রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বাঙালী জাতীয় জীবনেপলাশীর শিক্ষা

মনসুর আহমদ : ব্যক্তি জীবনে ভাঙা-গড়া, জন্ম- মৃতু, উত্থান-পতন যেমন পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম, তেমনি জাতীয় জীবনের উত্থান পতনও এক চিরন্তন বিধান। ঐতিহাসিক ইবনে খলদুনের মতে, “কোন রাজবংশের উত্থান, বিস্তার, উন্নয়ন ও ধ্বংস সাধন প্রক্রিয়ায় বড় জোর একশ বছর টিকে থাকতে পারে।” বাংলার মুসলিম শাসনও এ চির চরিত নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী কর্তক বাংলায় যে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তার অবসান ঘটে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

এ যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বাঙালীর স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়, তেমনি বাঙালীর চরম ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। অন্য দিকে বৃটিশ রাজ শক্তির অভ্যুদয় ঘটে। এবং তারা অচিরেই মুসলমানদের হাত থেকে ভারতবর্ষের শাসন দণ্ড কেড়ে নেয়।  

বাংলার মুসলমানদের এই স্বাধীনতা বিপর্যয়ের কারণ শুরু হয় ছিল নবাব আলীবর্দী ও সিরাজ উদ্দৌলার বহু আগ থেকে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের জেষ্ঠ পুত্র বাহাদুর শাহের পুত্র আজিমুদ্দীন বাংলাদেশে ১৬৯৭ থেকে ১৭১২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুবাদার পদে নিযুক্ত ছিলেন। প্রথমেই তিনি ষোল হাজার টাকার বিনিময় ইংরেজ কোম্পানীকে এক খানা অনুমতি পত্র প্রদান করেন। ফলে ইংরেজ কোম্পানী মালিকদের কাছ থেকে সুতানটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা নামক গ্রাম খরিদ করার অনুমতি লাভ করে। সুবাদার আজিমুদ্দীন যে কোন উপায় অর্থ সঞ্চয় করে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করতে অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রদেশের ভাল মন্দের দিকে তিনি ছিলেন একবারই উদাসীন। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের প্রয়োজনে বাংলার কৃষক, বণিকদের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে ইংরেজদেরকে এ দেশের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তদার শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা লাভ করেছিল মুঘল শাসকদের দুর্বল উত্তরাধিকারগণের পক্ষ থেকে । মুর্শিদকুলী খানের আগমনের পূর্ব থেকে ইংরেজগণ মুঘল সম্রাটের ফরমান অনুসারে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার ভোগ করার আসছিল। মুর্শিদকুলী খান উপলব্ধি করেন যে ব্যবসা বাণিজ্যের উপর বাংলার সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। সুতরাং তিনি ইউরোপীয় ও স্থানীয় বণিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি ১৭১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট ই-িয়া কোম্পানীর দস্তক প্রথা বা ছাড় পত্র উঠিয়ে নিয়ে তাদের নিকট থেকে প্রচলিত হারে শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থা করেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ইংরেজ কোম্পানী সম্রাট ফররুখ শিয়ারের শরণাপন্ন হলে কোম্পানী বাৎসরিক মাত্র তিন হাজার টাকা বিনিময় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেন। 

বাণিজ্য ব্যাপারে কোম্পানী তার ‘দস্তক’ ব্যবহার করার অধিকার লাভ করার ফলে কোম্পানী সুরাট, বোম্বাই , মাদ্রাজ , হুগলী কাশিমপুর বাজার মালদহ কলকাতা প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ লাভ করে। পরবর্তীতে তারাই উরোপে শতবর্ষী ব্যাপী যুদ্ধের অজুহাতে ইংরেজ ও ফরাসী বণিকগণ বাংলায় দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। নবাব সিরাজ উদ্দৌলা তাদেরকে দুর্গ নির্মাণে নিরস্ত হতে আদেশ প্রদান করেন। ফরাসী বণিকগণ নবাবের আদেশ অনুযায়ী দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করে । কিন্তু উদ্ধত ইংরেজ বণিকগণ  সিরাজের আদেশ উপেক্ষা করে চলে। ইংরেজদের ঔদ্ধত্য পূর্ণ আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে ১৬ই জুন কলকাতাস্থ ইংরেজ ঘাটি ফোর্ট উইলিয়ম দখল করে। 

নবাব সিরাজ উদ্দৌলা কলকাতা জয় সমাপ্ত করে হিন্দু মানিক চাঁদের উপর কলকাতার ভার অর্পণ করে মুর্শিদাবাদ ফিরে আসেন। কলকাতা জয়ের পর এর রক্ষার জন্য কোন উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হল না। নবাব চেয়ে ছিলেন ইউরোপীয়রা নিজেদের সুসংহত করার জন্য দুর্গগুলিকে যে ভাবে দুর্ভেদ্য করে তুলেছিল তার সম্পূর্ণ অবসান। এ জন্য প্রয়োজন ছিল তাঁর কলকাতা জয়ের পর যাতে ইংরেজরা পুনরায় বাংলাদেশে শক্তি ও প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে না পারে তার যথাযথ ব্যবস্থা করা ; কিন্তু তিনি তা না করে কলকাতার দায়িত্বভার দিলেন মানিক চাঁদের উপর, যা ছিল সিরাজের এক চরম ভুল। 

কলকাতা থেকে ইংরেজরা বিতাড়িত হয়ে ফলতায় আশ্রয় নেওয়ার পরই মানিক চাঁদ নবাবের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করে গোপনে এক বিরাট অংকের ঘুষের বিনিময়ে ইংরেজদের পক্ষে চলে যায়। ফলে প্রায় বিনা যুদ্ধে ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াটসন ২রা জানুয়ারী ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা অধিকার করে এবং ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ সুরক্ষিত করে। ইংরেজরা কলকাতা অধিকার করেই নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। 

নবাবের প্রতি হিন্দুদের বিশ্বাস ঘাতকতা ও চক্রান্তই ছিল তাঁর পরাজয়ের মূল কারণ। এই চক্রান্তের বীজ বপিত হয়েছিল মুর্শিদকুলী ও আলীবর্দী খানের আমলে। মুর্শিদকুলী খানের অধীনে শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে শিক্ষিত বাঙালী হিন্দুগণ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাবার সুযোগ লাভ করে। হোসেন শাহী রাজ বংশের আমলে অভিজ্ঞ বাঙালী হিন্দুগণ দিওয়ান ,কানুনগো প্রভৃতি উচ্চ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। মুর্শিদকুলী খানের আমলে এই সব হিন্দু কর্মচারী অধিকতর উন্নতি ও পদমর্যদা লাভ করেন এবং এদের অনেকেই বৃহৎ জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।

মুর্শিদকুলী খানের পরে তাঁর জামাতা সুজাউদ্দীন খান বাংলার নবাব হন। তাঁর  আমলে দেওয়ান আলম চাঁদ মুর্শিদাবাদের খানসার দেওয়ান নিযুক্ত হন। সুজাউদ্দীন হিন্দু জমিদার বর্গের সহানুভূতি লাভের জন্য মুর্শিদকুলী খান প্রবর্তিত আইন কানুন গুলির কঠোরতা হ্রাস করেন, যা হিন্দু জমিগারদেরকে বিদ্রোহী হতে সহায়তা করে। 

সুজা উদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খান মুর্শিদাবাদের মসনদে আরোহন করেন। কিন্তু রাজ্য শাসনের ব্যাপারে সরফরাজ খান ছিলেন অনভিজ্ঞ। সুতরাং আলীবর্দী খান সরফরাজ খানকে সরিয়ে নিজে মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করার পরিকল্পনা করেন । আর তাই এই পরিকল্পনার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসাবে ছিলেন আলম চাঁদ, জগৎ শেঠ। আর এই জগৎ শেঠই পরবর্তীতে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হন। জগৎ শেঠ,  আলম চাঁদদের সহযোগিতা নিয়ে নবাব আলীবর্দী খান সরফরাজ খানকে পরাজিত করে বাংলার মসনদ দখল করেন। নবাব আলীবর্দীর শাসন কালে হিন্দুরা সর্বক্ষেত্রে প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে। 

নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পরে ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে সিরাজউদ্দৌলা মসনদে আরোহণ করেন। মসনদে আরোহনের সাথে সাথেই নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় তিনি প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে অসমর্থ হন। 

নবাব আলীবর্দী খানের সময় মীরজাফর প্রধান সেনাপতি পদ লাভ করেন। প্রধান সেনাপতি হিসেবে তার হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকায় শাসন কার্যে তার প্রচুর প্রভাব ছিল। এই কারণেই মীর জাফর তরুণ নবাবের একজন প্রবল শত্রু হয়ে ওঠেন। এই সুযোগটি গ্রহণ করে ইংরেজরা বুঝতে সক্ষম হয়েছিল যে যতদিন সিরাজ সিংহাসনে আসীন থাকবেন ততদিন তাদের স্বার্থ নিরাপদ থাকবে না।  নিজেদের মনোনীত কোন লোককে মুর্শিদাবাদের মসনদে অধিষ্ঠিত করতে পারলেই তাদের স্বার্থে নিরাপদ হবে এই ধারণা ইংরেজদের মনে বদদ্ধমূল হল। এ কারণে তারা উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে বেছে নিল মীরজাফরকে। সিরাজের প্রতি অসন্তুষ্ট ও উচ্চাভিলাষী বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ ও উমিচাঁদ প্রভৃতি সিংহাসন থেকে  সিরাজকে সরিয়ে মীর জাফরকে অধিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল।

হিন্দুদের  ষড়যন্ত্র ছিল তাদের শেষ চাল। নবাব সিরাজের হাতে ইতিপূর্বে কলকাতা পতনের পর যদি উমিচাঁদ নবকিষেণ, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ মানিক চাঁদ প্রভৃতি হিন্দু প্রধানরা ড্রেক ও তার লোকজনদের সাহায্য না করত তা হলে ইংরেজদের জন্য আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর ছিল না। এ ভাবেই মুর্শিদকুলী খানের সময় সুযোগ প্রাপ্ত হিন্দুরা নবাব সিরাজের পতনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত চক্রান্ত চালিয়ে এসেছিল।   

“পলাশীর যুদ্ধের প্রক্কালে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাঙালী হিন্দুরা যুক্ত বাংলার প্রসাশনিক পদগুলি প্রায় অধিকার করে বসেছিল এবং বৃহৎ জমিদার গোষ্ঠিাতে পরিণত হয়ে রাজস্ব বিষয়ক সকল কর্মই কুক্ষিগত করে ফেলেছিল । ভূম্যাধিকারেও তারা মুসলমানদের পেছনে পেছনে ছিল না। এ ভাবে বাংলা দেশে হিন্দুরা একখানি প্রভাব প্রতিপত্তি ও অর্থ বলের অধিকারী হয়েছিল যে , শ্রী মজুমদারের ভাষায়- “হিন্দু জমিদারেরা নবাবীর উপর সন্তুষ্ট ছিল না।” অতএব তারা বাংলার মসনদ থেকে মুসলমান নবাবক সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠবে এবং মুসলমানী শাহী লুপ্ত করতে ব্যগ্র হয়ে উঠবে, মোটেই বিচিত্র নয়।” 

ইতিহাস শুধু কিছু ঘটনা প্রবাহের আলোচনার নামই নয়। বরং ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের মানুষ তার সঠিক চলার পথ বেছে নেবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে এটাই ইতিহাস আলোচনার মূল দাবি। তই পলাশীর ইতিহাস মুসলমান জাতিকে শিক্ষা দেয় যে, নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিজস্ব সম্পদ, জনশক্তি ও সংস্কৃতির উপর নির্ভর করা প্রয়োজন। বিজাতীয় চিন্তা চেতনার ধারক বাহকদেরকে আপন ভেবে তাদের উপরে নির্ভর করলে জাতি সত্তা বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। অতএব অধিক রক্ত ক্ষরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাংলাদেশকে যেন নবাব সিরাজের পরিণতি ভোগ করতে না হয় সে ব্যাপারে এ দেশের নাগরিক ও রাজনীতিবিদদেরকে সাবধান থাকতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ