শুক্রবার ২৯ মে ২০২০
Online Edition

তীব্র গ্যাস সংকটে সময়মত রান্না হচ্ছে না রাজধানীর বহু এলাকায়

ইবরাহীম খলিল : প্রতিদিন সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই গ্যাস চলে যায়। লাইনে টিপ টিপ করে গ্যাস আসায় রান্না-বান্না বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়ে রাজধানীর বহু এলাকায়। অনেক গৃহবধূ চুলায় হাড়ি চড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে গ্যাস আসার অপেক্ষা করতে করতে ত্যক্ত বিরক্ত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে কবে। সেই প্রশ্ন এখন ঢাকার হাজার হাজার গৃহিনীর। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় অনেকেই সিলিন্ডার গ্যাস কিনছেন। বিকল্প পন্থা বেছে নিয়েছেন অনেকেই।
রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী গৃহবধূ উম্মে হাবিবা প্রতিদিন সকালে স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে ও ব্যবসায়ী স্বামীর জন্য দুপুরের খাবার রান্না করে তারপর অফিসে রওয়ানা হন। হটপটে করে নিজের জন্যও নিয়ে যান লাঞ্চ। কিন্তু শীত আসার পর থেকেই লাইনে গ্যাস না থাকায় ঘরে রান্না-বান্না বন্ধ। এ সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়েছেন। বিকেলে অফিস থেকে ফিরেই তথৈবচ অবস্থা। এক কাপ চা খাবেন সেই পানিও গরম করার জো নেই।
এ প্রশ্ন শুধু আজিমপুরের উম্মে হাবিবার একারই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা- মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মগবাজার, যাত্রাবাড়ি ও পুরান ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়ায় এমন প্রশ্ন হাজার হাজার মানুষের। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও ঠিকমতো সময় গ্যাস পাচ্ছি না।
তিতাস গ্যাস কর্মকর্তারা বলছেন গত কয়েকদিন যাবত রাজধানীতে তীব্র আকারে শীত জেঁকে বসেছে। এ কারণে আবাসিকে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। তাছাড়া তীব্র শীতের কারণে বিভিন্ন লাইনে গ্যাস জমে যাওয়ায়ও স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউশন লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী এইচ এম আলী আশরাফ বলেন, রাজধানীতে গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহার শতকরা ২০ ভাগ বেড়েছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গরমকালেই অনেক সময় গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়, আর এখন শীতের কারণে চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।
ভূক্তভোগীরা বলছেন, শীত এলেই রাজধানীতে প্রতিবছর তৈরি হয় গ্যাস সংকট। এটা যেনো এদেশের মৌসুমি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের প্রায় অধিকাংশ সময়ই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস থাকে না। তবে শীত এলেই এর প্রভাব বেশি দেখা দেয়।
রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, বসিলা, কাটাশুর, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারিঘাট, মিরপুর, গেন্ডারিয়া, মাদারটেকসহ আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা গেছে এই চিত্র। দিনে তো বটেই, রাতেও গ্যাসের দেখা মেলে না ঢাকার এসব এলাকায়।
সোয়ারিঘাটের একটি মেসে গ্যাস ব্যবহারকারী রফিকুল ইসলামবলেন, ‘গ্যাসের অভাবে আমাদের কেরোসিনের চুলায় রান্না করতে হয়। একদিকে গ্যাসের বিল আর আরেকদিকে চুলার খরচ। এই খরচ মেটাতে অনেক প্রেসারে পরে যেতে হয় আমাদের। আমরা ব্যাচেলররা থাকি এখানে, আমাদের অনেক জামেলা পোহাতে হয়। খরচও প্রতিমাসে বাড়ে। একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর বসিলাতেও। বসিলা এলাকার গৃহিণী জামেনা খাতুন বলেন, শীত এলেই গ্যাসের ঝামেলা বেড়ে যায়, ভাত হতেই লাগে তিন ঘণ্টা, অন্য সব কিছুর কথা তো বাদই, এ অবস্থার সমাধান হবে কবে? মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, গত ১৩ বছর ধরে গ্যাসের ঝামেলা পোহাচ্ছি, এই সময় এলেই চুলায় আগুন জলে না, তাই ১২ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়লেও এলপিজি গ্যাস কিনে নিছি, খাইয়া বাঁচতে হবে তো। কিন্তু গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে আছেন মোহাম্মদপুর এলাকার বস্তিবাসী, গ্যাসের অভাবে রাস্তার পাশে মাটির চুলায় রান্না করে খাচ্ছেন তারা। একই রকম চিত্র দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায়।
এদিকে গ্যাসের সংকটের কারণে বেড়েছে সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা। ঢাকার মধ্য বাড্ডা এলাকার টি-বাজারে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রেতা কামাল হোসেন বললেন সিলিন্ডার ব্যবসা যে এতটা জমজমাট হবে সেটি দুবছর আগেও ধারণা করতে পারিনি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তার দোকানে সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে তিনগুণ।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিমাসে প্রায় চার হাজার সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করেন। সে এলাকায় পাইপলাইনে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণেই মানুষ এলপিজি গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় লাইনে গ্যাস থাকে না- কিংবা গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকে। ফলে টিম-টিম করে চুলা জ্বলে। যা দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ চলে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ