বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪
Online Edition

চলনবিল হতে পারে আকর্ষণীয় এক পর্যটন কেন্দ্র

রফিকুল আলম রঞ্জু পাবনা থেকে: দেশের উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদ চলনবিল। এই বিলটি হতে পারে আকর্ষণীয় এক পর্যটন কেন্দ্র। বিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট, তেমনি এর কিংবদন্তির ভা-ারও সুবিশাল। চলনবিলের জনপদের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত যে উপকথা তার হিসাব করা দুরূহ। এ অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে চলনবিল জাদুঘর। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুরের অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা মরহুম অধ্যক্ষ আবদুল হামিদের হাতে গড়া এই জাদুঘরটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে বেশ গুরুত্ববহ। এই জাদুঘরে আছে সুলতান কপ৬ ও ৮৮ নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কুরআন শরিফ। গাছের ছালে বাংলায় লেখা প্রাচীন পুঁথিসহ অসংখ্য সামগ্রী। প্রায় ৩৫০ বছর আগে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা ঘাসী-ই-দেওয়ানের তিসিখালীর মাজার। প্রতি শুক্রবার এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। এখানে রয়েছে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমানের মাজার। রায় বাহাদুরের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। দেশের বৃহত্তম গোবিন্দ মন্দির, কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমাম বাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদার বাড়ি ও হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির। এখানে আরো আছে রায়গঞ্জের জয়সাগর মৎস্য খামার, চাটমোহরের হরিপুরে লেখক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়াড়ীতে লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বাড়ি। চলনবিলের জনপদে রয়েছে প্রাচীন অসংখ্য মসজিদ, মন্দির, মাজার ও জলাভূমি। যেগুলো ঘিরে রয়েছে নানা ইতিকথা, বিশ্বাস ও উপাখ্যান। বিলপাড়ের তারাশ উপজেলার নবগ্রামে নওগাঁ শাহি মসজিদ (মামার মসজিদ) ও ভাগ্নের মসজিদ নামে দু'টি মসজিদ রয়েছে। মামার মসজিদটির পাশেই হযরত শাহ শরিফ জিন্দানির (রা:) মাজার। জনশ্রুতি আছে, জিন্দানি পীর ষোড়শ খ্রিষ্টাব্দে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য।

রাজা ভানসিংহের সময় এ দেশে তার আগমন হয়। রাজা ভানসিংহের পরিষদবর্গ ও তার ঠাকুরেরা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে খিড়কি পুকুরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন। এখনো ভানসিংহের খিড়কি পুকুরটি রয়েছে। মামার মসজিদের পাশে ভাগ্নের মসজিদ। জনশ্রুতি, পীরের কোনো এক ভাগ্নে তার মামার সাথে পাল্লা দিয়ে এক রাতে একটি মসজিদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্মাণের রাতেই ভাগ্নের মৃত্যু হয়। এ কারণে মসজিদের ছাদ দিয়ে যেতে পারেননি তিনি। এখনো সেই ছাদবিহীন মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে।

বিলপাড়ের চাটমোহরের হান্ডিয়ালে শেঠের বাঙ্গালা ও শেঠের কুঠি মীরজাফরের সহচর জগৎশেঠের বিশ্রামাগার ছিল। হান্ডিয়ালে রয়েছে বুড়াপীরের দরগা। শোনা যায়, ১২৯২ বাংলা সনে গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারি সার্ভেয়ার বুড়াপীরের নিষ্কণ্টক জমি বাজেয়াপ্ত করতে গিয়ে তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়াপীরের দরগায় গিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করলে সে যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। পর মাজার নয়া দিগন্ত কোহিত ডাকাত নামে চলনবিলে এক ডাকাত ছিল, যার কথা এখনো মানুষের মুখে রয়েছে। কথিত আছে, কোহিত ডাকাতকে আটকে রাখার সাধ্য কারো ছিল না। একবার পুলিশ তাকে ধরে ডা-া বেড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকায় করে কোহিত ডাকাতকে চলনবিলের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন কোহিত ডাকাত চলনবিলে একবার শুধু ডুব দিতে চেয়েছিল। ডুব দেয়ার পর পানির ভেতর দিয়ে কোহিত ডাকাত কোথায় যে হারিয়ে গেল, পুলিশ আর তার সন্ধান পায়নি। পুলিশের হাতে পড়েছিল শুধু ডা-া বেড়িটি। নিমগাছি হাটের পশ্চিমে জয়সাগর নামে এক বিশাল দীঘি রয়েছে। এই দীঘি নিয়েও প্রচলিত রয়েছে নানা উপকথা। রাজা অচ্যুত সেন এক যুদ্ধে জয়লাভ করে বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ জয়সাগর দীঘিটি খনন করেছিলেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে দীঘি খননের পরও দীঘিতে পানি ওঠেনি। এক রাতে রাজাকে এক সাধু স্বপ্নে দেখান, তার ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পর বাসর রাতে রাজকুমার সেই দীঘির মাঝখানে যেয়ে একমুঠো মাটি তুলে আনলে দীঘিতে পানি উঠবে। রাজপুত্র সেই অনুযায়ী শুকনো দীঘির মধ্যে গিয়ে একমুঠো মাটি তুলে পাড়ে নিয়ে আসার কালে চোক্ষের নিমিষে দীঘিটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তখন ওই দীঘির পানিতে ডুবে রাজপুত্রের মৃত্যু হয়। এরপর নববিবাহিতা রাজবধূও ওই দীঘির পানিতে প্রাণ বিসর্জন দেন। সেই রাজবধূর অভিশাপে ওই দীঘির পানি কেউ ব্যবহার করত না। এখন অবশ্য জামানা বদলেছে। দীঘিতে এখন মাছ চাষ করা হচ্ছে। চলনবিল ও এর পাশের এলাকার পর্যটনের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে গত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য কাজী গোলাম মোর্শেদ এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক হায়দার আলী 'তিসিখালী মাজার’ ঘিরে চলনবিলে একটি নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি আর আলোর মুখ দেখেনি। চলনবিল পাড়ের নটমন্দির, তারাশ কপিলেম্বর মন্দির, মামা-ভাগ্নের মসজিদ, আনুখার দীঘি, পাগলাপীর,বারুহাসের বাঙ্গালা, তিসিখালীর ঘাসি দেওয়ানের মাজার, চৌগ্রামের বুড়াপীরের মাজার, চাপিলার মসজিদ, পলশুরা পাটপাড়া মসজিদ, গুরুদাসপুর এলাকার নীলকুঠি নিয়ে কত যে ঐতিহ্য ও উপকথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তার হিসাব করা দুরূহ। 

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগে দেশের বৃহত্তম এই বিরল জলসম্পদ চলনবিলটি হয়ে উঠতে পারে এক আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ