সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শূন্যমাঠে আর খেলতে  দেয়া হবে না

 

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের স্বৈরতন্ত্র বিবর্তীত হয়ে নাৎসীবাদ অতিক্রম করে এখন ভয়ংকর হানাদারি শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পর্যুদস্ত করতে অবৈধ সরকার যে দমননীতির উত্থান ঘটিয়েছে তা নজীরবিহীন ও হিংসাশ্রয়ী। প্রধানমন্ত্রী যেন ব্যক্তিগত জিঘাংসা চরিতার্থ করতেই তাদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে যাচ্ছেন। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এবার আর শূন্য মাঠে গোল করার সুযোগ দেয়া হবেনা। সরকার যদি আবারো ৫ জানুয়ারির ন্যায় আরেকটি নির্বাচন করার চিন্তা করে থাকে তাহলে সেটি হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল। দেশের জনগণ সেটি আর হতে দিবে না। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।  

রিজভী বলেন, অন্যায় সাজায় কারাবন্দী দেশনেত্রীর সাথে ঈদের দিনে দলের সিনিয়র নেতাদের দেখা করতে দেয়া হয়নি। অনেক দেরিতে প্রায় আড়াই ঘন্টা কারা ফটকের বাহিরে আত্মীয়-স্বজনদের অপেক্ষা করিয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দেখা করতে দিলেও বাসা থেকে সঙ্গে আনা রান্না করা খাবার ঢুকতে দেয়া হয়নি। সকাল থেকে না খেয়ে অভূক্ত অবস্থায় দেশনেত্রী অপেক্ষা করছিলেন স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে আহার করবেন, অনেক দিন পর প্রিয় নাতিœকে সাথে নিয়ে খাবেন। কিন্তু কারাকর্তৃপক্ষ সরকারকে খুশি করতেই খাবার নিতে দেয়নি। অভূক্ত বেগম জিয়া বুকফাটা হাহাকারে নাতনী ও আত্মীয়দের সাথে খাবার খেতে পারলেন না। স্বজনদের সাথে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়ার যে আশায় তিনি সারাদিন অভূক্ত থাকলেন, সে আশা তার পূরণ হলো না। বাবাহারা নাতনীও এক বিশাল শূন্যতা নিয়ে দাদীর ওপর সরকারি নির্দয়তার বিভৎসরূপ দেখে বুকফাটা কান্না নিয়ে ফিরে আসে। দেশনেত্রীর ওপর অমানবিকতার দৃশ্য দেখে আত্মীয়-স্বজনরাও কাঁদতে কাঁদতে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। এজিদ কর্তৃক ফোরাত তীর অবরোধের ন্যায় এ সরকার বেগম জিয়ার খবার অবরোধ করে যে ঘৃণ্য ও অমানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা শুধু মনুষত্বহীনতায় নয়, তা অবৈধ ক্ষমতার অনমনীয় হিং¯্রতার একটি ভয়াবহ রুপ। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের মন্ত্রীরা প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে জড়িয়ে নানা বিষয়ে উদ্ভট কথা বলে যাচ্ছে অভিযোগ করে রিজভী বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের একনায়ক ও স্বৈরাচারদের দৃষ্টান্ত এই রকমই। স্বৈরাচারী সরকারের ইচ্ছাতেই রাজনৈতিক বিরোধীদের মামলায় জড়ানো হয়। আইন বিচার সবই তো সরকারের হাতের মুঠোয়, সুতরাং বেআইনী সরকার তার ইচ্ছা পূরণের জন্যই নিজের মতো করে আইন ও আদালতকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। নিম্ম আদালতে বিচারের রায়েও থাকে সরকারি প্রভাব। বাংলাদেশে ন্যায়-বিচারকে গুম করে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশে জোরেশোরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে হাসিনা-বিচার। গণতন্ত্রকে অদৃশ্য করে বিরোধী দল শূন্য করতে আদালতকে ব্যবহারের জন্য এর ওপর সরকারি বন্দুক তাক করে আছে। সরকারের সমালোচক, ভিন্নমত পোষণকারী ও বিরোধী দলকে দমানোর যন্ত্র হিসেবে নিম্ম আদালতকে ব্যবহার করে হচ্ছে। সুতরাং বিরোধীদের ন্যায় বিচার পাওয়া এখন সোনার হরিণ পাওয়ার মতোই দুঃসাধ্য। 

‘নির্বিঘেœ নিজের বাড়িতে ঈদ করার জন্য সরকার সবকিছু করেছে’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যেও সমালোচনা করে রিজভী বলেন, এই ডাহা মিথ্যাচারের নীরব প্রতিবাদে সারাদেশ উত্তাল। ঈদের দিনেই ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য। জীবন বাঁচাতে অনেক মানুষ এবার সড়ক পথের বদলে ট্রেন ও লঞ্চের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। ঘরমুখী মানুষ পরিজনদের সাথে ঈদ উৎসবে অংশগ্রহণ করার জন্য বাদুড়ঝোলা হয়ে ট্রেনে চড়েছে। ট্রেনের ছাদ এবং ভিতর লোকে লোকারণ্য। সড়ক-মহাসড়ক যেন বধ্যভূমি। গ্রামীণ রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গেছে। দুই যানবাহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ, যানবাহনের বেপরোয়া দ্রুতগতি, ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মাল পরিবহন, অস্বাভাবিক দ্রুতগতির জন্য চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো, বেআইন ওভারটেক ইত্যাদি নানা আইন বহির্ভূত কর্মকান্ডের জন্য ঈদের খুশির দিনেও বাড়িতে  শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ ভ্রমণ নির্বিঘেœ করার নমুনা।

রিজভী বলেন, যে সরকার নিজেই বেআইনী সে সরকার কখনোই যথাযথ আইন প্রয়োগ করে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। অবৈধ ক্ষমতা ধারণকারীদের কথাবার্তায় উগ্রতা, অহমিকা ও দম্ভের প্রকাশ ঘটে সব সময়। কিন্তু এরই জন্য রাষ্ট্রের কোথাও শৃংখলা, স্বস্তি ও আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ রাস্তা-ঘাট ও যানবাহনে কিছু দুর্বৃত্তরা সরকারের কাছ থেকে উৎসাহ পায়। ক’দিন আগে কোমলমতি শিশু-কিশোররা এই সমস্ত যন্ত্র দানবের বেআইনী চলাচলের কারণে সহপাঠিদের মৃত্যুতে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। তাদের আর কোন সহপাঠিদের যন্ত্র দানবের চাকার নিচে আর যেন পিষ্ট হতে না হয়, সেজন্য তারা রাস্তায় শৃংখলার সাথে নেমে গাড়ির লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসের কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছে সরকারের কর্তব্য কি হওয়া উচিৎ। কিন্তু সরকার সে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের ওপর নিজেদের ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত করলো, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে বর্বরোচিত নির্যাতন করলো। তাতে সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালকরা ও ফিটনেসহীন গাড়ির মালিকরা আরো বেশী উৎসাহিত হয়ে উঠলো।

ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশ্যে রিজভী বলেন, উনাকে সুস্পষ্টভাবে বলে রাখি, ৫ জানুয়ারির মতো আবারো একতরফা নির্বাচন জনগণ প্রতিহত করবেই। শূন্যমাঠে আর খেলতে দেয়া হবে না। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে, দেশনেত্রী বেগম জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। একটা জাতি রক্ত দিয়ে প্রাণ দিয়ে যে গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিলো তা আজ একতরফা বাকশালী শাসনে ভূতলে শায়ীত। সেজন্য আর একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে একদলীয় ব্যবস্থা চলতে দেয়া হবে না। আওয়ামী নেতাদের চিরকাল ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন, দুঃস্বপে- পরিণত হবে। ওবায়দুল কাদের সাহেবরা যে একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন তার আলামতও তারা দেখাচ্ছেন, দেশ বরেণ্য আইনজীবী ব্যরিস্টার মত্তদুদ আহমেদকে নিজ বাড়িতে কয়েকদিন অবরোধ করে রাখার পর ঈদের দিনে তার বাবা-মা‘র কবর জিয়ারত করতে না দেয়ায় মাধ্যমে। শেখ হাসিনা অধীনে নির্বাচন মানেই ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের আসতে না দেয়া। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না এজন্যই যে, তিনি বিরোধী দল সহ্য করেন না। তিনি গণতন্ত্রকে ঘৃণা করেন। তিনি শব্দহীন কবরের শান্তি পছন্দ করেন। একতরফা নির্বাচন করবেন বলেই তিনি প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বেগম জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাবন্দী করেন। তার বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা তিনি সহ্য করেন না। সমালোচনাকারীদের গ্রেফতার করে পুলিশ দিয়ে রিমান্ডে নিয়ে উৎপীড়ন করান। তিনি তার দল ও সরকারের সমালোচনাকারী বিএনপিসহ বিরোধী দলসমূহ, ভিন্ন মত ও বিশ্বাসী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই কটু ও অশ্রাব্য কথা বলে রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলেন। তিনি গণমাধ্যমকে সম্পূর্র্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। সমালোচনাকারী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরকে গুম ও ক্রয় ফায়ার করতেও দ্বিধা করেন না। সুতরাং শেখ হাসিনার অধীনে কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। কারণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শেখ হাসিনাই গুম করেছেন। একমাত্র নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে।

রাজধানীতে বিএনপির মিছিল : দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে রাজধানীর বনানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি কামাল আতাতুর্ক রোড থেকে শুরু হয়ে কাকলী মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা অংশ নেন।

এর আগেও কয়েকবার খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে রিজভী আহমেদের নেতৃত্বে রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার এড়াতে ঝটিকা মিছিল করা হয় বলে ওই সময় জানিয়েছিলেন তিনি। 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের দন্ড পেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরাতন ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এই মামলায় খালেদা জিয়া জামিনে থাকলেও অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোয় তার মুক্তি মিলছে না। তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করে আসছে বিএনপি। এছাড়া নতুন নতুন মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর পেছনে সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ দলটির।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ