শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

৯ মাসে শেয়ারের বাজারমূল্য কমেছে  প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা

 

স্টাফ রিপোর্টার: গত ৯ মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক কমেছে এক হাজার পয়েন্ট। একই সময়ে বাজার মূলধন বা শেয়ারের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও বিএসইসি শেয়ার বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। মূলত শেয়ারবাজার কিছু লোকের হাতে এখন জিম্মি। এই জিম্মি দশা থেকে উত্তরণে বিএসইসি ভেঙে দিতে হবে। তবে শুধু বিএসইসি ভেঙে দিলেই হবে না, এখানে শক্ত লোককে নিয়োগ দিতে হবে। যারা কোনোভাবেই শেয়ারবাজারে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না।

বাজার পতনের কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন দেশের শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারবাজারের গতি ফেরাতে একের পর এক সুবিধা দিয়েও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই কমছে শেয়ারের দাম। সেই সঙ্গে কমছে সূচক ও লেনদেনও। প্রতিনিয়ত দরপতনের কবলে পড়ে পুঁজি হারাচ্ছেন ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা। আগের দুই সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাতেও শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। চলতি সপ্তাহেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত বুধবার ঢাকায় প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১৮ পয়েন্ট। লেনদেন কমে ২০০ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছে। যদিও ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তিন হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হতো। বুধবার ডিএসইতে ২৭১ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। গত ৯ মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক কমেছে এক হাজার পয়েন্ট। একই সময়ে বাজার মূলধন বা শেয়ারের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।

বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরাও মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার কারণে শেয়ারবাজারের গতি ফিরছে না।

শেয়ারবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলেন, বিএসইসিকে ভেঙে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। এটাকে চেঞ্জ করতে হবে। এরইমধ্যে বিএসইসি টোটালি ফেল করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, যখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়, তখনই বাজারে বিপর্যয় ঘটে।  

ইব্রাহিম খালেদ বলেন, একটি খারাপ খবর শোনা যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও বিএসইসি শেয়ার বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। কাজেই বিএসইসিকে ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে সরকার যদি বড় কোনও পদক্ষেপ নেয়, তাহলেই বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, মূলত শেয়ারবাজার কিছু লোকের হাতে এখন জিম্মি। এই জিম্মি দশা থেকে উত্তরণে বিএসইসি ভেঙে দেওয়াই একমাত্র পথ। তবে শুধু বিএসইসি ভেঙে দিলেই হবে না, এখানে শক্ত লোককে নিয়োগ দিতে হবে। যারা কোনোভাবেই শেয়ারবাজারে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না।

এদিকে পুঁজিবাজারের চলমান মন্দা অবস্থায় একদিকে বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে দুর্দিন নেমে এসেছে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে। খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বেশির ভাগ ব্রোকারেজ হাউস। ফলে চাকরি হারানোর আতরঙ্ক রয়েছেন ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

প্রসঙ্গত, লেনদেন থেকে পাওয়া কমিশনের ওপর ভর করেই মূলত ব্রোকারেজ হাউসগুলো চলে। কিন্তু পুঁজিবাজারের চলমান মন্দায় লেনদেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে লেনদেন থেকে পাওয়া কমিশন কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে বেশির ভাগ ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে।

এদিকে অব্যাহত দরপতনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগের দাবিতে ফের আন্দোলনে নেমেছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। পতনের ধারা অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে ডিএসই’র সামনে বিক্ষোভ হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান দাবি বিএসইসি’র চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনের পদত্যাগ। কারণ, তাকে  বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রেখে শেয়ারবাজার ভালো করা যাবে না। 

ডিএসইর প্রধান সূচকটি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল গত ২৪ জানুয়ারি। ওই দিন সূচক ছিল ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে ও বাজার মূলধন ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।  বুধবার (২৩ অক্টোবর)  সেই সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭২৬ পয়েন্টে।  আর বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বিএসইসির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলেই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। এই মুহূর্তে বাজারকে স্বাভাবিক করতে হলে বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ একমাত্র ওষুধ। বাজার এতটাই খারাপ হয়েছে যে, প্রায় ৫০টি কোম্পানির শেয়ারদর এখন ফেসভ্যালুরও নিচে নেমে গেছে। শেয়াবাজার খাতে এমন গুঞ্জন প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে, বিএসইসির চেয়ারম্যান যেকোনও সময় পদত্যাগ করতে পারেন। এর আগে গত সপ্তাহে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, বিএসইসির চেয়ারম্যান বদল হচ্ছে। আর এই গুজবে গত মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) বাজারে সূচকের বড় উত্থান ঘটে। বিনিয়োগকারীদের অনেকে গুজবকে সত্য ধরে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকতে হবে। তা না হলে এই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। তবে বাজার ঠিক করতে হলে হয় বিপুল অংকের টাকা দিতে হবে। অথবা পতনের সুযোগ দিতে হবে। নিচের দিকে নামতে নামতে একসময় গিয়ে আর নিচে নামবে না। সেখান থেকে এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।

জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল শেয়ারবাজারের উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বাজারের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে নগদ অর্থ জোগান দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। আইনি সীমার মধ্যে থেকে যেসব ব্যাংকের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, তাদের রেপোর বিপরীতে নগদ অর্থ সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া এই সুবিধা নিতে এ পর্যন্ত খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। তবে বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক বিনিয়োগের জন্য রেপোর বিপরীতে ৫০ কোটি টাকা নিয়েছে। এর বাইরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য সোনালী ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা দিয়েছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবিকে। আইসিবি ওই টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছে। তবে এতে বাজারের কোনও উন্নতি হচ্ছে না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ