শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

নতুন ক্লাসের নতুন বই

গতকাল সোমবার আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের উদ্যোগে জাতীয়ভাবে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উৎসব পালন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : নতুন ক্লাসের নতুন বই, নতুন নতুন গন্ধ। নতুন বছরের প্রথম দিন সারা দেশে স্কুলশিশুরা মেতে ওঠে নতুন বইয়ের উৎসবে। বছরের প্রথম দিন গতকাল সোমবার দেশের সব স্কুলে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া হয়।
উৎসব মুখর পরিবেশে রাজধানীর আজিমপুর গবর্নমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান ফিজার সোমবার সকালে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের এবং আজিমপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বই বিতরণ করা হয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার গণভবনে কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন।
মাধ্যমিকের বই উৎসব : মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বই উৎসব উপলক্ষে আজিমপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে। উৎসবের মঞ্চ ছিল লাল-সবুজে মোড়ানো। ছাত্র-ছাত্রী আর অতিথিদের ক্যাপেও ছিল জাতীয় পতাকার রঙ। হাতে পাওয়া বই তুলে ধরে উৎসবের রঙে মিশে যায় শিশুরা।
জাতীয় সংগীতের পর বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ২৫টি বিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয় এই উৎসবে। তার মধ্যে সাতটি বিদ্যালয়ের সাতজনের হাতে বই তুলে দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, উৎসবের মধ্য দিয়ে চার কোটি ৩৭ লাখ ছয় হাজার ৮৯৫ জন শিক্ষার্থী বই পাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি বাড়িতে কোনো না কোনোভাবে নতুন বইয়ের ছোঁয়া লাগবে। এবারের পাঠ্যবইয়ে কিছু পরিবর্তন আনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা বইয়ে অনেক পরিবর্তন এনেছি, আপনারা দেখতে পাবেন। শিক্ষাবিদদের মধ্যে দিয়ে ১২টি নতুন বইয়ের যাত্রা শুরু করলাম। বাঁধাই ও কলেবরের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন।
গত বছর পাঠ্যপুস্তকে নানা ধরনের ভুলের কারণে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল সরকারকে; নানা বিতর্কের পর সংশোধনীও এনেছিল সরকার। সেদিকে ইঙ্গিত করে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন,  কিছু মূল বইয়ে সংস্কার ও সংশোধনী আনা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা যাতে পড়তে পারে সেজন্য আমরা ব্রেইল পদ্ধতির বই তৈরি করে দিয়েছি। আমরা ৯৬৩জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর হাতে এই বই তুলে দিচ্ছি। তারা চাইলে অডিও শুনেও শিখে নিতে পারবে, সেই ব্যবস্থাও আমরা করে দিয়েছি।
বিনামূল্যে বই দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর সব দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে মন্তব্য করে নাহিদ বলেন, আমরা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে পারি, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। বছরের প্রথম দিন এত শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছি।
তিনি বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম মেধার দিক দিয়ে দারিদ্র্য নয়, তারাই দেশের আগামীর কর্ণধার। আমরা দেশব্যাপী ৩৫ কোটির ওপরে বই দিচ্ছি। এবারের বই অনেক ভালো মানের কাগজে ছাপা হয়েছে। বইগুলো পড়ে শিশুরা অনেক মজা পাবে।
এসময় কয়েক হাজার শিশু বই পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। নতুন বই হাতে পেয়েই উঁচু করে ধরে উপস্থিত অতিথিদেরকে দেখায়। চুমকি উড়িয়ে আনন্দ করে। শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও খুশি। এক পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিশুদের মাঝে গিয়ে আনন্দ করেন,  ছবি তোলেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র সাহা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. মাহাবুবুর রহমান এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বক্তৃতা করেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৬ হাজার ৮৯৫ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই বিতরণ করা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বই ছাপা ও স্কুলে পৌঁছে দেয়ার কাজে প্রায় ৯৮ হাজার জনবল কাজ করেছে। নতুন বই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য নববর্ষের উপহার উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সকল শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। নতুন বই শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রেরণা ও উৎসাহ সৃষ্টি করে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাধ্যমিক স্তরের এক কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১৮ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯২১টি বই বিতরণ করা হবে। প্রাথমিক স্তরে ২ (দুই) কোটি ১৭ লাখ ২১ হাজার ১২৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১০ কোটি ৩৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০৫টি বই বিতরণ করা হবে। এছাড়াও প্রাক-প্রাথমিকের ৩৪ লাখ ১১ হাজার ১৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৮টি বই ছাপা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৫৮ হাজার ২৫৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচটি ভাষায় এক লাখ ৪৯ হাজার ২৭৬টি বই ছাপা হয়েছে। এছাড়াও ৯৬৩ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য ৮ হাজার ৪০৫টি ব্রেইল বই বিতরণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক ও প্রাক প্রাথমিকের বই উৎসব: প্রথম দিনে শীতকে উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে উপস্থিত হয়েছে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা। নাচে গানে বই বিতরণ উৎসব-২০১৮ পালন করছে শিশুরা।
সোমবার সকাল থেকেই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপ দেশাত্মবোধকসহ নানা গানে মেতে উঠেছে। প্রত্যেকের মুখে আনন্দের ছাপ। এ দিন সকালে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। এ সময় মন্ত্রী কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেন।
উদ্বোধনের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিবছরের মতো এই দিনটা সবার কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর প্রাথমিক শিক্ষা সব শিক্ষার মেরুদণ্ড। বর্তমানে মোট ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার বিদ্যালয়ে নতুন করে ল্যাপটপ, মডেম ও মাল্টিমিডিয়া দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সবার জন্য উপবৃত্তির দ্বার খুলে দেয়া হয়েছে। এখন সব শিশুরাই স্কুলে যাচ্ছে। তাদের বিস্কুট দেয়া হচ্ছে। তবে আমি মনে করি বাবা-মা’রা শুধুমাত্র এসব কারণে এখন আর শিশুদের স্কুলে পাঠান না। তারা সন্তানদের দেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান তাই স্কুলে পাঠান।
এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির উপস্থাপক হানিফ সংকেত বলেন, আজকের দিনটা তোমাদের জন্য সত্যিই খুব আনন্দের। আমাদের সময় বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে হাতে বই পাওয়ার কথা আমরা চিন্তাই করতে পারতাম না। তোমরা শুধু বই নিলে চলবে না। বই পড়ে জীবনকে আলকিত করতে হবে। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও পড়তে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বিশেষ অতিথি ছিলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আসিফ-উজ-জামান, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের দুই কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৩ শিক্ষার্থীকে চার রঙের ১০ কোটি ৩৬ লাখ ২৫ হাজার ৪৮০টি নতুন বই বিতরণ করা হবে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩৪ লাখ ১১ হাজার ৮২৪টি ‘আমার বই’ ও অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হবে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরী এই পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩৪ হাজার ৬৪২টি ‘আমার বই’ ও অনুশীলন খাতা দেয়া হবে। এছাড়া উল্লিখিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রথম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের মোট ৭৯ হাজার ৯৯২টি বই বিতরণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ