সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে রাতের রাস্তা দখলে রাখে ৬ হাজার যাত্রীবাহী বাস 

রাজধানীতে রাতের বেলায় এভাবে রাস্তা দখল রাখে যাত্রীবাহি বাস

কামাল উদ্দিন সুমন : রাজধানীর জয়কালিমন্দির থেকে টিকাটুলিওভার ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশ্বেই রাত ১২টার পর থেকে সকাল পর্যন্ত দখলে রাখে যাত্রীবাহী বাস। অবস্থা দেখে মনে হয় এটা যেন অঘোষিত বাসস্ট্যান্ড । একই ভাবে  মালিবাগ থেকে খিলগাঁও পর্যস্ত বিশ্বরোডের দুই পাশেই সারি বেঁধে পার্ক করে রাখা শতাধিক বাস। থাকে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত। এসব বাসের বেশির ভাগই নগরীর অভ্যন্তরে চলাচল করা বাহন ও মিডওয়ে পরিবহনের। দুই পাশে পার্ক করে রাখা এসব বাসের চাপে সরু হয়ে গেছে প্রশস্ত রাস্তাটি।

একই অবস্থা কমলাপুর, মিরপুর, বঙ্গবাজার-ফুলবাড়িয়া, বসিলা বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কেরও। শুধু অভ্যন্তরীণ রুটের নয়, রাজধানীর রাস্তাকে পার্কিং পে¬স বানিয়ে ফেলেছে আন্তঃজেলা রুটের বাসও।

 বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মিনিবাস। এসব বাসের সিংহভাগই রাতে বিভিন্ন সড়কে পার্ক করে রাখা হয়।

 ঢাকায় আন্তঃজেলা রুটের বাসের জন্য চারটি টার্মিনাল থাকলেও এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো সিটি বাস টার্মিনাল। ফলে বাসগুলো বিভিন্ন রাস্তার ওপর পার্ক করে রাখেন মালিক-শ্রমিকরা। এ পরিস্থিতিতে ঢাকায় জরুরিভিত্তিতে একাধিক সিটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলাপুরের আউটার সার্কুলার রোড, মিরপুর ১০, মিরপুর ১৪, খিলগাঁও, কুড়িল বিশ্বরোড, বিমানবন্দর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, পীর জঙ্গি মাজার, উত্তরা আজমপুর বাসস্ট্যান্ড, উত্তরা ১১, বনশ্রী, আফতাবনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঝরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সড়কে বাস পার্ক করে রাখা হয়।

 সড়কে বাস পার্ক করে রাখার কারণ হিসেবে নগরীতে কোনো সিটি বাস টার্মিনাল না থাকাকে দায়ী করছেন পরিবহন মালিকরা। তারা বলছেন, নির্ধারিত জায়গা বা টার্মিনাল পেলে তারা অবশ্যই রাস্তা থেকে বাস সরিয়ে নেবেন। অন্যদিকে সংশি¬ষ্ট মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকায় সিটি বাস টার্মিনাল করার মতো প্রয়োজনীয় জায়গা বের করা কঠিন। এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

 তবে মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের এমন যুক্তি মানতে রাজি নন বিশেষজ্ঞরা। উন্নয়ন পরিকল্পনায় দূরদর্শিতা ও পেশাদারিত্বের অভাবের কারণে এত দিনেও ঢাকায় কোনো সিটি বাস টার্মিনাল গড়ে ওঠেনি বলে মনে করেন তারা।

 বিআরটিএর বাস নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেট্রো এলাকায় ৬ হাজার ৫১৯টি মিনিবাসের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। শতাধিক কোম্পানি ও ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে এসব বাস। একইভাবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬ হাজার ১০৩টি বাস নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। বিআরটিএর হিসাবে ঢাকায় বাসের নিয়মিত রুট ১৪১টি। তবে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত ও অনিয়মিত রুট হিসাবে নিলে সংখ্যাটি ৩০০ পেরিয়ে যাবে। ঢাকার এসব বাসের একটা বড় অংশ পার্ক করে রাখা হয় রাস্তার ওপর।

 মিরপুর ১২ নম্বর সড়কে প্রতি রাতে প্রায় ৫০টি হিমাচল পরিবহনের বাস পার্ক করে রাখা হয়। হিমাচল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, রাস্তা ছাড়া তো আমাদের বাস রাখার আর কোনো জায়গা নেই। তবে আমরা চেষ্টা করি গাড়ি চালুর স্থান ও গন্তব্যস্থল ছাড়া অন্য কোথাও বাস না পার্ক করতে। মিরপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে হিমাচল পরিবহনের ৭০টি বাস চলে বলে জানান তিনি, যার সবগুলোই পার্ক করে রাখা হয় রাস্তার ধারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল¬াহ দাবি করেন, শহরের মধ্যে বাস টার্মিনাল না থাকায় প্রায় সব কোম্পানির বাসই রাস্তায় পার্ক করে রাখা হয়। এটি যেমন যানজটের কারণ, তেমনি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণও। এ কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সিটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি।

 শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তঃজেলা রুটের বাসও পার্ক করে রাখা হয় বিভিন্ন সড়কে। আশুলিয়া, আমিনবাজার, গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালীসহ ঢাকা থেকে বের হওয়ার পয়েন্টগুলোয় এ প্রবণতা অনেক বেশি। রাস্তায় পার্ক করার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন আন্তঃজেলা রুটের বাস মালিকরা। এ সম্পর্কে ঢাকা-রংপুর রুটে চলাচলকারী আগমনী এক্সপ্রেসের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ঢাকায় আমাদের বাস রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই রাস্তায় বাস রাখি। এতে আমাদের বাস যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি রাস্তায় যানজটও হয়।

 কোনো সিটি বাস টার্মিনাল না থাকায় রাজধানীর পরিবহন সমস্যা অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। এ সমস্যা সমাধানে শহরে জরুরি ভিত্তিতে একাধিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, বাসের সমস্যাটা এককভাবে চিন্তা করলে হবে না। রাস্তা যেমন সরকার বানায়, তেমনি বাস টার্মিনাল, ঘুরানোর জায়গাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সরকারেরই নির্মাণ করে দেয়ার কথা। উন্নত বিশ্বে এমনটাই হয়। পাশাপাশি রোদ-বৃষ্টি থেকে যাত্রীদের বাঁচানোর জন্য আধুনিক বাস স্টপেজও সরকারেরই নির্মাণ করে দেয়ার কথা। আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতায় ২৯টি সিটি বাস টার্মিনাল আছে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত একটাও টার্মিনাল বানাতে পারলাম না। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বের অভাবের কারণেই এমনটি হয়েছে।

ঢাকার রাস্তায় বাস পার্কিংয়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা শহরে সিটি বাস টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের করার তেমন কিছুই নেই। শহরের মধ্যে বাস টার্মিনাল নির্মাণ, সেটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল মনে করেন , শহরের মধ্যে বাস টার্মিনাল নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রয়োজনীয় জায়গা খুঁজে পাওয়া। আমরা নিমতলী বস্তিতে একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। জমির অভাবে সেটি আটকে আছে। এ কারণে ঢাকায় নতুন করে সিটি বাস টার্মিনাল বানানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সমন্বিত বাস ব্যবস্থাপনার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার সঙ্গে টার্মিনালের বিষয়টি জড়িত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সড়কে বাস রাখার এ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আমি মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ