বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অধ্যক্ষ মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ জাকারিয়া (রহঃ)

আ ফ ম আবদুস সাত্তার : নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার কৃতী সন্তান প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ জাকারিয়া গত ১২ নভেম্বর বাসা থেকে নিজ কর্মস্থল দশদোনা ফাজিল মাদরাসায় যাবার পথে হ্রদরোগে আক্রান্ত হয়ে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি স্ত্রী, ৪ ছেলে ও ২ মেয়েসহ বহু আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গিয়েছেন। তাঁর ইন্তিকালের সংবাদে নরসিংদীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর ইন্তিকালে শোক জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর জনাব মকবুল আহমাদ এবং নরসিংদী জেলা শাখা জামায়াত নেতৃবৃন্দসহ গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অধ্যক্ষ মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ জাকারিয়া ছিলেন নরসিংদী জেলা শাখ জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য। তিনি একাধারে রাজনৈতিক নেতা, সংগঠক, সমাজসেবক ও সুবক্তা ছিলেন। বলিষ্ঠতা ও বিনয় ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম সৌন্দর্য।
তাঁর চাচা মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ বুজর্গ। চাচার সুখ্যাতি ছিল সর্বত্র। পরিবারের আগ্রহ ছিল তিনি যেন চাচার মত বুজর্গ হিসেবে গড়ে উঠেন। শিক্ষা জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ইসলামী সাহিত্যের সং¯পর্শে আসেন। তাঁর চিন্তা পালটে যায়। তিনি ইসলামী আন্দোলনে শামিল হন। সিদ্ধান্ত নেন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জান ও মাল কুরবানির। জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রুকন) হন। সদস্য হিসেবে (রুকনিয়াতের) শপথের পর পর্যায়ক্রমে তাঁর উপর সাংগঠনিক দায়িত্ব আসতে শুরু করে। তিনি যোগ্যতার সাথে পলাশ উপজেলা ইমারতের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উপর মনোহরদী উপজেলা ইমারতের দায়িত্ব আসে। চষে বেড়াতে শুরু করেন মনোহরদীর সর্বত্র। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে ময়দানে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হতে থাকে। তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে স¤পর্ক গড়ে তুলেন। তৈরি হতে থাকে সংগঠনের গণভিত্তি। মনোহরদী উপজেলায় আজ সংগঠনের যে গণভিত্তি তৈরি হয়েছে তার পিছনে মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ জাকারিয়ার বিরাট অবদান রয়েছে। জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য হিসাবে আলেম উলামা,পীরমাশায়েখ, মাদরাসাশিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দীর্ঘদিন তাঁর উপরই ন্যাস্ত ছিল। সেই সুবাদে এ সেক্টরে তিনি সংগঠনের দাওয়াত পৌঁছান। মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের ব্যানারে মাদরাসার শিক্ষকগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং দাবি-দাওয়া আদায়ে সবাইকে সোচ্চার করে তুলেন। তাঁর নেতৃত্বে মাদরাসা শিক্ষকদের একাধিক জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নরসিংদীর আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখের নিকট তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ব্যক্তি। তাঁর ইইন্তিকালে এ ময়দানে  এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হল। তিনি সুবক্তা ও স-ুআলোচক ছিলেন। জনশক্তির প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে দারস পেশ করার দায়িত্ব প্রায়ই তাঁর উপর অর্পিত হত। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায়ও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তাঁর বক্তব্যে গভীরতা ও নতুনত্ব ছিল । শ্রোতারা বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত। তিনি একজন ভাল ওয়ায়েজ ছিলেন। জেলার সর্বত্র তাঁর ওয়াজের চাহিদা ছিল। তিনি নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ওয়াজ মাহফিলে আমন্ত্রিত মেহমান হিসাবে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি পর্যায়ক্রমে একাধিক মাদরাসায় প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ দশদোনা ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ পদে থাকা অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দায়ী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিপদ-মুসিবতে পিতা যেমন সন্তানকে আগলে রাখে, তেমনি তিনি ছাত্রছাত্রীদেরকে ঝুঁকির মুখে আগলে রাখতেন। ড্রীমহলিডেপার্ক সংলগ্ন জামে মসজিদে তিনি জুমআর খুতবা প্রদান করেন ও স্থানীয় একটি ঈদ্গাহে ঈদের সালাতে ইমামতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসার সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভুমিকা রাখেন।
সমিতি গঠন করে সমাজের দরিদ্র, অসহায়, ছিন্নমুল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে বাড়ির পাশে ৫/৬ বিঘা জমির একটি পুকুর নিজের নামে লীজ নিয়ে গ্রামবাসীকে উৎসর্গ করেন। গ্রামের  মানুষ এ পুকুর থেকে উপকৃত হচ্ছে এবং  সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। মানুষকে কনভিন্স করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে কঠিন সমস্যাদি বিবাদমান দু’ পক্ষকে কনভিন্স করে সহজেই সমাধান করতে পারদর্শী ছিলেন। গত কয়েক মাসে একাধিকবার ফোন করে আমার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিভিন্ন কারণে সাক্ষাত হয়ে উঠেনি। একবার সময় নির্ধারিত হলেও প্রাকৃতিক সমস্যার কারণে বাতিল হয়। তিনি চলে গেছেন। তাই আর কখনো তার সাথে সাক্ষাত হবে না। জানা যাবে না তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছে অপূর্ণ থাকায় খুব মনঃপীড়াবোধ করছি। মুমিনের প্রকৃত আবাস জান্নাত। আল্লাহ চাইলে এ সাক্ষাত জান্নাতে অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইন্তিকালের পূর্বে পারিবারিক কাজ, গোসল ও নাশতা সেরে মাদরাসার উদ্দেশে রওয়ানা হন। পথে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তিনি দ্বীনের পথে ইনতিকাল করেন। তাঁর এ ইন্তিকাল আল্লাহর পথে। তাঁর ২টি নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হ। একটি জামেয়া কাসেমিয়া ময়দানে, অপরটি শুকুন্দী হাইস্কুল মাঠে। নামাজে জানাযায় প্রচুর লোক সমাগম হয়। নামাজে জানাযায় ব্যাপক লোকের উপস্থিতি থেকে তাঁর বিশাল জনপ্রিয়তার ধারণা পাওয়া যায়।
জীবিত অবস্থায় তিনি একমেয়ে পাত্রস্থ করেন। অবশিষ্ট পাঁচ সন্তান অবিবাহিত। তারা সকলে পড়াশুনা করে। কোন সন্তান উপার্জনের উপযুক্ত হয়নি। আকস্মিকভাবে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়ে। পরিবারের স্বাভাবিক খরচ ও সন্তানদের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া আজ বড় চ্যালেঞ্জ। পরিশেষে মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি আল্লাহ যেন তাঁর গুনাহসমূহ মাফ করেন। তাঁর সমস্ত নেক আমল কবুল করেন ও জান্নাতুল ফিরদাউসে মেহমানদারির ব্যবস্থা করেন। তার অসহায় পরিবারের সহায় হন এবং অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে পরিবারের সদস্যদের চলার পথ সহজ করে দেন। আমীন।
লেখক : নরসিংদী জেলা শাখা জামায়াতের সাবেক আমীর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ