শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

ধানের শীষে কোনো ভোটই পড়েনি প্রায় ৯০০ কেন্দ্রে

সরদার আবদুর রহমান : গত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক যে ফলাফল নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেছে তাতে অনেক ‘অস্বাভাবিক’ অবস্থা ও অসঙ্গতির মধ্যে অন্যতম হলো প্রায় ৯০০টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোটই পড়েনি। এর বিপরীতে নৌকায় পড়েছে তিন থেকে চার অংকের (ডিজিট) ভোট। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, কোনো কেন্দ্রে বিশেষ প্রতীকের ব্যালটে কোনো ভোট না পড়ায় তাদের কিছুই করার নেই।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্টসিটের তথ্যে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তার জোটের ধানের শীষ প্রতীকে ৮৮৯ কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। বিএনপিসহ ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ২৮২ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১০৮টি আসনের ৮৮৯টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা একটি ভোটও পাননি। এ ছাড়া অনেক কেন্দ্রে মাত্র ১টি ভোট পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সাধারণত যে সকল কেন্দ্রে বরাবর প্রধান দুই প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়ে থাকে সেসকল কেন্দ্রে দেখা যায় নৌকার ভোট যেখানে ৪ ডিজিট অতিক্রম করেছে সেখানে ধানের শীষ শূন্য থেকে শুরু করে ডাবল ডিজিট অতিক্রম করতে পারেনি।
কিছু নমুনা : দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গোপালগঞ্জ-১ আসনের ১৩৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৫টিতে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোটই পড়েনি। বাকি ৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪টি কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট পড়েছে মাত্র ১টি করে। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষের শূন্য ভোটের বিপরীতে নৌকার ভোটের পরিমাণ ৩৯০০ থেকে ১০০০ পর্যন্ত। এখানে সর্বোচ্চ ৯৮ ভাগেরও বেশি ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয়েছে। প্রায় একই অবস্থা গোপালগঞ্জ-২ ও ৩ আসনে। গোপালগঞ্জ-২ আসনে ১৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৬ কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোট পড়েনি। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষের বিপরীতে নৌকার ভোট প্রাপ্তি তিন ডিজিট থেকে চার ডিজিট পর্যন্ত। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের ১০৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৯ কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট একেবারে শূন্য। বিপরীতে নৌকার ভোট ১০০০ থেকে ৩৮০০ পর্যন্ত। এই আসনে ভোট কাস্টের হার ৯৯.৬২ ভাগ পর্যন্ত পৌছেছে। এ ছাড়া রাজবাড়ী-২ আসনের ২৯ কেন্দ্রে, ফরিদপুর-১ আসনের ২৯ কেন্দ্রে, মাদারীপুর-১ আসনের ৪৭ কেন্দ্রে, মাদারীপুর-২ আসনের ৩৫ কেন্দ্রে, মাদারীপুর-৩ আসনের ৪০ কেন্দ্রে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের ৪৯ কেন্দ্রে, কুমিল্লা-১১ আসনের ৩০ কেন্দ্রে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনের ৮৫ কেন্দ্রে, নড়াইল-২ আসনের ১৯ কেন্দ্রে, বাগেরহাট-১ আসনে ১২ ও বাগেরহাট-২ ও ৪ আসনে ১৩টি করে কেন্দ্রে, বরিশাল-১ আসনে ২৬ কেন্দ্রে, পিরোজপুর-১ আসনে ১২ কেন্দ্রে এবং শেরপুর-১ আসনের ১৭  কেন্দ্রে একটি ভোটও পাননি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। চট্টগ্রাম-১ আসনে দেখা যায়, নৌকা প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির সংখ্যা কোন কোন কেন্দ্রে যেখানে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে সেখানে ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোট শুন্য থেকে বড়জোর দেড়শ’ পর্যন্ত। চট্টগ্রাম-১৩ আসনেও অনুরূপ দেখা যায়, নৌকা প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির সংখ্যা কোন কোন কেন্দ্রে যেখানে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে সেখানে ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোট শুন্য থেকে বড়জোর আড়াইশো পর্যন্ত।
অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর-৬ আসনে ৭০ ভাগ থেকে ৯৪ ভাগ পর্যন্ত ভোট কাস্ট দেখানো হলেও এখানে সকল কেন্দ্রেই ধানের শীষের ভোট সিঙ্গেল থেকে ডাবল ডিজিটে সীমিত থেকেছে। বিপরীতে নৌকার ভোট কোনটিতেই ৪ ডিজিটের নিচে নামেনি। ঠাকুরগাঁও-২ আসনে দেখা যায়, কোন কোন কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক যেখানে পেয়েছে ৩৪৬৩ ও  ২২৩৫ ভোট সেখানে ধানের শীষের ভোট একেবারে শূন্য। এই আসনে ধানের শীষের ভোট যেখানে সিঙ্গেল থেকে ২ ডিজিট অতিক্রম করতে পারেনি সেখানে নৌকার ভোট ৪ ডিজিটের নিচে নামেনি। কোন কোন কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট ২, ৩, ৫, ৬, ১২, ১৪, ২২, ২৪-এই সংখ্যায়। যদিও এই আসনে ভোট প্রদানের হার ৯৭ ভাগ পর্যন্ত দেখা গেছে। লালমনিরহাট-১ আসনে দেখা যায়, একটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে যথাক্রমে ২৬০৯ ও ১৯৪৩ ভোট, সেখানে ধানের শীষের ভোট একেবারে শূন্য। এই আসনের ২৪টি কেন্দ্রে ধানের শীষের কোন ভোট নেই। এর অন্যান্য কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে ৪ ডিজিটের নিচে নামেনি সেখানে ধানের শীষের ভোট সিঙ্গেল ও ডাবল ডিজিট অতিক্রম করতে পারেনি। এখানে সর্বোচ্চ ৯৬ ভাগ পর্যন্ত ভোট কাস্ট দেখানো হয়েছে। রাজশাহী-৫ আসনে দেখা যায়, একটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে ২৪৯০, সেখানে ধানের শীষের ভোট মাত্র ৩টি। অপর একটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট ১৬০০, আর ধানের শীষের ভোট মাত্র ৯টি। এভাবে এই আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে ৪ ডিজিট বনাম সিঙ্গেল-ডাবল ডিজিটের লড়াই হতে দেখা যায়।
দেশের মধ্যাঞ্চলের হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা-৩ আসনের একটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে ৩৩৮২, সেখানে ধানের শীষের ভোট মাত্র ৫টি। এভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে ১৪০০ থেকে প্রায় ৪০০০ পর্যন্ত, সেখানে ধানের শীষের ভোট মাত্র ১০, ১১, ১৭, ১৮টি। হাতেগোনা কয়েকটি কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট ৩০০ থেকে ৪০০টি দেখা যায়। ফেনী-২ আসনে দেখা যায়, নৌকার ভোট প্রাপ্তি ২০০০ থেকে ৩০০০ ছাড়িয়ে গেলেও ধানের শীষের ভোট শূন্য থেকে দুই ডিজিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ১১২টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১২টিতে ৩ ডিজিটের ভোট পাওয়া গেলো। একটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট যেখানে ২৬৩৫, সেখানে ধানের শীষের ভোট শূন্য।
আকস্মিক উল্লম্ফন : পূর্বাঞ্চলের তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা-৬ আসনে নৌকা প্রতীকের পরিবর্তে জাপার লাঙ্গল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এখানে অধিকাংশ কেন্দ্রে লাঙ্গল ও ধানের শীষ প্রতীকের মধ্যে ভোট প্রাপ্তির হার তিন ডিজিটে প্রায় সমতালে এগোলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে এই হার অস্বাভাবিক উঠানামা করেছে। যেমন একটি কেন্দ্রে লাঙ্গলের ভোট হঠাৎ করেই লাফ দিয়ে ১৪০১ হয়েছে। আর বিপরীতে ধানের শীষের ভোট নেমে দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে। অপর একটিতে লাঙ্গলের ভোট যেখানে ১৭৬৬, সেখানে ধানের শীষের ভোট মাত্র ৪৬টি। এভাবে লাঙ্গলের ভোট চার ডিজিটে উল্লম্ফন ঘটলেও ধানের শীষের ভোট দুই ডিজিটে নেমে গেছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, যে সকল কেন্দ্রে নৌকা বিজয়ী হয়েছে সেগুলোর হাতে গোনা কিছু কেন্দ্র ছাড়া কোনটিতেই ধানের শীষ বেশি ভোট পায়নি। অর্থাৎ পরাজিতরা শতকরা ৯৯টি কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন বলে ধরে নেয়া যায়। সিলেটের আসনগুলোতেও অনুরূপভাবে কিছু কিছু কেন্দ্রে নৌকা ও ধানের শীষের ভোট প্রাপ্তিতে ভারসাম্য থাকলেও আকস্মিকভাবে কিছু কেন্দ্রে নৌকার ভোট প্রাপ্তিতে বিপুল উল্লম্ফন ঘটে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ