বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শ্লীলতাহানি, জেনা-ব্যভিচার ও আমাদের পরিবার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

ড. মো. নূরুল আমিন :  [প্রথম কিস্তি]
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন পল্লী এলাকায় প্রায়ই ওলাওঠা হতো। ওলাওঠা বলা হতো কলেরার মতো মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগকে। বলা হতো এই রোগের কোনো ওষুধ নেই। যে গ্রামে কলেরার প্রকোপ দেখা দিতো সে গ্রামে বাইরের মানুষ যেতো না। বরং সে গ্রাম থেকে মানুষ ভয়ে পালিয়ে যেতো। থানা বা মহকুমাব্যাপি শিক্ষিত এলএমএফ, এমবি বা এমবিবিএস কোনো ডাক্তার পাওয়া মুশকিল ছিল। আবার স্থানীয় ডাক্তার নামে যে অর্ধশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত কবিরাজরা ছিলেন তারাও উপদ্রুত এলাকায় যেতে ভয় পেতেন। ফলাফল ছিল ভয়াবহ। কলেরা রোগ গ্রামের এক প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে আরেক প্রান্তে গিয়ে শেষ হতো এবং এমন বাড়ি পাওয়া খুব মুশকিল ছিল, যে বাড়িতে দু’একজনের লাশ পড়ত না। লাশ দাফনও কষ্টকর ছিল। কেননা, ভয়ে কেউ লাশ দাফন করতে যেতে চাইত না। একই অবস্থা ছিল গুটি বসন্তের। এই রোগটিও ছিল সংক্রামক। কোনো গ্রামে এই রোগের প্রাদুর্ভাব হলে কলেরার মত অবস্থার সৃষ্টি হতো। প্রাণহানি ছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বহুলোক চক্ষু হারিয়ে অন্ধ হতে দেখা গেছে। অনেকে শরীরের সৌন্দর্য্য হারিয়েছেন। বহু সুন্দরী মেয়ে চেহারায় বসন্তের দাগ নিয়ে বিয়ে-শাদীতে সমস্যায় পড়েছেন। গ্রামের এই অসহায় অবস্থায় তখন গ্রামবাসীকে সাহায্য করার জন্য লোকজন যে একেবারেই ছিল না তা নয়। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং সমাজের পঞ্চায়েতদের একটা অংশ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা করেছেন এবং লাশ দাফন করেছেন। চিকিৎসা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মুসলমানরা বাড়িতে বাড়িতে দোয়ার মাহফিল করেছেন। হিন্দুরা মন্দিরে চৌরাস্তায় ও ত্রিমোহনায় দেবতাকে তুষ্ট করার জন্যে ভোগ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশ থেকে কলেরা বসন্ত উৎখাতের জন্য চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন এবং মানুষের দুয়ারে তা পৌঁছে দেয়ার জন্য চেষ্টা অব্যাহত ছিল। কলেরা বসন্তের সাথে ঐ সময় আরেকটি রোগও ছিল। তার নাম ম্যালেরিয়া। এই তিনটি রোগের জন্য Crash Programme-এর ভিত্তিতে সরকারিভাবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যা কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এতে পাওয়া গিয়েছিল। এখন কলেরা বসন্তের প্রকোপ নেই, চিকিৎসা সহজ হয়েছে, হাসপাতাল ও গবেষণাগার বেড়েছে। ম্যালেরিয়া কিছু কিছু পার্বত্য এলাকায় আছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ কোন কোন সিটি ও পৌর এলাকায় এখনো ম্যালেরিয়া ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়নাধীন আছে বলে শোনা যায়। মোদ্দা কথা হচ্ছে, এই সংক্রামক ও জীবাণুবাহী রোগগুলো এখন অনেক কম। কলেরা তার ভয়াবহতা হারিয়ে অনেক কম তীব্রতায় ডাইরিয়ার রূপ নিয়েছে। গুটি বসন্তেরও প্রায় একই অবস্থা।
উপরোক্ত সংক্রামক রোগগুলো কমলেও আরেকটি সংক্রামক ব্যাধি বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে বলে মনে হয়, এ ব্যাধিটি সর্বগ্রাসী, তার ব্যাপকতা ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এতে আমাদের মনুষ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস হবার উপক্রম হয়েছে। ব্যাধিটির নাম ব্যাভিচার, নৈতিক স্খলন তথা ধর্ষণ। এর সংক্রমণে গোটা বাংলাদেশ আজ বিধ্বস্ত। কথায় আছে, Money is lost nothing is lost, health is lost something is lost, character is lost everything is lost. বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ তাদের চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। এতে সভ্য দেশ হিসেবে আমাদের মাথা কাটা যাচ্ছে। ধর্ষণ, ব্যাভিচার এখন বাংলাদেশে এত বেড়েছে যে, তা বিশ্বাস করার মতো নয়। জানুয়ারি মাসের শেষ ১০ দিনের কিছু তথ্য আমি এখানে দিচ্ছি। ২১ জানুয়ারি নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী রংপুরের পীরগঞ্জে স্কুল থেকে ফেরার পথে চতরা ধাপেরহাটের টেম্পোস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি বাড়িতে ৬ দিন পর্যন্ত আটকে রেখে এক স্কুল ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়।
ঢাকা মহানগরীর দীননাথ সেন রোডে দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়।
ফেনীতে চার বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, নোয়াখালীর কবিরহাটে তিন সন্তানের জননী গণধর্ষণের শিকার হয়। যুবলীগ নেতা জাকির গ্রেফতার এবং তার স্বীকারোক্তি।
সাতক্ষীরায় স্বামীকে বেঁধে সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে নির্যাতন ও ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার। একই দিন মানবজমিনে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বরগুনা, মৌলভীবাজার, ফেনীর দাগনভূঁইয়া ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তিন শিশু ও এক তরুণী ধর্ষিত হয়েছে। ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী দিনাজপুরে ২৩ জানুয়ারি একটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সীমা আক্তার নামে সপ্তম শ্রেণির একজন মাদ্রাসা ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এতে তিনজন চৌকিদার এবং ৫ জন বখাটে যুবক জড়িত ছিল। সাতক্ষীরার তালায় সন্তান হত্যার ভয় দেখিয়ে বালিয়াদহ গ্রামে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়েছে। একই দিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এক প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
২৪ জানুয়ারি সিলেটে শিশুকে দিয়ে ইয়াবা বিক্রি ও পতিতাবৃত্তি করানোর অভিযোগে ভুয়া স্ত্রীসহ পুলিশের আর্মড ব্যাটালিয়নের একজন এসআই আটক হয়েছেন। এই দিন গাজীপুরে ধর্ষণের পর এক শিশুকে হত্যার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ২৫ তারিখে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে এক গৃহবধূকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী রাজবাড়ীতে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে দু’টি নাবালিকা মেয়ে।
রাজধানীতে ধর্ষিতা হয়েছে এক স্কুলছাত্রী এবং চট্টগ্রামে প্রাইভেট কারে ধর্ষণ করা হয়েছে একজন ছাত্রীকে। একই দিন ঢাকা থেকে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে কিশোরগঞ্জের এক ইটভাটায় গণধর্ষণ করা হয়। মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি মাসেই ধর্ষিত হয়েছে ৭৯ জন শিশু, তরুণী ও গৃহবধূ। সুবর্ণচরের চার সন্তানের মা, ছয় সন্তানের মা ও গণধর্ষণের শিকার কিশোরীর উল্লেখ এখানে নেই। ধর্ষণ মানেই এখন গণধর্ষণ ও হত্যা-নৃশংসতা।
এই বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের অবস্থাও জানুয়ারি থেকে কম নয়। চলন্ত বাসে, ট্রেনে ধর্ষণের ঘটনা ইতোপূর্বে ভারতে শোনা গেলেও বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি। কিন্তু এখন হরহামেশা হচ্ছে। পার্কে, হোটেল রেস্তোরাঁয়, নাচগানের আসর সর্বত্র এখন জেনা-ব্যাভিচারের ছড়াছড়ি। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা-মসজিদের হুজরা কোনো স্থান এখন বাকি নেই। শিক্ষকরা এক সময় পিতৃতুল্য ছিল এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য রোলমডেল হিসেবে কাজ করতো। এখন তাদেরও পচন ধরেছে। বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে চরিত্রহীনতা। হারাম উপার্জনের সম্ভবত এটাই পরিণতি।
সম্প্রতি জেনা-ব্যাভিচারের দিক থেকে বৃহত্তর নোয়াখালী চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ট্রিপল ঘটনা, খুশিপুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও তার গর্ভবতী হওয়া, সোনাগাজীর একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কর্তৃক আলীম পরীক্ষার্থী নুসরাত নামে এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি ও প্রতিবাদের কারণে আগুনে পুড়ে হত্যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
এই ঘটনার পর দলমত নির্বিশেষে সারাদেশে বিচারের দাবিতে মানববন্ধনসহ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। টেলিভিশন টক শো গুলোতে নতুন করে শ্লীলতাহানি ও নারী নির্যাতন বিরোধী আইন প্রণয়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকে কথাবার্তা বলছেন। অনেকে আবার মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলার দলীয় পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং একটি বিশেষ দলের উপর অপরাধের দায় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। বলা বাহুল্য জবাব সিরাজুদ্দৌলা কোনও এক সময় জামায়াতের সদস্য ছিলেন। জানা যায় তার নৈতিক স্খলন ও দুর্নীতির জন্য দলের ভেতরই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে এবং দলীয়ভাবে তদন্ত করে জামায়াত ২০১৬ সালে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। অপরাধীর বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ দলটির জন্য যথেষ্ট ছিল। তারা জেল দিতে পারতো না, কেননা তাদের জুডিশিয়াল ক্ষমতা ছিল না। জামায়াতের বহিষ্কারা দেশের পরেই সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তিনি জেল খাটেন। পরবর্তীকালে তাকে যারা রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল তারা জামায়াত ছিল না, ক্ষমতাসীন দল ছিল। যাই হোক অপরাধী যে দলেরই হোক সে অপরাধীই। এখন তাকে জামায়াত আখ্যায়িত করলে অথবা আওয়ামী লীগ বললে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই কাম্য। প্রধানমন্ত্রী তার বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কামনা করে এখন আমি মূল আলোচনায় আসতে চাই। আলোচনাটি সংবেদনশীল এবং  লজ্জারও। সচরাচর পারিবারিক পরিবেশে অথবা সামাজিকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে আমরা খোলামেলা আলোচনা করি না। আমাদের সমাজে যৌনতা ও জ্বেনা ব্যভিচার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবার যেভাবে ভাঙ্গছে তাতে উৎকণ্ঠিত না হয়ে পারা যায় না।
যৌনতা ও জ্বিনা ব্যভিচার প্রসঙ্গ : স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, যে বিষয়টি নিয়ে আমি এখন লিখছি সে বিষয়টি শুধু যে স্পর্শকাতর তা নয়; অনেকের কাছে তা একটি নিষিদ্ধ বিষয়ও। যৌনতা সম্পর্কিত বিষয়টির একটি ঐন্দ্রজালিক প্রভাব আছে, এর একটি সার্বজনীন আবেদনও আছে। এর সাথে বাছবিচারহীন যৌন সম্ভোগ, ইতরামি, অসচ্চরিত্রতা, জ্বিনা, ব্যভিচার ধর্ষণ, পরকীয়া, অবৈধ গর্ভ ও গর্ভপাত, মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তি, গর্ভ নিরোধ, এইডস, যৌন রোগ, পারিবারিক বিপর্যয় প্রভৃতির সম্পর্কও রয়েছে।
আমি অবজার্ভার গ্রুপের মালিক মরহুম হামিদুল হক চৌধুরীর একটা উক্তিকে এখানে স্মরণ করছি। পাকিস্তান আমলে প্রায়ই রাজধানীর হোটেলগুলোতে পুলিশ রেইড করতো। খদ্দেরসহ দেহপশারিনীরা গ্রেফতার হতো। অবজার্ভার পূর্বদেশসহ পত্রিকাগুলোতে ছবিসহ খবর ছাপা হতো। তিনি এটা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন যে, এগুলো পুলিশের কারসাজি। তারা পয়সা খেয়ে আসামী ছেড়ে দিত অথবা এমনভাবে মামলা দিত যাতে তারা ছাড়া পেয়ে পূর্বতন পেশা ও পূর্বতন স্থানে ফিরে যেতে পারে। মাঝখানে সমাজ বিরোধী বদমাশরা তাদের যাবার ঠিকানা পেয়ে যেতো। তার কথায় যুক্তি ছিল। এ ব্যবসা এখনো চলছে। গ্রেফতার জামিনের ঘটনারও পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এতে সমস্যা কমেনি বেড়েছে।
সেক্স এখন কোথায় নেই? টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক, পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, বিজ্ঞাপন সর্বত্র সেক্স-এর ছড়াছড়ি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িতে ব্লু ফিল্ম ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ডিস চ্যানেলের নারী-পুরুষের মিলন দৃশ্য স্বাভাবিক ব্যাপার, আলিঙ্গন, চুম্বন, নারী দেহের নগ্ন প্রদর্শনী ছাড়া নাটক নেই, সিনেমা তো কল্পনাই করা যায় না। জিমন্যাস্টিকস এক্রোবেটিকস এর নামে উলঙ্গ নারীর খোলামেলা প্রদর্শনী অহরহ দেখা যাচ্ছে। শহর নগরের প্রতিটি অলি-গলিতে ভিডিও’র দোকানে শুধু পর্নো ছবি নয়; তার সাথে নারীও পাওয়া যাচ্ছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ঘরের স্ত্রী-কন্যারা পার্টটাইম যৌন সঙ্গী হয়ে টু পাইস কামাই করছে। বস্তিগুলোতে বিফ ফ্যাটেনিংএর ন্যায় ব্লু ফ্লিম এর নায়িকা তৈরির জন্য মোটাতাজাকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে নির্বাচিত কিছু সিনেমা হল এবং এমনকি বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পরিচালিত সিনেমা হলগুলোতে তিন শিফট-এ উলঙ্গ ছবির প্রদর্শনী চলে এসেছে। কিশোর যুবক প্রৌঢ় বৃদ্ধরাও লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এগুলো উপভোগ করে এসেছে। পত্রপত্রিকায় সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা কখনো পর্যাপ্ত ছিল না। এ অবস্থায় মাঝে মধ্যে কয়েকজন পথভ্রষ্ট তরুণ তরুণীর গ্রেফতার যে সমস্যার সমাধান করবে তা বিশ্বাস করার মতো যুক্তি আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তবে সময়ে সময়ে অশ্লীলতা নির্মূলের জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তাকে আমি অভিনন্দন জানাই এবং এর সাফল্য কামনা করি। এজন্য এ অভিযানকে সামগ্রিক রূপ দেয়া বাঞ্ছনীয়। প্রচার মাধ্যমের অশ্লীলতা রোধ করতে না পারলে এ উদ্যোগ সফল হতে পারে না।
তেমনি গার্মেন্টস কিংবা বস্তির সুন্দরী মেয়েটির পেছনে পুলিশের যে লম্পট সদস্যটিকে নেংটি কুকুরের মতো ঘুরঘুর করতে দেখা যায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। এর পাশাপাশি জ্বিনা ব্যভিচার রোধকল্পে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে উজ্জীবিত করাও অপরিহার্য বলে আমি মনে করি। জ্বিনা ব্যভিচারের বিষয়টি অনেকের কাছেই স্বচ্ছ নয়, বিশেষ করে যুব-সমাজকে এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেয়া জরুরি বলে মনে হয়। তাদের বুঝতে হবে যে, বৈধভাবে বিবাহিত দম্পতি নয় এমন ব্যক্তিদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের নাম হচ্ছে ব্যভিচার এবং এর ধরন দু’রকম।
বিবাহিত ও অবিবাহিত ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক।
বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা পরনারীর মধ্যে সম্পর্ক।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই উভয় প্রকারের সম্পর্কই হারাম। এটা মানুষের রুচি ও মূল্যবোধ পরিপন্থী। কেননা, কোনও মানুষ তার মা, স্ত্রী, কন্যা অথবা বোনকে ব্যভিচারী হিসেবে সহ্য করতে পারে না। পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সংহতির জন্যও ব্যভিচার মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক একটি পবিত্রতম সম্পর্ক। যদি কোনও স্বামী বা স্ত্রী এই সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অন্য কারোর সাথে গোপন অভিসারে লিপ্ত হয় এবং যৌনাচারে জড়িয়ে পড়ে তাহলে যে আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা ভেঙ্গে পড়ে। অপরাধী ব্যক্তি যৌন রোগে আক্রান্ত হয়ে নিরপরাধ ব্যক্তির মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে মেয়েরাই সাধারণত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনাচার ও বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে পরিবারে যখন কলহবিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে পড়ে তখন স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে এক ছাদের নিচে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। ছেলেমেয়ে থাকলে তারা উচ্ছন্নে যেতে থাকে। স্ত্রীর পক্ষে তখন দুটি পথ খোলা থাকে। এক তার সন্তানের পিতা কী করছে তা উপেক্ষা করা এবং ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসারে কোনো রকমে টিকে থাকা অথবা তালাক নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়া এবং প্রতিবেশী ও ভাবীদের গঞ্জনার মধ্যে মৃত্যুর অপেক্ষা করা। যাদের নিজস্ব কোনও আয় উপার্জন নেই, সন্তান নিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে বেঁচে থাকা তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তাদের দুর্দশা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।­ [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ