শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

ফুল ব্যবসায় একমাসে শত কোটি টাকা আয়ের টার্গেট

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ব্যস্ত ফুল চাষিরা

স্টাফ রিপোর্টার : যতদূর চোখ যায়, ফুল আর ফুল। লাল বেগুনী সাদা হলুদ। শুধু রংয়ের ছড়াছড়ি। ফুটে আছে কাঠমালতী, কামিনী, বেলি, জবা, গন্ধরাজ ডালিয়া, গাঁদা, জারবেরা, জিপসিসহ প্রায় ২৫ প্রজাতির নানান রঙের ফুল। বাতাসে ফুলের সুবাস ছড়াচ্ছে চারদিকে। সামনে আছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, তার আগে আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফালগুন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে। দিবস কেন্দ্রিক ফুলের শতকোটি টাকার ব্যবসা হয় শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ফুসরত নেই ফুল ব্যবসায়ীদের।
দেশের ফুলের ব্যবসা জমজমাট যশোরে তার পরেই নারায়ণগঞ্জ এই দুই জেলা থেকে ফুল সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। শুধু নারায়ণগঞ্জে ফুল চাষের সাথে জড়িত রয়েছে ১০ হাজার মানুষ।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ফুল চাষিরা এখন ব্যস্ত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফুলের বাম্পার ফলনে মুখে হাসি ফুটেছে চাষিদের। দামও মিলছে ভালো। এ বছর কোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাঁরা।
বন্দর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদী, দীঘলদী, মাধবপাশাসহ বিভিন্ন এলাকায় দেড় শতাধিক হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করা হয়েছে। এ বছর ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে।
গত শনিবার সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদী, দীঘলদী, মাধবপাশা, আরজাদি, ফেলারদী, আখণলা, মুখ কলদী, শেলসারদী ও বন্দর ইউনিয়নের চৌধুরীবাড়ি, চিনারদী, মোল্লাবাড়ি, কলাবাগ, নবীগঞ্জ, তিনগাঁও এলাকায় জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ করেছেন চাষিরা। ওই এলাকার জমিগুলোতে বিদেশি জারবেরা, গাঁদা, রজনীগন্ধা, জিপসি, চেরি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, হলুদ গাঁদা, গ্লাডিওলাস, চায়না গাঁদা, কাঠমালতী, কামিনী, বেলি, জবা, গন্ধরাজসহ নানান প্রজাতির ফুল ফুটেছে। ফুলচাষিরা জমি ও বাগানে ফুলগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষকেরা জানান, এ বছর ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় ফুলের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। এ ছাড়া ফুলের বাজার চাঙা থাকায় তাঁরা খুশি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০ সালের দিকে কাঠমালতী ও গাঁদা ফুল দিয়ে বন্দর উপজেলার সাবদীতে ফুলের চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে কৃষিজমিতে এই ফুল চাষ সম্প্রসারিত হতে থাকে। এখানকার প্রতিটি বাড়ির সীমানা, সড়কের দুপাশে কাঠমালতীসহ বিভিন্ন ফুলের গাছ লাগানো রয়েছে। ফুল চাষ করে স্থানীয় লোকজন এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।
এদিকে বন্দর উপজেলার সাবদীসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে ফুল দেখতে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর দর্শনার্থী ঘুরতে যান। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা ফুলের বাগানে ঘুরে দেখেন।
মাধবপাশার জারবেরা ফুলচাষি আবদুল বাতেন বলেন, এবার তাঁর বাগানে ৫০ হাজারের বেশি জারবেরা ফুটেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফুল উৎপাদনে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিটি জারবেরা বিক্রি করছেন ৮ থেকে ১০ টাকায়। তাঁর ফুল রাজধানীর শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
দীঘলদী এলাকার ফুলচাষি নকুল চন্দ্র হাওলাদার বলেন, তিনি এবার ৪০ বিঘা জমিতে গ্লাডিওলাস, জিপসি, চেরি, ডালিয়াসহ কয়েক প্রজাতির ফুলের চাষ করেছেন। একই এলাকার চাষি শতরঞ্জন বলেন, গত বছর ৩০ বিঘা জমিতে গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুল চাষ করা হয়েছে। এ বছর ৫০ বিঘা জমিতে গ্লাডিওলাস চাষ করা হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে।
ফুলচাষিরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। ফুলের চাহিদা ও দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। গ্লাডিওলাস প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকা, জারবেরা প্রতিটি ৮ থেকে ১০ টাকা, ডালিয়া প্রতিটি ১০ টাকা, জিপসি ৪০ টাকা আঁটি এবং চেরি ১০০টি ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বন্দর উপজেলা ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল বাতেন বলেন, সাবদী ও আশপাশের এলাকার মানুষ এখন বিভিন্ন ফুল চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফুল চাষের সঙ্গে ৮ থেকে ১০ হাজার লোক জড়িত। সাধারণ যে চাষি তাঁরও ফুল চাষ থেকে বছরে আয় দুই লাখ টাকা। এখানকার উৎপাদিু ফুল ঢাকা, ফেনী, লাকসাম, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এবার ফুলের উৎপাদন ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা খুশি। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এ বছর কোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রি হবে।’
এ বিষয়ে বন্দর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, বিভিন্ন দিবস, উৎসবসহ অনুষ্ঠানে ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন ফুল চাষে আগ্রহ বাড়ছে। ফুল চাষ করে দামও ভালো পান চাষিরা। চাষিদের প্রশিক্ষণ ও নানাভাবে সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে ফুলের রাজধানী যশোরেও ব্যস্ত ফুলচাষিরা। আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ও পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে আর্থিকভাবে লাভবানের আশায় নারী পুরুষেরা মিলে ফুল বাগানে দিন রাত পরিশ্রম করছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে যশোরের ফুল বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। জেলায় ৬৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবার গদখালীর চাষিরা ৬০ কোটি টাকার বেশি ফুলের বিকিকিনি করতে পারবেন বলে চাষিরা প্রত্যাশা করছেন। গত বছরও তারা এই সময়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রি করেছিলেন।
জানা গেছে , বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গোলাপ, গাঁধা, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাসসহ নানা রঙের ফুল। চোখ ধাঁধানো এই সৌন্দর্য কেবল মানুষের হৃদয়ে অনাবিল প্রশান্তিই আনে না, ফুল চাষ সমৃদ্ধিও এনেছে অনেকের জীবনে। ফুলেল স্নিগ্ধতায় এখন ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।
আর বসন্ত, ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনের মন রাঙাতে মুখিয়ে আছেন দেশের কোটি তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সীরা। প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে ফুলই শ্রেষ্ঠ। মানুষের মনের খোরাক মেটাতে এখন দিনরাত পরিশ্রম করছেন যশোরের গদখালীর ফুলচাষিরা।
ফুলকে ফুটতে মানা করছেন তারা। মালির আকুতি, ‘হে গোলাপ তুমি ভালোবাসা দিবসের আগে ফুটিও না’। মালিকের এ আকুতি গোলাপ শুনুক আর নাই শুনুক, ওই দিনের আগে গোলাপ যেন ফুটে ঝরে না যায় সে জন্য ফুটন্ত কুঁড়িতে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরনের বিশেষ ক্যাপ। এতে গোলাপের কুঁড়ি বড় হবে কিন্তু ফুল ফুটে পাঁপড়ি ঝরে পড়বে না। এভাবে একমাস পর্যন্ত গোলাপ গাছেই রাখা সম্ভব বলে জানান চাষিরা। ফলে ‘ফুল ফুটে ঝরে যায় দুনিয়ার রীতি’- এ প্রবাদও এখন আর কার্যকর নয়, ফুলও ফুটছে মানুষের ইচ্ছায়।
চাষিরা গোলাপের কুঁড়িতে পরিয়ে দিয়েছেন সাদা ক্যাপ। ফুল যেন ফোটে দেরি করে। আগামী ১৩, ১৪ ও ২১ ফেব্রুয়ারির বাজার ধরতেই তাদের এই আপ্রাণ চেষ্টা। ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের মোকলেসুর রহমান এবার ২ একর জমিতে গোলাপ ফুলের আবাদ করেছেন। ফুলের ফলন ভালো হয়েছে। ফুলক্ষেতে তিনি ক্যাপ ব্যবহার করছেন। সামনের তিনটি দিবসের বাজার ধরতে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২ দিন আগে ক্ষেতের ক্যাপ খুলে ফেলবেন। এসময় ফুল বাজার উপযোগী হবে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারিও বেসরকারি অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার হওয়ায় তারা ব্যবসায় মার খাচ্ছেনা বলে জানান তিনি।
পানিসারা গ্রামের হারুন অর রশিদ জানান, তিনি ২ বিঘা জমিতে জারবেরার আবাদ করেছেন। নববর্ষে ফুল বিক্রি না হলেও এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চান।
চলতি মাসে রয়েছে বসন্ত দিবস, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আগামী ১৩ ফেরুয়ারি পয়লা ফাল্গুন, বসন্তের প্রথম দিন। পরদিন ভালোবাসা দিবস। এ দুটি দিবসে প্রিয়জনের মন রাঙাতে মুখিয়ে আছে দেশের তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সীরা।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারা ইউনিয়নের বহু চাষি তাদের জমিতে ধান, পাটের চাষ বদলে সারাবছরই ফুল চাষ করছেন। তাদের উৎপাদিত রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুল সারাদেশের মানুষের মন রাঙাচ্ছে। বিশেষ করে বসন্ত দিবস, ভালোবাসা দিবসে এসব ফুলের বিকল্প নেই। আর ২১ ফেরুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও রয়েছে এ ফুলের ব্যাপক চাহিদা। তাই বছরের এ তিনটি দিবসকে ঘিরেই হয় মূল বেচাকেনা।
সারাবছর টুকটাক ফুল বিক্রি হলেও মূলত তিনটি দিবসকে সামনে জোরেশোরে এখানকার চাষিরা ফুল চাষ করে থাকেন। গতবার (২০১৮) এই তিনটি দিবসকে সামনে রেখে চাষিরা ৪০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করেছিল। এবার ফুলের দাম বাড়ার কারণে ৬০ কোটি টাকা বিক্রি ছাড়িয়ে যাবে।
যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপ-পরিচালক জানান, জেলায় ৬৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। দেশে ফুলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগই যশোরের গদখালী থেকে সরবরাহ করা হয়। এখানকার ফুল বিদেশেও রফতানি করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ