শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ছাত্রলীগের নৃশংসতার শেষ কোথায়?

মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন : আর কতকাল পত্রিকার শিরোনামে ছাত্রলীগের জায়গা নির্দিষ্ট থাকবে? পত্রিকার শিরোনাম যদি ইতিবাচক হতো তাহলে কষ্ট পেতাম না বরং খুশি হতাম। কারণ ছাত্ররাজনীতির নামে গুন্ডামি আমাদের অতীত ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসকে ম্লান করে দেয়। শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির স্লোগান ছাত্রলীগের মূলনীতি হলেও তারা নৈরাজ্যে জড়িয়ে পড়েছে, যা মোটেও সুখকর নয়। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের একটি সোনালি অতীত ছিল। কিন্তু আজ আমরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নিকট থেকে সেরকম কোন কিছুই পাচ্ছি না। ছাত্রলীগের এ অধঃপতন আজকের তা কিন্তু নয়! ছাত্রলীগের অধঃপতন শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল থেকেই যাত্রা শুরু করেছে। তাদের অপর্কমে বিরক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন ছাত্রলীগ পচে গেছে গলে গেছে তাদের দিয়ে কিছু হবার নয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী তাদের কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়ে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তারপরও ছাত্রলীগকে কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না। একটির রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি নারকীয় ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা আছে যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;। কিন্তু দেশের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে মৌলিক মানবাধিকারের ন্যূনতম অধিকারটুকু নাগরিকদের নেই। যার নজির আমরা বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম।
বাড়িতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ব্যত্যয় হচ্ছিল তাই ছুটি শেষ হওয়ার আগেই প্রিয় ক্যাম্পাস বুয়েটে ফিরে এসেছিলেন আবরার। কিন্তু ওই রাতেই তাঁকে এমন নৃশংসভাবে প্রাণ হারাতে হবে তা তিনিও হয়তো ভাবতে পারেননি। কিছুতেই থামছে না ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ। চাঁদাবাজি আর নির্মাণ কাজ থেকে কমিশন দাবিসহ নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংগঠনটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাদ দেওয়া হয়েছে। ক্যাসিনো, জুয়া ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দায় যুবলীগ, কৃষক লীগসহ অন্য সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে যখন শুদ্ধি অভিযান চলছে ঠিক সে সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যায় যে, ছাত্রলীগ আবরার ফাহাদকে শিবির সন্দেহে ধরেছিল এবং তার ফেসবুক এ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল চেক করেছিল। অর্থাৎ তারা মনে করেছিল শিবির হলেই ধরা যায় এমনকি মারা যায়। তারা তাই সাধারণত করে থাকে। কিন্তু এইক্ষেত্রে বেশি মারার কারণে আবরার মারা যায় এবং সিসি টিভি ফুটেজ থাকায় ঘটনাটি তারা ধামাচাপা দিতে পারেনি। অথচ ওবায়দুল কাদের বলেছেন ভিন্ন মতের হলেই কাউকে হত্যা করা যায় না। আমাদের সংবিধানেও ধর্মে হত্যা নিষিদ্ধ। কোন ধর্মেই বিচার ব্যতীত হত্যা করা বৈধ নয়। একটা সময় মানুষ মানুষকে বলতো তুই মানুষ নাকি আওয়ামী লীগ? এখন তেমনটা শোনা না গেলেও আওয়ামী লীগের চরিত্র জাতির সামনে দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। ছাত্রলীগ যুবলীগ যা করছে তার দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের। কারণ তারাই এই অঙ্গ সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে বিপুল অবৈধ অর্থ (যার পরিমাণ হয়তো কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং যার বেশির ভাগ বিদেশে পাচার হয়েছে) ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকেরা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও জুয়ার মাধ্যমে করেছে তার দায়িত্ব আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগের উচিত এই দুটি সংগঠনেও শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে অপরাধী ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদক ও পুলিশকে বলা। আসলে এই সব সংগঠনকে তাদের এই সব অনিয়মের জন্য অবৈধ ঘোষণা করা উচিত। কিন্তু আমি তা বলছি না। যেহেতু গণতন্ত্রে কোন সংগঠনকে অবৈধ করা যায় না। কিন্তু এদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বজিতের নৃশংস হত্যার কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এবার মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যা করে আবারও শিরোনামে এসেছে ছাত্রলীগ।
ভালো কাজের জন্য ছাত্রলীগ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে এমন নজির খুঁজে পাওয়া মেলা ভার। অথচ ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের একটি ইতিহাস ছিল।
আবরারের অপরাধ জঘন্য কিছু ছিল তাও কিন্তু নয়! তার অপরাধ হচ্ছে সে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দিয়েছিল। আর এ কারণেই ছাত্রলীগ বুয়েট শেরেবাংলা হল শাখার কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেকাকর্মী আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত ৮ টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। আবরারের ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরা হল-
১. ৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দেবো।
৩. কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেবো। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন- পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও, তার মত সুখ কোথাও কি আছে, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’ ৫ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে এই স্ট্যাটাসটি দেন আবরার। (সূত্র- দৈনিক নয়াদিগন্ত ৮.১০.২০১৯)
মত প্রকাশের কারণে একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে মেরে ফেলা সত্যিই খুবই বেদনাদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে আর কী বাকি থাকল? ক্ষমতার দম্ভে আওয়ামী লীগ এখন বিভোর। যে কারণে দলের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। উন্নয়নের শ্লোগান দিয়ে কি আবরারের মা-বাবাকে সান্ত¦না দেয়া যাবে? নিশ্চয় না। কারণ আবরার মা-বাবা কলিজার টুকরা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিল মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্যে। কিন্তু লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসবে তা আবরার মা-বা চায়নি। এই দায় ক্ষমতাসীন সরকার এড়াতে পারে না। নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার চিত্রই বলে দেয় ছাত্রলীগ কতটা বেপোরোয়া। ২০১০ সালে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবুবকর সিদ্দিক নিহত হন। একই বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান জাবির শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নারকীয় নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম জড়িয়ে আছে। প্রথম আলোর ভাষ্যমতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে ৩৯ জন নিহত হন। আর এই সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন (সূত্র প্রথম আলো, ৮.১০.১৯)। ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদ আবুল কালাম আসাদ ওরফে রাজীবকে হত্যা করে লাশ বহুতল ভবন থেকে ফেলে দেয়া হয়। ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে নিজ সংগঠনের কর্মীরাই মারধর করে ভবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করেন। ১০১২ সালে ছাত্রলীগ নেতাদের চাপাতির কোপে প্রাণ হারান পুরান ঢাকার দরজি বিশ্বজিৎ দাস। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর সিলেটের শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান সুমন চন্দ্র দাস। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কাজে ছাত্রলীগকে পাওয়া না গেলেও বারবার তাঁদের ন্যায্য আন্দোলনে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের মতো আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করার অসংখ্য অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে।
দেশের সবোর্চ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে ছাত্রলীগ কখনো দলীয় কোন্দলে কখনো ভিন্নমতের অনুসারীদের হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ আঙ্গিনা রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেছে না। দেশের সব প্রতিষ্ঠানেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির ভাগাভাগি নিয়ে অস্থিরতা বেড়েই চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকেরাও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কোথাও যেন এতটুকু শিক্ষার পরিবেশ নেই যেখানে নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী বলতে পারে আমরা ভালো আছি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছে ছাত্র-লীগ মানেই ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস,ছাত্র-লীগ মানেই হত্যার রাজনীতি। সরকারের ছত্রছায় ছাত্রলীগ আজ ভয়ানক দানবে পরিণত হয়েছে। ছাত্র-লীগের টুঁটি চেপে ধরা উচিত। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ছাত্রলীগ যখন দুঃস্বপ্নে চলে তখন তাদের কাছ থেকে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজি ব্যতীত আর কি আশা করা যায়! আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বারবার বলেছেন,সরকারের সব সাফল্য ভেস্তে যায় যখন অপকর্মের জন্য ছাত্রলীগ খবরে শিরোনাম হয়। ছাত্রলীগের এই অপতৎপরতা এখনই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সরকার নিশ্চিত করবে, এমনটিই সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ