শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

গেইল যেখানে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : ক্রিকেট এখন ছোট হতে হতে দশ ওভারে এসে ঠেকেছে। সেখানে এখনো নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ মেলেনি ক্রিস গেইলের। তবে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে যে তিনি কতটা দানবীয় আচরণ করতে পারেন তা আরো একবার দেখল ঢাকার দর্শকরা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) এলিমেনেটর ও ফাইনালে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। আরো একবার বিস্ফোরক ব্যাটিং দেখালেন ক্যারিবীয় এ ব্যাটিং দানব। আর এতে তিনি ভেঙে দিলেন একগাদা রেকর্ড। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর বিপিএলের ফাইনালে ইনিংস শেষে ১৪৬ রানে অপরাজিত থাকেন গেইল। অন্যপ্রান্তে ৫১ রানে অপরাজিত থাকেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। এতে ২০৬/১ সংগ্রহ নিয়ে ইনিংস শেষ করে রংপুর রাইডার্স। মিরপুর শেরেবাংলা মাঠে ইনিংসের দ্বিতীয় উইকেটে গেইল-ম্যাককালাম গড়েন ২০১ রানের জুটি। পাঁচবারের বিপিএল ফাইনালে দলীয় ২০০ রানের প্রথম ঘটনা এটি। আর আসরের ইতিহাসে জুটিতে ২০০ রানেরও এটি প্রথম ঘটনা। ফাইনালে টস জিতে রংপুর রাইডার্সকে ব্যাটিংয়ে পাঠান ঢাকা ডায়নামাইটস অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচে কুমিল্লার বিপক্ষে ব্যাট হাতে হার না মানা ১০৫ রানের ইনিংস খেলেন জনসন চার্লস। তবে ফাইনালে অল্পতেই উইকেট খোয়ান রংপুর রাইডার্সের এ ক্যারিবীয় ওপেনার। এদিন ব্যক্তিগত ৩ রানে ঢাকা ডায়নামাইটসের বাঁ-হাতি স্পিনার সাকিব আল হাসানের ডেলিভারিতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন জনসন চার্লস। তবে ফিল্ডিংকালে ঢাকা ডায়নামাইটসের উল্লাসের সেখানেই শেষ। পরের ১৮.১ ওভার ঢাকা ডায়নামাইটসের তারকারা ব্যস্ত ছিলেন সীমানার বাইরে থেকে বল কুড়াতে। এ সময় জুটিতে ক্রিস গেইল ও ম্যাককালাম সাকুল্যে হাঁকান ৯টি চার ও ২১টি ছক্কা। চলতি আসরে এটি গেইলের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। আর এক ম্যাচের ব্যবধানে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি হাঁকালেন তিনি। ৫৭ বলে সেঞ্চুরি পূরণ করেন তিনি। আসরের এলিমিনেটর ম্যাচে ৫১ বলে হার না মানা ১২৬ রানের ইনিংস খেলেন গেইল। আসরের প্রথম কোয়ালিফায়ার ম্যাচে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে শিরোপাধারী ঢাকা ডায়নামাইটস। আর এলিমিনেটর ও দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে যথাক্রমে খুলনা টাইটানস ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে রংপুর রাইডার্স। আর টানা দুই ম্যাচে ব্যাট হাতে পৃথক সেঞ্চুরি হাঁকান রংপুর রাইডার্সের ক্যারিবীয় দুই ওপেনার ক্রিস গেইল ও জনসন চার্লস। যদিও এলিমেনেটর নিয়ে কম নাটক হয়নি। আর এটা হয়েছে বৃষ্টির কারণে। সে সময় বঙ্গোপসাগর ছিল শান্ত। লঘুচাপের প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর বৃষ্টি শেষে দেখা মিলেছে সূর্যের। ফাইনালের আগের কয়েকদিন ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টিতে জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। সূয্যিমামার হাসি তো মিলেছে কিন্তু ঢাকাবাসীর মনে তাতে স্বস্তি ছিলনা। বৃষ্টি শেষ না হতেই যে টর্নেডো আঘাত হেনেছে রাজধানীতে। ‘গেইল’ নামক ক্রিকেটীয় টর্নেডোর প্রভাব শুধু মিরপুরে নয়, ঢাকার অলিগলি রাজপথে আঘাত হেনেছে। তাতে বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে ঢাকাবাসীর হƒদয়। নির্দিষ্ট করে বললে বিপিএলে অংশ নেয়া ঢাকা ডায়নাইমাটস সমর্থকদের। তাদের হƒদয়ে রক্তের চোরানদী বইয়ে দিয়েছেন সুদূর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ জ্যামাইকা থেকে আগত টি-টোয়েন্টির ফেরিওয়ালা ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল। ক্রিস গেইল নামে যিনি সমধিক পরিচিত। মানুষের আকৃতি নিয়ে জš§ নেয়া গেইল আদলে ক্রিকেটের দানব। চার-ছক্কার মাস্টার এ ক্যারিবীয় তার ব্যাটিং ক্যারিশমায় মানবীয় কীর্তিকে বহু আগেই ছাড়িয়ে দানবে নামিয়ে এনেছেন। বিশ্বে তো ক্রিকেটারের অভাব নেই। কিন্তু গেইল এই বিশ্বব্রাহ্মন্ডের একজনই। গেইল একাই একশ’। যদিও এই প্রবাদকেও ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। গেইল একাই ‘একশ’ ছেচল্লিশ’। চার-ছক্কার ধুন্ধুমার ক্রিকেট সংস্করণ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওভার কত? সবারই জানা। ২০ ওভার। বল ১২০টি। অথচ নির্ধারিত ওভার কোটাও পূরণ করেননি। খেলেছেন মাত্র ১১.৩ ওভার। তাতেই কিনা করেছেন অপরাজিত ১৪৬ রান! ৬৯ বলে ১৪৬ রান করা কেবল গেইলের পক্ষেই সম্ভব। এটা কোনো মানবীয় ইনিংস, মনুষ্য কর্ম হতেই পারে না। দানবীয় ইনিংসের শাহেনশাহ আরো একবার নিজেকে ছাড়িয়ে গেলেন। বিপিএলের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সব রেকর্ডকে পায়ে দলে নতুন ইতিহাস রচনা করলেন। বিপিএলের ফাইনালে ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন গেইল। নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় তুলেন রংপুর রাইডার্সের এ তারকা ওপেনার। যেখানে গেইলের প্রতিদ্বন্ধী কেবল গেইলই। বেশিদিন আগের নয়। এই তো ফাইনালের পাঁচদিন আগে এই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেই দানবীয় ইনিংস খেলেন গেইল। এলিমিনেটর রাউন্ডে খুলনা টাইটান্সের বিপক্ষে মাত্র ৫১ বলে অপরাজিত ১২৬ রান করেন। গেইলের এমন ইনিংসেই ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে মাশরাফির দল রংপুর। ওঠে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে। অবশ্য কোয়ালিফায়ারে সেভাবে জ্বলে ওঠতে পারেননি গেইল। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে মাত্র ৩ রান করে মেহেদী হাসানের বলে আউট হন। কুমিল্লার বিপক্ষে শুরুতে হ্যামস্ট্রিংয়ে টানপড়ায় ইনিংস লম্বা করতে পারেননি গেইল। তাই বলে ডেঞ্জারম্যানকে হতাশ করেননি সতীর্থরা। আরেক মারকুটে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এবং জনসন চার্লস মিলে দারুণ ইনিংস খেলে কুমিল্লাকে বিদায় করে দলকে তুলে আনেন ফাইনালে। বড় মঞ্চের নায়ক গেইল। ঢাকার বিপক্ষে ১৪৬ রান করে সেটা আরেকবার প্রমাণ করেছেন তিনি। কেন তাকে বিভিন্ন লিগের বড় বড় ফ্রাঞ্চাইজি নিজ দলে রাখতে চান- সেটা বিপিএলে আরেকবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। ৩৮-সেও যে তিনি আঠারোর তারুণ্য, বাহুতে নবীন বল, বয়স যে কেবলই নিছক সংখ্যা গেইল তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বিপিএলে গেইলের এটি পঞ্চম সেঞ্চুরি (আগের চারটি ১১৬, ১১৪, অপরাজিত ১০১ এবং অপরাজিত ১২৬), যেখানে বিপিএলে সাকুল্যে সেঞ্চুরিই ১০টি। আর কোনো ব্যাটসম্যানের নেই একের অধিক সেঞ্চুরি। গেইলের এই পঞ্চম সেঞ্চুরি আবার বিপিএলের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। আগের সর্বোচ্চ রান ছিল তারই। বিপিএলের এই আসরেই অপরাজিত ১২৬ রান। সাব্বির রহমানের ১২২ রানের রেকর্ডকে পেছনে ফেলে কিছুদিন আগেই নতুন রেকর্ড গড়েন গেইল। এক ইনিংসে ১৮ ছক্কা মারার নতুন রেকর্ডও এটি। আগের সর্বোচ্চ ছক্কা ছিল ১৪টি। সেটিও গেইলেরই। খুলনা টাইটান্সের বিপক্ষে চলতি আসরে। এছাড়া ২০১৩ সালে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের হয়ে সিলেট রয়্যালসের বিপক্ষে ১২টি ছক্কা মারার পূর্বের রেকর্ডটিও ছিল তারই। বিপিএলে তার আরো দুটি ইনিংস আছে যেখানে তিনি ১১টি ও ১০টি করে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। বিপিএলে নিজের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ার পথে গেইল করেছেন কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ২০তম সেঞ্চুরি। আর অতিক্রম করেছেন আটশ’ ছক্কা মারার মাইলফলক। তার বর্তমান ছক্কা ৮১৯টি। ফাইনালে আরো একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছেন গেইল। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এগার হাজার রানের কোটা ছুঁয়েছেন এই ব্যাটিং দানব। বিপিএল ফাইনালে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ১১০০০ রান পূর্ণ হলো ক্রিস গেইলের। ইনিংস শেষে ৩১৭ ম্যাচের ক্যারিয়ারে গেইলের সংগ্রহ দাঁড়ালো ১১০৫৬। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে ১০০০০ রানের কীর্তি নেই কোনো ব্যাটসম্যানের। ইনিংস শেষে আসরে ১০০০ রানও পূর্ণ হলো গেইলের। বিপিএল ইতিহাসে ১০০০ রানের ল্যান্ডমার্ক ছোঁয়া দ্বিতীয় বিদেশি ব্যাটসম্যান তিনি। এমন কৃতিত্ব রয়েছে আর কেবল ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান মারলন স্যামুয়েলসের। বিপিএল ইতিহাসে সর্বাধিক ১৪০০ রানের কীর্তি স্বদেশি ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের। আসরে একটির বেশি সেঞ্চুরির কৃতিত্ব নেই কোনো খেলোয়াড়ের। বিপিএলে দ্রুততম ১০০০ রানের কীর্তিও গেইলের। আসরে ২৬ ইনিংসে গেইলের সংগ্রহ ১১৩৫ রান। বিপিএল ইতিহাসে এটি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। চলতি আসরে এলিমিনেটর ম্যাচে সাব্বির রহমানের রেকর্ড ভেঙেছিলেন গেইলই। ওই ম্যাচে ১২৬ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেন গেইল। গত আসরে রাজশাহী কিংসের ব্যাট হাতে ১২২ রানের ইনিংস খেলেন সাব্বির রহমান। ফাইনালে ব্যাট হাতে ইনিংসে ১৮টি ছক্কা হাঁকান ক্রিস গেইলের বিপিএল ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বাধিক ছক্কার রেকর্ড এটি। আগের রেকর্ডে এবারের এলিমিনেটর ম্যাচে গেইল হাঁকিয়েছিলেন ১৪টি ছক্কা। পাঁচবারের বিপিএল-এ ক্রিস গেইলের পূর্ণ হলো ছক্কার সেঞ্চুরিও।
আসরে গেইলের ছক্কার সংখ্যাটা দাঁড়ালো ১০৭-এ। বিপিএলে দ্বিতীয় সর্বাধিক ৪৭টি ছক্কা রয়েছে সাব্বির রহমানের। ফাইনালে অবিচ্ছিন্ন ২০১ রানের জুটি গড়লেন গেইল-ম্যাককালাম। পাঁচবারের বিপিএল ইতিহাসে জুটিতে ২০০ রানের প্রথম ঘটনা এটি। আগের রেকর্ডটি রচিত হয় ২০১৩’র আসরে। সেবার রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের ব্যাট হাতে অবিচ্ছিন্ন ১৯৭ রানের জুটি গড়েন কিউই ব্যাটসম্যান লো ভিনসেন্ট ও স্বদেশি তারকা শাহরিয়ার নাফিস। এবারের বিপিএলে সর্বাধিক ৪৮৫ রানের কৃতিত্বটা ক্রিস গেইলেরই। আসরে ৪০০ রানের কৃতিত্ব নেই আর কোনো ব্যাটসম্যানের। ঢাকা ডায়নামাইটসের ক্যারিবীয় ওপেনার এভিন লুইসের সংগ্রহ দ্বিতীয় সর্বাধিক ৩৯৬ রান। আসরের ১১ ম্যাচে গেইল হাঁকালেন সর্বাধিক ৪৭টি ছক্কা। লুইস ছক্কা হাঁকিয়েছেন ২৭টি।
বিপিএলে গেইলের পাঁচ সেঞ্চুরি
রান    বল    ৪/৬    দল    প্রতিপক্ষ    সাল
১৪৬*    ৬৯    ৫/১৮    রংপুর    ঢাকা    ২০১৭
১২৬*    ৫১    ৬/১৪    রংপুর    খুলনা    ২০১৭
১১৪    ৫১    ৫/১২    ঢাকা    সিলেট    ২০১৩
১১৬    ৬১    ৬/১১    বরিশাল    ঢাকা    ২০১২
১০১*    ৪৪    ৭/১০    বরিশাল    সিলেট    ২০১২
৯২*    ৪৭    ৬/৯    বরিশাল    চিটাগং    ২০১৫

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ