ঢাকা, রোববার 31 May 2020, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৭ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

‌'মশা নিধনে বছরব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ না করলে সামনে দুরবস্থা আরো বাড়বে'

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: এখন থেকে এডিস মশা নিধনে বছরব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ না করলে আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গু ব্যাপক হারে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পৃথকভাবে পরীক্ষায় জানা গেছে, এবার ডেঙ্গু টাইপ-৩ আক্রান্তের হার সর্বাধিক।এতদিন বাংলাদেশে ডেঙ্গু সেরোটাইপ-১ ও সেরোটাইপ-২-এর প্রকোপ বেশি ছিল। প্রথমটি সাধারণ ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু। দ্বিতীয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) ডেঙ্গু। সাধারণত ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু রোগী দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হেমোরেজিক ডেঙ্গু দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের ভেতর বা বাইরে রক্তক্ষরণ হয়। গত বছর থেকে ডেঙ্গুর টাইপ-৩ আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। তবে এ বছর সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে রোগীদের ইন্টারনাল রক্তক্ষরণের পাশাপাশি শক সিনড্রোম দেখা দেয়। 

ডেঙ্গুর টাইপ-৩ অর্থাৎ শক সিনড্রোমের উপসর্গ হলো শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের ওপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। শরীরের পানিশূন্যতার কারণে রোগীর অচেতন হয়ে পড়া।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদা সাবরিনা ফ্লোরা ইত্তেফাককে জানান, ডেঙ্গুতে এবার ৪০ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় দেখা যায়, টাইপ-৩-এ আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৭ জনের আগে একবার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হন। ছয় জন হেমোরোজিকে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ঐ বছর ডেঙ্গুর টাইপ-১, টাইট-২, টাইপ-৩ ও টাইপ-৪ পাওয়া যায়। ২০০২ সালে টাইপ-১, টাইপ-২ ও টাইপ-৩ বেশি ছিল। ২০১৬ সালে টাইপ-১ ও টাইপ-২-এ আক্রান্ত বেশি ছিল। টাইপ-৩ কম ছিল। ২০১৭ সালেও টাইপ ৩ কম ছিল। ২০১৮ সালে টাইপ-৩ বেশি ছিল এবং ২০১৯ সালে টাইপ-৩ সর্বাধিক। অন্যগুলো একেবারেই কম। অধ্যাপক ডা. মীরজাদা সাবরিনা ফ্লোরা বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে নিজস্ব কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। জ্বর নিয়ে গবেষণা চলছে। এজন্য একটি প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সি জানান, এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ৭২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা দেছে, এবার টাইপ-১, টাইপ-২, টাইপ-৩ ও টাইপ-৪ এ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ডেঙ্গু টাইপ-৩-এ আক্রান্ত বেশি। এর আগে ২০০০ সালে পরীক্ষা করে চার ধরনের ডেঙ্গু ধরা পড়েছিল। ২০১৩-২০১৬ সালে ভাইরোলজি বিভাগে পরীক্ষা করে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পায়। তিনি বলেন, দ্বিতীয়বার যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এছাড়া ডায়াবেটিকস, কিডনি, লিভার আক্রান্তদের ডেঙ্গু জ্বর হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। তিনি বলেন, এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৮ হাজার রোগীর রক্ত পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ ভাগের ডেঙ্গু হয়েছে। তিনি বলেন, এডিস মশা নিধন কার্যক্রম শুধু মৌসুমভিত্তিক হলে হবে না। বছরব্যাপী এডিস মশা নিধন কার্যক্রম না চালালে আগামী বছর আরো ব্যাপক হারে ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে।

অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সি বলেন, মশাবাহিত রোগ জিকা ভাইরাস ও ইয়েলো ফিভারও রয়েছে। যদিও এগুলো এদেশে এখনো পাওয়া যায়নি। একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরেরও অস্তিত্ব ছিল না। ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু জ্বর শুরু হয়েছে। প্রাণঘাতী জিকা ভাইরাস ও ইয়েলো ফিভার এদেশে হবে না, এ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। এগুলো ছড়িয়ে পড়লে অবস্থা হবে ভয়াবহ। তার পরও এ জাতীয় মশা দেশে চলে আসতে পারে। তাই মশা নিধন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রসঙ্গত, বারডেম হাসপাতাল ২০০২ সালে পরীক্ষা করে টাইপ-১, টাইপ-২ ও টাইপ-৩ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিহ্নিত করেছিল।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে এডিস মশা নিধনের বিকল্প নেই। এখন থেকে বছরব্যাপী এডিস মশা নিধন কার্যক্রম না চালালে আগামী বছর ব্যাপক হারে ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে। তখন স্বাস্থ্য বিভাগের তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এখন ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি না থাকলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বাড়তে পারে। তাই এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ