাড়া ও দু’ একটি বিতরণ কোম্পানি গ্রাহক পর্যায়ে ডিমান্ড চার্জ ও সার্ভিস চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বলে বিইআরসির সূত্র জানায়। বর্তমানে প্রতিটি মিটারে প্রতি মাসে ৩০ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ ও ১০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ ধার্য আছে। এটা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৪০ টাকা ও ২০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে কোনো কোনো বিতরণ কোম্পানি।

এখন দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদনমূল্য ৫ টাকা ৫৯ পয়সা। এর সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় যুক্ত করে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গড় দাম পড়ে ৬ টাকা ৭৩ পয়সা। কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী দাম বাড়ানো হলে প্রতি ইউনিটের গড় দাম হবে প্রায় ৭ টাকা ৭১ পয়সা।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ১লা মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে পাইকারি পর্যায়ে ছয়বার এবং খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কিছু দিন আগে বলেছিলেন , বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির (গ্যাস) দাম বাড়ানো হয়েছে। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে তেলও (ফার্নেস অয়েল) কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি পড়ছে। সরকারকে এখনো বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাই দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি তো নেই-ই, বরং দাম কমানোর সুযোগ আছে। সরকারও বলেছিল ২০১৩-১৪ সালে দাম কমানোর কথা। সেটা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার দায়ভার গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানো তো অনৈতিক।

অধ্যাপক ম তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করার কোনো যুক্তি নেই। সরকার ফার্নেস তেলের দাম সমন্বয় করে বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে দেশের প্রায় সব মানুষ উপকৃত হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর সব জায়গাতেই এখন জ্বালানির দাম কম। তাই কিছুটা হলেও বিদ্যুতের দাম কমানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকার আবারও একই ভুল করতে যাচ্ছে। এতে করে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং সক্ষমতা কমছে। এমনটি হলে অন্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে টিকতে পারব কি না সন্দেহ আছে।’

তারা বলেন, ‘সরকারের উচিত ব্যবসা করার খরচ বৃদ্ধির ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো বন্ধ করা। শুধু বিদ্যুতের সিস্টেম লস বন্ধ করলেই অনেকটা সমাধান হয়ে যেত। গ্যাস-বিদ্যুতের এত  চোরাই সংযোগ, এগুলো থামানো হচ্ছে না কেন? আমরা যারা নিয়মিত বিল দিচ্ছি, তাদের ঘাড়েই কেন বাড়তি দাম চাপানো হচ্ছে?’ বিদ্যুৎ কীভাবে সাশ্রয়ী করা যায়, সরকারের সেই চিন্তা করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘যে অসংগতিগুলো থাকার কারণে, অসংগতি বজায় রেখে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে এবং ঘাটতি দেখানো হচ্ছে, সেগুলো আমরা যৌক্তিক মনে করছি না।’

‘বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির প্রস্তাব যখনই সরকার আনে, বিইআরসি হেয়ারিংয়ে (গণশুনানি) যায়। আমরা কমানোর কোনো প্রস্তাব নিয়ে গেলে বা আমরা আপত্তির কোনো প্রস্তাব নিয়ে গেলে, সেটা গণশুনানিতে আসে না। বৈষম্যটা বজায় রেখে, অসমতা সৃষ্টি করে আপনি কোনো বিচার করতে পারবেন না। অসমতা সৃষ্টি করে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করাটাকে তো আমরা বিচারিক প্রক্রিয়া হিসেবে মানতে পারি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ