শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ কি অসম্ভব বিষয়?

‘ঘাটে ঘাটে শুধুই চাঁদাবাজি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায়। ১১ ডিসেম্বর তারিখে মুদ্রিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চাঁদাবাজি ধান্দার কাছে জীবনযাত্রা বাঁধা পড়ে আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই চলছে চাঁদাবাজির ধকল। ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিত রাখতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টেকাতে, সর্বোপরি প্রাণ বাঁচাতেও কাউকে না কাউকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কবল থেকে রক্ষা পেতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য পেতেও দিতে হয় আরেক ধরনের চাঁদা। রাজধানীর বাসাবাড়িতে নবজাতক জন্মালেও চাঁদার হাত বাড়ায় একদল হিজড়া। এমনকি কবরস্থান থেকে লাশ চুরি ঠেকাতেও মাসোহারা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। চাঁদাবাজি থামছে না কিছুতেই। রাজধানীর ফুটপাত থেকে শুরু করে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন পর্যন্ত চলছে চাঁদাবাজি। ভুক্তভোগীদের মতে চাঁদাবাজির ধরনেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। পাল্টে গেছে চাঁদার পরিমাণ ও স্টাইল। আগে কেবল শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করতো, এখন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগিদের সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবশালী গ্রুপ।
রাজধানীর ফুটপাত ও পরিবহন সেক্টরে বিস্তৃত চাঁদাবাজির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। রাজধানীর ফুটপাতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে লাইনম্যান নামধারীরা হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলে। গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টনসহ আশপাশের ফুটপাত থেকেই মাসে মাসে কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। এসব চাঁদাবাজি বন্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ৭২ জন চাঁদাবাজকে চিহ্নিত করে মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলার পর চিহ্নিত চাঁদাবাজরা মামলার খরচের নামে চাঁদার রেট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৪২ পয়েন্টে ফুটপাত ও ১৪টি স্থানে অবৈধ হাটবাজার বসিয়ে চাঁদাবাজরা বছরে কোটি কোটি টাকা তুলছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ আর চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট এসব টাকা ভাগ করে নিচ্ছে। ফলে নানা উদ্যোগের পরও ফুটপাত-রাস্তা দখলমুক্ত হয় না। দূর হয় না নগরবাসীর ভোগান্তি। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম থামানোর সাধ্য যেন কারো নেই। ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পরিবহন চাঁদাবাজদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় র‌্যাব-পুলিশের উদ্যোগ ভেস্তে যায়। রাজধানীর শতাধিক পয়েন্টে এ চাঁদাবাজি এখন অপ্রতিরোধ্য রূপ নিয়েছে। একশ্রেণীর পরিবহন শ্রমিক চিহ্নিত, সন্ত্রাসী,পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সম্মিলিত চাঁদাবাজ চক্র। তাদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে যানবাহন চালক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। চাঁদাবাজির অত্যাচারে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন রুটে পরিবহন ধর্মঘট পর্যন্ত হচ্ছে।
চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে তেমন কাজ হবে বলে মনে হয় না। আর নগদ এতো অর্থের লোভ সামলানো কোন সহজ কাজ নয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শুধু মাস্তান কিংবা সন্ত্রাসীরা নয়, চাঁদাবাজির সাথে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী এবং একশ্রেণীর পুলিশ সদস্যরাও। এসব বিষয় বিবেচনায় আনলে সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কৌশলের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নীতিনিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রচার-প্রোপাগান্ডার বদৌলতে চাঁদাবাজির বর্তমান সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ