বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪
Online Edition

গাজীপুর সিটির নতুন মেয়র জায়েদা খাতুন

সামছুল আরেফীন, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, মো. রেজাউল বারী বাবুল, গাযী খলিলুর রহমান: গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন। এর মধ্য দিয়ে প্রথম নারী মেয়র পেল গাজীপুরবাসী। নানা নাটকীয়তার পর শেষ হাসি এখন জাহাঙ্গীর ও তার মায়ের মুখে। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৩০ মিনিটে ৪৮০ কেন্দ্রের ফল ঘোষণার শেষে তাকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম এ ঘোষণা দেন। নতুন মেয়র টেবিল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী জায়েদা খাতুন পেয়েছেন ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আজমত উল্লাকে ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটে হারিয়েছেন। আজমত উল্লা খান পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট। 

ফল ঘোষণার পরপরই বিজয় উল্লাসে মেতে উঠে গাজীপুরবাসী। রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের বাইরে ও বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল বের করতে দেখা যায় জায়েদার সমর্থকদের।

এর আগে সকাল ৮টা থেকে গাজীপুর সিটির ৪৮০টি কেন্দ্রে একযোগে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ শুরু হয়। যা একটানা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এরপর শুরু হয় ভোট গণনা। সন্ধ্যায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল প্রকাশে দেরি করছেন বলে অভিযোগ করেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের ছেলে ও সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। তিনি নগরীর বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ অভিযোগ করেন।  

দিনভর ভোটের চিত্র : গাজীপুর সিটি করপোরেশনে নিষ্প্রাণ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে তেমন স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায় নি।  দু’একটি ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।  বুধবার রাতে মার্কিন ঘোষণার পর শুরু হওয়া গাজীপুরের নির্বাচনের চিত্র কিছুটা অন্য রকম দেখা যায়। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশাসনের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। অনেকে বলছেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দিলে ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র বুধবার রাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকনের এমন ঘোষণার কারণেই প্রশাসনের  মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দিনভর তৎপর ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। তবে বিগত কয়েক বছরে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের মধ্যে যেরকম অনাগ্রহ ছিল সেটা এখানেও দেখা গেছে। নির্বাচনে  দুই ধরনের দৃশ্যই দেখা গেছে। কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোটারদের ভিড় ছিল, আবার কোথাও কোথাও উপস্থিতি ছিল কম। ইভিএমের কারণে ভোটগ্রহণ ধীরগতিতে হয়েছে। অনেকের আঙুলে ছাপ না মেলায় ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। অনেকে আবার ইভিএমে নতুন অভিজ্ঞতার কারণে সমস্যায় পড়েন। 

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই নগরীর এটি তৃতীয় নির্বাচন। এবার পুরো ভোট ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ কিংবা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪৮০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে। এ নির্বাচনে ৩৩৪ জন প্রার্থী ভোট যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে মেয়র পদে ৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৪৬ জন ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৭৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় নির্বাচনে লড়ছেন ৩৩৩ জন প্রার্থী। সিটির ৫৭টি ওয়ার্ডে এই নগরের এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৭ জন, নারী ভোটার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৮ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার আছে ১৮ জন।

গতকাল সকালে টঙ্গী দারুসসালাম মাদ্রাসাকেন্দ্রে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান বলেন, গাজীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এবং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেকে অপপ্রচার চালিয়েছিল যে, মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসবে না। কিন্তু সকাল থেকে শত শত মানুষ ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য। ইনশাআল্লাহ নৌকারই জয় হবে। একটি দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন গড়ার যে প্রত্যয় জনগণের, নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে তারা নিজেই জয়ী হবে।  

অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাজীপুরে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু ও সুন্দর আছে। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখব। আমাদের ভোট যেন সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সুষ্ঠু সুন্দরভাবে হয়। কোনো জায়গায় যেন ইভিএমের মেশিন টেম্পারিং করা না হয়। নির্বাচন কমিশন ও সরকার সুষ্ঠু ভোট করার ব্যাপারে যে ঘোষণা দিয়েছে, আমরা সেটি শেষ পর্যন্ত দেখব। আমরা ভোটের মাঠে আছি। আমরা সর্বশেষ গণনা পর্যন্ত দেখব কারচুপি আছে কিনা।

সরেজমিন দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে অনেকটা ভোটারহীন পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সব প্রার্থীই ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। বিশেষ করে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের নৌকা ও ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার এজেন্ট ছাড়া অন্য কোনো এজেন্টকে থাকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় অনেক ভোটকেন্দ্র ফাঁকা দেখা যায়। কেন্দ্রগুলোর বাইরে প্রার্থীদের সমর্থকদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বেলা ২টার দিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তত ৬০টি কেন্দ্রে ১০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে ইভিএম যথাযথভাবে কাজ না করার খবর পাওয়া গেছে।  এতে ভোট গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।  জায়েদা খাতুনের ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইভিএম টেম্পারিং ও কোনো ধরনের কারচুপি হলে গাজীপুরের বাসিন্দাসহ দেশবাসী ফলাফল মেনে নেবে না। 

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সালনার নাগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রের প্রবেশমুখে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় একজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়। তবে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অব্যাহত ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাটিম প্রতীকের কাউন্সিলর প্রার্থী সাইফুল ইসলাম এবং করাত প্রতীকের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. শাহীন আলমের সমর্থকদের মধ্যে এই ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুই কাউন্সিলরই আওয়ামী লীগপন্থী বলে জানা গেছে। নাগা মোক্তারবাড়ি গ্রামের কবীর আহমেদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ইভিএমের বোতাম চাপ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। বেলা একটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ওই কেন্দ্রের প্রবেশমুখে দুপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া দিতে দেখা যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ধাওয়ার সময় এক ব্যক্তি আহত হন। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় ওই ব্যক্তি পড়ে যান। এতে তিনি সামান্য আঘাত পান। এছাড়া কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের সামনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আজমত ভূইয়া ও জাহিদ হোসেন সমর্থিতদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিকেল পৌনে চারটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই নম্বর ওয়ার্ডের লোহা আলী সরকারের প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রের বিভিন্ন গোপন বুথে ভোটারদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা প্রবেশ করেছেন। তাদের ভোটদানে প্রভাবিত করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলিং অফিসার সোহরাব আলি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা কয়েকজন লোক দেখে বলে দিয়ে গেছে, তারা যা করবে তাই মানতে হবে। এ কারণে আমরা তাদের বাধা দিতে পারছি না। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষক মানুষ। আমাদের মানসম্মান আছে। মানসম্মান রক্ষার জন্য আমরা কিছু বলতে পারছি না। নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ থাকলেও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। শেষ সময়ে বেষ্টনী ছেড়ে একেবারে নির্বাচনী কেন্দ্রের সামনে ও ভেতরে প্রবেশ করেছেন বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। তবে এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানের সমর্থকদের সংখ্যাই বেশি দেখা গেছে। বিকেল তিনটার দিকে গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকার চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভোট কেন্দ্রে এমন দৃশ্য দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে সোয়া তিনটার দিকে ম্যাজিস্ট্রেটকে এসব বহিরাগত কর্মী-সমর্থকদের বের করে দিতে দেখা গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাশিতাতুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির কথা না থাকলেও আমরা অন্যান্যদের উপস্থিতি দেখেছি। যারা বাইরে থেকে এসেছিলেন তাদের বের করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয় সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাইরের লোকজন থাকার সুযোগ নেই। আমি বারবার ঘুরে ঘুরে দেখছি যেন কোনও বহিরাগত কেন্দ্রের ভেতরে আসতে না পারেন। 

হাড়িনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের গাড়ি নিয়ে সরাসরি কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলেও তারা এতে কর্ণপাত করেননি।  প্রায় সব কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আজমত উল্লাহর কর্মী-সমর্থকদের শোডাউন দেখা গেছে। কেন্দ্রের প্রবেশমুখে তার সমর্থকেরা ভোটারদের নৌকায় ভোট দিতে উদ্ভুদ্ধ করতে দেখা গেছে। তবে কোথাও জায়েদা খাতুনের সমর্থকদের চোখে পড়েনি। 

গাজীপুর সিটি করপোরেশন ভোট শুরু হয়েছে সকাল ৮টায়। এই সিটির নির্বাচন নিয়ে  দেশের মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল ছিল। সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কিন্তু যাদের জন্য এত আয়োজন, সেই ভোটারদের উপস্থিতি বেশিরভাগ কেন্দ্রেই ছিল কম। কোনো কোনো কেন্দ্রে একদমই ফাঁকা দেখা গেছে কয়েক ঘণ্টা ভোট পার না হতেই। এমনই একটা কেন্দ্র গাজীপুরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র।  বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে দেখা গেছে, কেন্দ্রটিতে একজনও ভোটার নেই। অথচ এই কেন্দ্রে মোট ভোটার তিন হাজার ৩০ জন। কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আশেক মোহাম্মদ বলেন, সকালে শুরুর দিকে কিছু ভোটার এসেছিল। এখন ভোটার নেই। বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত পড়েছে ২৫৮ ভোট। ভোটাররা ইভিএমে অভ্যস্ত না হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব ভোটার আসছেন, তাদের ইভিএমে ভোট দেওয়া শেখাতে হচ্ছে।  এ জন্য বিলম্ব হচ্ছে ভোট নিতে। সরেজমিন দেখা গেছে, শুধু ভোগড়া স্কুলই নয়; বেশিরভাগ কেন্দ্রে বেলা বাড়লেও ভোটার উপস্থিতি তেমনটা দেখা যায়নি। ভোগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে দেখা যায়, কেন্দ্রের সামনের মাঠ পুরো ফাঁকা। শুধু আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য বেশ কিছু বেঞ্চ পাতানো আছে। সেখানে আনসারেরও কেউ নেই। দু-তিনজনকে স্কুলের ভবনের নিচে ঘুরতে দেখা গেছে। তাদের গলায় নৌকার মেয়রপ্রার্থীদের ব্যাচ লাগানো। ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তার রুমে চুপচাপ বসে আছেন। অন্য বুথগুলোতে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছেন। আর পোলিং এজেন্টরাও নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় সময় কাটাচ্ছেন।ভোটারের খরার কথা স্বীকার করে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আশেক মোহাম্মদ বলেন, আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ভোটার আসবে ততক্ষণ আমরা ভোট নেব।

বেলা ১১টা ২০ মিনিটে জয়দেবপুর সরকারি বালিকা  উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুরুষ ভোট কেন্দ্র ছিল অনেকটা ফাঁকা।  এখানে এই সময়ে পুরুষের ১নং বুথে ভোট পড়েছে ৬৮টি, ২ নং বুথে ৬৪টি। মহিলাদের উপস্থিতি আরও কম। হোয়াটসঅ্যাপ তিন ঘন্টায় দুই নং বুথে ভোট পড়েছে ৩০ টি, ৩ নং বুথে ৩৩টি, ৬ নং বুথে ৩০টি। এই কেন্দ্রে টেবিল ঘড়ির কোনো এজেন্ট পাওয়া যায় নি।  বেলা ১১ টায়  গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র ছিল অনেকটা ভোটারহীন। এখানে ৩ ঘন্টায় প্রত্যেক বুথে ৩০ টি ভোট পড়েছে। ১ নং বুথে ৪৩টি, ২ নং বুথে ২৩টি, ৪নং বুথে ৩৩টি, ১০নং বুথে ১৯টি, ৭ নং বুথে ৩৪টি ভোট পড়েছে। এখানে টেবিল ঘড়ির কোনো এজেন্ট ছিল না।

সকাল পৌনে ১১টায় জয়দেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির দেখা মিলেনি। এখানে পৌনে তিন ঘন্টায়  মহিলাদের ১নং বুথে ভোট পড়েছে ১৩টি, ৫নং বুথে ১৯টি, ৬নং বুথে ১৮টি, ৭নং বুথে ২৩টি। 

সকাল সাড়ে দশটায় আজিম উদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে হাতে গোনা কিছু ভোটার দেখা গেছে।  তবে ভোট পড়েছে ধীর গতিতে।  আড়াই ঘন্টায়  মহিলাদের ৩নং বুথে ভোট পড়েছে ২৪টি, ৫নং বুথে ভোট পড়েছে ১৬টি। পুরুষের ৫নং বুথে ভোট পড়েছে ৩৬টি, ৬নং বুথে ৫৮টি, ৭নং বুথে ভোট পড়েছে ৪৫টি। এই কেন্দ্রেও টেবিল ঘড়ির কোনো এজেন্ট  পাওয়া যায় নি।  উপস্থিত কয়েকজন বলেছেন, সকালে টেবিল ঘড়ির এজেন্ট থাকলেও পরে তারা চলে যান। একই ভাবে হাতি প্রতীকের এজেন্টদের দেখা যায় নি। 

এদিকে নির্বাচনে টঙ্গীর ৭টি কেন্দ্রে নৌকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী টেবিল ঘড়ি ও হাতি প্রতীকের কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি। এই ৭টি কেন্দ্র হলোÍ রাইজিং সান একাডেমি কেন্দ্র, রেনেসাঁ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নারী কেন্দ্র, ন্যাশনাল প্রি-ক্যাডেট স্কুল কেন্দ্র, শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র, টঙ্গী দারুল এহসান মাদ্রাসা কেন্দ্র, টঙ্গী দারুস সালাম মাদ্রাসা কেন্দ্র ও সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র।এসব কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি থাকলেও ইভিএমে ভোটগ্রহণে ধীরগতি দেখা গেছে। সকাল ৮টা থেকে ২ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ১১ শতাংশ। ভোটারদের অভিযোগ, ভোটগ্রহণে সময় লাগছে। ধীরগতিতে চলছে ভোটগ্রহণ। রাইজিং সান একাডেমি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো দেলোয়ার হোসেন জানান, ২ ঘণ্টায় তার কেন্দ্রে ১০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৭০৩ জন। ২ ঘণ্টায় ভোট দিয়েছেন ১০৯ জন।  রেনেসাঁ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন জানান, এই কেন্দ্রে ২ হাজার ১৬ জন ভোটার আছেন। ২ ঘণ্টায় ৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এই কেন্দ্রটি নারী ভোটারদের জন্য এবং এখানেও ধীরগতি ভোটগ্রহণ চলছে। নারীদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ন্যাশনাল প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন জানান, ২ ঘণ্টায় সেখানে সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ ভোট পড়েছে। শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কক্ষের সামনে প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা থেকেও তাকে পাওয়া যায়নি। সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘টেবিল ঘড়ি ও হাতি প্রতীকের কোনো এজেন্টকে দেখিনি। তারা কেউ আমাদের কাছে আসেনি।’ ভোটগ্রহণে ধীরগতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সকালে মেশিনে সমস্যা হওয়ায় ভোটগ্রহণে ধীরগতি ছিল। এখন তা ঠিক হয়েছে। সকালের মতো দুপুরের দিকেও ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুরুষ ভোটারের থেকে নারী ভোটারের উপস্থিতি বেশি ছিল।

নির্বাচনে  মোবাইল ফোন নিয়ে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশে ভোটার  ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বাক বিত-া করতে দেখা গেছে। অনেক কেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে ভোটারদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে অনেকেই ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন।  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, মোবাইল ফোন নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া যাবে না। এমন নির্দেশনাই তাদের দেয়া হয়েছে। যারা মোবাইল ফোন নিয়ে এসেছে তাদের ফোন জমা রেখে কেন্দ্রে ঢুকতে হবে।  এমন নির্দেশনা নিয়ে জয়দেবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কথা বলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম।  তিনি বলেন, মোবাইল ফোন নিয়ে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করা যাবে না এটা ঠিক নয়। আমরা বলেছি, যারা  বুথে ভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন তারা মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে পারবেন না।  ভোটাররা মোবাইল ফোন নিয়ে বুথে যেতে পারবেন। তবে কোনো ছবি উঠাতে পারবেন না।  একই সাথে কারো কাছে ফোন করতে পারবেন না।  ভোটার উপস্থিতি একেবারে কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই এলাকাটি শ্রমিক বান্ধব। অনেকেই দেরি করে আসবেন। সময় বাড়ার সাথে সাথে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে বলে তিনি জানান। 

কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে না জানিয়ে জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন,  দুপুর পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় নি।  ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে তবে উপস্থিতি কম। 

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং সিস্টেমে ভোট দিতে এসে অনেকে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। নতুন এ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা না থাকায় ভোটগ্রহণে ধীরগতি হয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাররা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হরিনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে শফিকুর রহমান নামে এক ভোটার জানান, তিনি আগে কখনো ইভিএমএ ভোট দেননি। 

তার ভোট দিতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লেগেছে।  দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে হাড়িনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার হাসান ইমাম  বলেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনেকের আঙ্গুলের ছাপ মিলতে সময় লাগছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ