শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গরুর বিট-খাটাল চলছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের জাল স্বাক্ষরে 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা :  চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিট-খাটাল চলছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের স্বাক্ষর জাল করে। চলছে চোরাই গরু-মহিষের রমরমা বাণিজ্য। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থও। বিট মালিক ও স্থানীয় প্রশাসনসহ ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে পুরছেন সেই টাকা। 

যদিও বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খাটাল মালিকরা। জেলা প্রশাসন বলছেন, ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। বিজিবি জানিয়েছে, ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলছে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসছে ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষ। আর এসব গরু-মহিষ তোলা হচ্ছে সীমান্ত সংলগ্ন বিট-খাটালে। যেখানে করিডোরের মাধ্যমে কাষ্টমস গরু প্রতি ৫০০ টাকার বিনিময়ে ছাড়পত্র দিয়ে বৈধ করা হয় এসব চোরাই গরু-মহিষ। এমনই একটি বিট-খাটাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর বিওপি সংলগ্ন এই বিট খাটালটি। যেটি অবৈধভাবে পরিচালনা করছেন শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কেনাল আলী। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় দু’মাস ধরে এই খাটালটি পরিচালিত হচ্ছে জোচ্চুরির মাধ্যমে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব হারুন অর রশিদ বিশ্বাসের স্বাক্ষর জাল করে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, অবৈধ এই খাটাল থেকে জোরপূর্বক গরু-মহিষের জন্য জোড়া প্রতি ১২ হাজার ৪০০টাকা করে আদায় করছেন খাটাল মালিকরা। আর এই টাকা বিট মালিক কেনাল আলী ছাড়াও; স্থানীয় প্রশাসনসহ ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কতিপয় নেতারা ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে পুরছেন। গরু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে কয়েকশ গুণ বেশি অর্থ আদায় করছেন খাটাল মালিকরা। 

সরজমিনে ওই বিট-খাটালে গিয়ে দেখা যায়, ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষ বাবদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোড়া প্রতি নেয়া হচ্ছে ১২ হাজার ৪০০টাকা করে। কেন অতিরিক্ত অর্থ দিচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে গরু ব্যবসায়ী এনামুল জানান,‘বিট-খাটাল মালিকরা জোরপূর্বক এই অর্থ নিচ্ছেন। না দিয়ে কোন উপায়ও নেই। বিভিন্ন খাতের কথা বলে এই টাকা নিচ্ছেন তারা। এতে আমাদের কোন লাভই থাকছেনা। লাভের টাকার বড় অংশই চলে যাচ্ছে খাটাল মালিকদের পকেটে। অথচ জীবন বাজি রেখে আমরা ভারত থেকে গরু নিয়ে আসি। অপর গরু ব্যবসায়ী মোঃ শাহীন জানান, খাটালে অতিরিক্ত টাকা নেয়া ছাড়াও রাস্তা খরচের কারণে গরুর মাংসের দাম কমছে না। খাটাল এলাকায় আরো অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়টি বন্ধের জোর দাবী করেন প্রশাসনের কাছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে গরু ব্যবসা করা সিরাজগঞ্জের সাহাজাদপুর  নিবাসী  মোঃ শরিফুল ইসমলাম জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জোড়া প্রতি কাস্টমস্্ বাবদ ৫০০+৫০০=১০০০ টাকা এবং খাটাল বাবদ ৫০+৫০=১০০ টাকা অর্থাৎ ১১০০ টাকা করে নিলে আমাদের সুবিধা হয়। আর নিচ্ছে গরু জোড়া প্রতি ১২ হাজার ৪০০টাকা। অথচ অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নেই কোন ভূমিকা। 

ফতেপুর বিওপি সংলগ্ন এই বিট খাটালে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলার সময় গণমাধ্যম কর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধাও দেয়া হয় খাটাল মালিকদের পক্ষ থেকে। চলে গণমাধ্যম কর্মীদের বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজের চেষ্টাও। এমনকি সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে খাটাল কর্তৃপক্ষ আগেই সরিয়ে নেয় গরু-মহিষ।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী খাটালে প্রতিটি গবাদি পশুর জন্য ২০ টাকা ও অতিরিক্ত প্রতিদিনের জন্য ৩০ টাকা হারে ফি আদায়ের নিয়ম রয়েছে। অথচ এরই মধ্যে এই চক্রটি অবৈধভাবে সাত কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। যদিও বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খাটাল মালিকরা। খাটাল মালিকদের প্রতিনিধি মুক্তার হোসেন জানান, ‘ফতেপুর খাটাল থেকে কোন ধরনের বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছেনা। একটি মহল ইর্ষান্বিত হয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’ 

স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগকারী আব্দুস সালাম জানান, নিজের জন্য এই ফতেপুর বিট-খাটালের আবেদন করি এবং এ বিটের জন্য আর কেউ আবেদন করেছে কিনা তা যাচাই-বাছাইকালে এই কেনাল আলী কর্তৃক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের স্বাক্ষর, স্মারক ও তারিখ জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।

সম্প্রতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসা একটি লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের স্বাক্ষর জাল ও খাটাল অবৈধভাবে পরিচালনার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত-২ অধিদপ্তরের উপ-সচিব আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। আর অবৈধ বিটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, কেনাল আলী বিট পাওয়ার বিষয়ে কোন আবেদনই করেনি জেলা প্রশাসনের কাছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাওয়া চিঠির পর সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। আর ঐ বিট খাটালে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি বিজিবি’র দায়িত্ব বলে জানান তিনি। 

এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল সাজ্জাদ সরোয়ার জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি স্থানীয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পাওয়ার পর এ বিষয়ে একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলছে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। তবে তিনি বলেন, বিটটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুমোদন হয়েই আসছে। তাই আইনগতভাবে এটি চালাতে কোন বাধাও নেই। তবে ফতেপুর বিট-খাটালে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যান তিনি। 

এদিকে শিবগঞ্জের কানসাট করিডোর সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে প্রায় ১২ হাজার ৪৭৯ টি গরু-মহিষ করিডোর হয়েছে। যা থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৬২ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা। আর বিট খাটাল মালিকরা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন ৭ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার ৩৫০ টাকা।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ