ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2012, ১৫ আষাঢ় ১৪১৯, ৮ শাবান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition

নাট্যকার ড. আসকার ইবনে শাইখের ‘বিরোধ' নাটক

মাহমুদ ইউসুফ : বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক কালজয়ী নাট্য প্রতিভা ড. আসকার ইবনে শাইখ। বাংলা নাট্য আন্দোলন ও সংস্কৃতিকে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তিত্ব আসকার ইবনে শাইখ। বর্তমানকালে চারদিকে মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের যে বিপুল কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায় তাঁর প্রেক্ষাপট্ নির্মাণ করেছেন মরহুম আসকার ইবনে শাইখ। এই বরেণ্য নাট্যকার জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ৩০ মার্চ ময়মনসিংহে। ইন্তিকাল করেন ১৮মে ২০০৯, ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে। জীবনের বৃহত্তর অংশই তিনি ব্যয় করেছেন নাট্যশিল্পের উন্নয়ন কর্মে। শূন্যস্তর থেকে শুরু করে তিনি নাটককে মাথার মুকুটে পরিণত করেছেন। আজকে যারা বড় বড় নাট্যকার বনে গেছেন তারা সবাই-ই ড. শাইখের শিষ্য। হাতে কলমে তিনি নাটক শিখিয়েছেন নাট্যপিপাসুদের। তাই এদেশে নাট্য জনকের স্বীকৃতি তাঁরই প্রাপ্য। প্রখ্যাত নাট্য ও চলচ্চিত্র অভিনেতা ওবায়দুল হক সরকার তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার অভিধায় ভূষিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শতাধিক নাটক তিনি উপহার দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যকে। মঞ্চ, টেলিভিশন ও বেতার এ ত্রিক্ষেত্রেই তিনি সফল নাট্যকার। ঐতিহাসিক নাটক, সামাজিক নাটক এবং লোকজ ঐতিহ্যভিত্তিক নাটক নির্মাণে তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষতার পরিচয়বাহী। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল মামুন ১৯৮৯ সালে বিটিভির প্রতিষ্ঠাকালীন নাট্যকালচার নিয়ে লিখেছেন, ‘আসকার ইবনে শাইখ মূলতঃ আমাদের লোকজ ঐতিহ্য এবং খেঁটে খাওয়া মানুষদের জীবনযাপন প্রণালী নিয়ে নাটক লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য অবদান ফতেহ লোহানী, রাজ্জাক প্রমুখ অভিনীত নাটক ‘কারিগর' এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য নাটক ‘লালন ফকির'। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ দেশের দুই অংশের মধ্যে অনুষ্ঠান বিনিময় কার্যক্রম শুরু করলে ‘কারিগর' নাটকটি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের টিভি দর্শকদের মাঝে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলা টিভি নাটকের জন্য তাদের আগ্রহ এতই বেড়ে যায় যে, একপর্যায়ে আমাদের টেলিভিশন কেন্দ্র কর্তৃক প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটক তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান টিভি নেটওয়ার্কে প্রচার বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন থেকে শুরু করে আজ অবধি আমরা আসকার ইবনে শাইখের কাছ থেকে তাঁর নিজস্ব নাট্য বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ রকমারী নাট্যানুষ্ঠান পেয়ে আসছি।' ১

আসকার ইবনে শাইখের প্রথম নাটক ‘বিরোধ'। ১৯৪১ সালে লেখক প্রথম খসড়া রচনা করেন। অতঃপর নানা পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে ১৯৪৬ সালে সমাপ্ত এবং ১৯৪৭ সালে আবদুল হাই মাশরেকীর সহায়তায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।

প্রকাশক ঃ মোহাম্মদ আলী, সওগাত পাবলিকেশন্স, ২০৭ পার্ক স্ট্রীট, কলিকাতা।

প্রিন্টার ঃ আবদুল ওহাব, ক্যালকাটা আর্ট প্রিন্টার্স, ১১ ওয়েলসলী স্ট্রীট, কলিকাতা।

দাম ঃ পৌণে দুই টাকা।

নাটকটির ভূমিকা লিখেন কবি আহসান হাবিব। ভূমিকায় তিনি লিখেন, ‘বাংলার গ্রামজীবনের পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মামলা মোকদ্দমা; ফলে মৃত্যু, দারিদ্র, ধ্বংস-এর মূলে যে আভিজাত্যবোধ, যে স্বাতন্ত্র্যবোধ মানুষের মনে কাজ করে তাকে বিদ্রূপ না করে সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করেছেন লেখক। আধুনিক শিক্ষা ও আলোকপ্রাপ্ত তরুণ সমাজ এসেছে সেই আভিজাত্যবোধের মিথ্যা অহমিকাকে ভেঙ্গে দিতে বিদ্রূপ নিয়ে নয়। প্রীতি নিয়ে, প্রেম নিয়ে, শ্রদ্ধা নিয়ে। এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্যও লেখক ধন্যবাদের যোগ্য।' ২ পাকিস্তান আমলেই নাটকটির আটটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

স্কুল জীবন থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর ছিলো প্রচন্ড ঝোঁক। ১৯৩৫ সালে ঈশ্বরগঞ্জ শহরের চরনিখলা মধ্য ইংরেজি স্কুলে অধ্যয়নকালেই অভিনয়ের প্রতি নেশার সূচনা ঘটে। এ সময় সিরাজের স্বপ্ন, বন্দীবীর প্রভৃতি নাটিকায় অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৪১ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার পর অবসরে রচনা করেন তাঁর প্রথম নাটক ‘বিরোধ'। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘বাড়িতে এসেই আবার প্রবলভাবে আরম্ভ করে দিলাম আমার নাট্যচর্চা। আর তারই সঙ্গে তৈরি করে ফেললাম একটা মুসলিম সামাজিক নাটকের খসড়া, নাম ‘বিরোধ'। মনে পড়ে ‘বিরোধে'র খসড়া শেষ করেই প্রথমে শুনিয়েছিলাম আমার আম্মাকে। তিনি তেমন কিছুই বুঝতে পারেননি, কিন্তু তা যেন ছিলো আমার এক নতুন পথে যাত্রালগ্নে তাঁর কাছ থেকে দোয়া গ্রহণ।'৩

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সমাজ জীবনের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘বিরোধ'। গ্রামের দুটি পরিবারের মধ্যে আভিজাত্যবোধ, বংশগৌরব, মানমর্যাদা নিয়ে রেষারেষি, হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা নিয়ে নাটকের কাহিনী আবর্তিত। দুটি পরিবারের দুই কর্তা আহমদ ও আজিজের মধ্যেই মূল বিরোধ। আহমদ সাহেবের শেষ জীবন চরম দারিদ্রে্যর কষাঘাতে জর্জরিত। বসতভিটা ছাড়া সবকিছু নিলাম হয়ে যায়। সে নিলাম কিনে নেয় বাল্যবন্ধু অথচ বংশপরম্পরায় শত্রু আজিজ। আজিজ মিয়ার উচ্চ শিক্ষিত সন্তান আনোয়ার দুই পরিবারের মধ্যে সন্ধি ও শক্তি স্থাপনের জন্য নিজের বোন হাবিবার সাথে আহমদের ছোট সন্তান মাহবুবকে বিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে। ফলে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বনদ্ব সংঘাত দূর হয়। নাটকে আহমদ ও আজিজ চরিত্রই মুখ্য। দুটি চরিত্রই আত্মবিরোধিতায় জটিল। তারপরও দুজন সুবিবেচক। সহাভূতিশীল, স্নেহপরায়ণ। পক্ষান্তরে আহমদের পুত্রবধূ রাবেয়ার পিতা চৌধুরী সাহেব অভিজাত হয়েও স্বার্থপর, নীচমনা এবং পরশ্রীকাতর। তার চরিত্রহীন, শঠ, প্রতারক ছেলে বাদশা মিয়া আজিজ মিয়ার কন্যা হাবিবাকে বিয়ের জন্য মাহবুবকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু গ্রামবাসীদের অতর্কিত আক্রমণে বাদশা আহত হয়ে হাসপাতালে নীত হলে আহমদ পুত্র মাহবুব পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বক্ষণে বাদশা পুলিশকে মাহবুব নির্দোষ বলে জবানবন্দী দেয়। মানুষ যখন মৃত্যুমুখে পতিত হয় তখন স্বভাবতই সত্য বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। নাট্যকার সেই বিষয়টিকেই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। নাটকে বছির আর একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। ধূর্ত লোকটি ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে স্বার্থ হাসিল করে। সমাজে শান্তি-শৃক্মখলা বিঘ্নিতকরণে এরাই কাজ করে থাকে। আনোয়ার, মাহবুব, মকবুল, সোফিয়া ও হাবিবা নাটকের অপ্রধান চরিত্র। এরা সহজ সরল, মানবিক গুণে গুণান্বিত। ভালোবাসা, প্রেম প্রীতি, মায়া মমতা এসব চরিত্রের উপজীব্য ৪। বিগত ৬৫ বছর যাবত দেশে যেসব নাটক, চলচ্চিত্র নির্মিত ও প্রদর্শিত হয় তার সিংহভাগই এ ধারা আজও বহন করছে।

‘বিরোধ' নাটক প্রথম অভিনীত হয় ঈশ্বরগঞ্জে কালীবাড়ি মঞ্চে। নাট্যকার নিজেই সেখানে আহমদ সাহেবের চরিত্র রূপদান করেন। জাতীয়ভাবে ‘বিরোধ' প্রথম মঞ্চায়িত হয় ১৯৪৯ সালে ফজলুল হক মুসলিম হলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। নাটকটি নির্বাচন করেছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিলো ‘অল্পদিন হলো একজন মুসলমান নাট্যকারের একটা পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নাটক প্রকাশিত হয়েছে। আমি পড়েছি। বেশ ভালো নাটক, নাম ‘বিরোধ'। ওই নাটকটিই তোমরা মঞ্চস্থ কর।' ৫ নাটকের পরিচালনায় ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল হাই। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে কার্জন হলে স্টেজ বেঁধে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ড. শাইখ সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘নাট্যারম্ভে হলের প্রভোস্ট ডক্টর আবদুল হালিম মঞ্চে এসে হাতজোড় করে (আক্ষরিক অর্থেই) দর্শকবৃন্দের কাছে অনুরোধ জানালেন: এই প্রথম মুসলমান সমাজের উপর একজন মুসলমান নাট্যকারের পূর্ণাঙ্গ নাটক মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে। তাতে দর্শকদের চোখ-কানের অভ্যাসে হয়তো বিসদৃশ নাড়া লাগবে। তারা যেন ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি নিয়ে নাট্যাভিনয়ের পুরোটাই দেখে যান। অর্থাৎ বিরক্ত হয়ে চলে না যান।' ৬ তখনকার পুরনো প্রয়োগ-পদ্ধতিতে দৃশ্যপট পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় হতো। তারপরও চার ঘণ্টার নাটকে কেউ চলে যাননি। নিজেদের নাটক মনে করেই দর্শকরা উপভোগ করেছিলেন। পরের রাতের অভিনয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত ছিলো। তখনকার রীতি মোতাবেক ভালো অভিনয়ের জন্য পুরস্কার দেয়া হতো। সে রাতে পুরস্কারের জন্য বিচারক মন্ডলীতে ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। অধ্যাপক অজিতগুহ এবং বাগেরহাট থেকে বেড়াতে আসা মুনীর চৌধুরী। কাজী সাহেব তখন বিচারকদের সাথে নাট্যকার ড. শাইখকে পরিচিত করিয়ে দেন।

‘বিরোধ' নাটক বাস্তবিকই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। ‘বিরোধে'র মাধ্যমেই অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীর নাট্যাভিনয়ে হাতে খড়ি। এরাই পরবর্তীতে নাট্যাঙ্গনের নেতৃত্ব দেয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জহুরুল ইসলাম ‘বিরোধ' নাটক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দুবছর পরে জন্ম নেয় পাকিস্তান। বঙ্গদেশ হয় খন্ডিত। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র কলকাতা পড়ে ভারতে। আর পূর্ব বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় জেলা শহর ঢাকায়। আসকার ইবনে শাইখ তখন ছাত্র। অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি থিয়েটার যাত্রাও করতেন। চল্লিশের দশকের শেষভাগে তিনি রচনা করেন ‘বিরোধ' নামের একখানি সামাজিক নাটক। মুসলিম সমাজ-জীবনের একটি পূর্ণ চিত্র। নতুন নাট্যকারের প্রথম লেখা নাটক বলে ত্রুটি থাকা খুবই স্বাভাবিক এবং তা আছেও। তবুও স্থান-কাল-পাত্র-বিচারে এর গুরুত্ব অসীম। কারণ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাঙলার এটাই সেই নাটক যাতে চিত্রিত হয়েছে মুসলিম সমাজ জীবনের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্নার মর্মগাঁথা।---এ নাটকের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি একজন জীবনবোধসম্পন্ন নাট্যকারকে, যাঁর প্রায় প্রতিটি নাটকে পাওয়া যায় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি কান্নার কথা, যা বাস্তবের ছোঁয়ায় জীবন্ত।'৭

নাট্যকারের প্রকৃত নাম এম. ওবায়দুল্লাহ। সাহিত্যিক নাম আসকার ইবনে শাইখ। আসকার অর্থ নেতৃত্বদানকারী বা সেনাধ্যক্ষ। নাট্যকার রাজনীতির অঙ্গনের নেতা না হলেও সাংস্কৃতিক জগতে সিপাহসালার হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন। নাটকের ক্ষেত্রে তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন সফলভাবেই। নাটক রচনা, অভিনয়, নির্দেশনা, পরিচালনায় তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। তাই আমরা দেখি নামকরণের সাথে তাঁর নাট্যজীবনের অপূর্ব মিলন ও সমন্বয়। নন্দিত নাট্যাভিনেতা মরহুম ওবায়দুল হক সরকার লিখেছেন, ‘অধ্যাপক ড. আসকার ইবনে শাইখের রচিত নাটকের সংখ্যা সর্বাধিক। অর্ধশতাধিক (বর্তমানে ১২০টি) নাটক রচনা করে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর প্রথম নাটক ‘বিরোধ' মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৯ সালে ফজলুল হক (মুসলিম) হলের বার্ষিক নাট্যানুষ্ঠানে। মঞ্চসফল মুসলিম সামাজিক নাটক হিসাবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রাবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় বা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর নাটক বহুবার অভিনীত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তিনি বলিষ্ঠ নাট্যকার শুধু নন প্রতিভাদীপ্ত অভিনেতা এবং দক্ষ নাট্যপরিচালক রূপেও সমধিক প্রসিদ্ধ। সত্তর দশকে তাঁর বাড়িতে নাট্য একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে বহুজনকে নাট্যকলায় পারদর্শী করে তোলেন। মঞ্চ ছাড়াও বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর বহু নাটক বা সিরিজ অভিনীত হয়েছে। সেকালের সংস্কৃতি চর্চায় আসকার ইবনে শাইখের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।' ৮

আজ দেশব্যাপি যে নাট্যসংস্কৃতির মহাসমারোহ দেখা যায় এর ভিত্তি সৃষ্টি করে গেছেন আসকার ইবনে শাইখ। স্বউদ্যোগে এবং স্বহস্তে তিনি এদেশে নাট্যামোদীদের নাটক শিক্ষা দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। নাট্যমনা কর্মীদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসে হিরো বানিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ তারাই ড. শাইখের কীর্তিরাজিকে জাতির কাছে তুলে ধরতে নারাজ। এইসব ‘কীর্তিমান'রা তাদের জনক, তাদের পথ প্রদর্শক, তাদের শিক্ষাগুরুকে একেবারেই ভুলে গেছে। ভুলেও কেউ এ মনীষীকে স্মরণ করে না। মঞ্চ, বেতার, টিভি, পাঠ্যপুস্তক কোথাও ড. শাইখের স্বীকৃতি নেই। সকল সেক্টর থেকেই তথাকথিত প্রগতিবাদী, সোসালিস্ট ও সেক্যুলারিস্টরা বিশ্ববিখ্যাত এই নাট্যকারের অবদানকে একে একে মুছে দিচ্ছে। অথচ জাতীয় প্রয়োজনেই তাঁকে সামনের সারিতে নিয়ে আসা অতীব জরুরি। সকল শ্রেণীর সংস্কৃতিকর্মীদের এ বিষয়টি স্মরণে রাখা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. আসকার ইবনে শাইখের প্রকাশিত অন্যান্য রচনাবলী ঃ

ক) সামাজিক নাটক ঃ পদক্ষেপ (১৯৪৯), বিদ্রোহী পদ্মা (১৯৫০), মৃত্যু-ক্ষুধা (১৯৫১, জাতীয় কবির মৃতু-ক্ষুধা উপন্যাসের একাংশের নাট্যরূপ), দূরন্ত ঢেউ (১৯৫২), শেষ অধ্যায় (১৯৫৩), অনুবর্তন (১৯৫৩), বিল-বাওড়ের ঢেউ (১৯৫৪), এপার-ওপার (১৯৫৫), প্রতীক্ষা (১৯৫৬), প্রচ্ছদপট (১৯৫৮), দেওয়ানা মদিনা (১৯৬০), কবি চন্দ্রাবতী (১৯৬৫), লীলা-কঙ্ক (১৯৬৫), অতল সায়র (১৯৬৬), ইন্টারভিউ (১৯৮১), পদ্মগোখরা(১৯৮৮, জাতীয় কবির পদ্মগোখরা উপন্যাসের নাট্যরূপ), বয়াতীর ভিটা (২০০৬)

খ) ঐতিহাসিক নাটক ঃ অগ্নিগিরি (১৯৫৭), তিতুমীর (১৯৫৭), অনেক তারার হাতছানি (১৯৫৭), রক্তপদ্ম (১৯৫৭), টিপু সুলতান (১৯৫৮), কর্ডোভার আগে (১৯৫৯), লালন ফকির (১৯৫৯), তাহ্মিনা (১৯৬৮), অশ্রুনির্ঝর (১৯৬৮), প্রতিধ্বনি (১৯৮০), মহাবিজয় (১৯৮০), আক্রান্ত যখন (১৯৮০), রাজপুত্র (১৯৮০), রাজা-রাজ্য-রাজধানী: বাংলার হিন্দু যুগ থেকে খালজীদের নদীয়া বিজয় পর্যন্ত ১৪টি ঐতিহাসিক কাহিনীভিত্তিক এক নাট্য সঙ্কলন (১৯৮১), মেঘলা রাতের তারা: মুঘল যুগে সুবে বাঙলার ১১টি ঐতিহাসিক কাহিনীর নাট্য সঙ্কলন (১৯৮১), কন্যা-জায়া-জননী প্রথম খন্ড: ১২টি ঐতিহাসিক জীবনীমূলক নাট্য সঙ্কলন (১৯৮৭), কন্যা-জায়া-জননী ২য় খন্ড: ১৮টি ঐতিহাসিক জীবনীমূলক নাট্য সঙ্কলন (১৯৮৭), স্বপ্ন সোনারগাঁও (২০০৬)

গ) গীতিনাট্য ঃ চান্দের ভিটা (১৯৬১)

ঘ) কিশোর কাব্যনাটক ঃ দৃষ্টিফুল (১৯৬২), বাদুড় (১৯৬৩)

ঙ) অনুবাদ নাটক ঃ দন্তচাপ (১৯৬৪)

চ) টেলিভিশন নাটক ঃ একগুচ্ছ টেলিনাট্য (১২টি সামাজিক নাটকের সঙ্কলন) ঃ একটি পুরোনো বাক্স, সমান্তরাল, শিমুলতলী নাম, অপদার্থ, নিঃসঙ্গ নীলিমা, বকুলগন্ধ ভোর, আসামী, অশান্ত বায়ু, নদীতে নাইওরী নাও, শেষ রাতের ডাকগাড়ী, ছায়া-ছায়া পথ, রক্ত চাই (ষাট-সত্তর দশক); একগুচ্ছ টেলিনাট্য (৬টি ঐতিহাসিক নাটকের সঙ্কলন) ঃ মুক্তি অভিনব, বীরাঙ্গনা সখিনা, বেগম পরীবানু, এক সিংহের জাগরণ, বান্দা হাজির প্রভু, দান্তে কারবালা (আশির দশক); একগুচ্ছ টেলিনাট্য (৫টি সামাজিক নাটকের সঙ্কলন) ঃ ওস্তাগার, সূর্যমুখী, নাইটগার্ড, অসময়ে পরিচয়, শপথ নিলাম (ষাটের দশকে রচিত ও নববই দশকে প্রকাশিত); একগুচ্ছ টেলিনাট্য (৩টি সামাজিক টেলিনাট্য): পাগলা কানাই, কালু শাহ ফকীর, ফকীর পাঞ্জু শাহ (নববই দশকে প্রকাশিত)।

ছ) ঐতিহাসিক কাব্যনাট্যঃ মীরজাফরের পালা, দৌলত আলীর সন্তানেরা (নববই দশক)।

জ) সঙ্গীত ঃ নবজীবনের গান (১৯৫৯, দেশাত্মবোধক গানের সঙ্কলন সম্পাদনা)।

ঝ) গল্প ঃ কালো রাত তারার ফুল (১৮৫৭-৫৯ সালের মহাঅভ্যুত্থানের ১৪টি ঐতিহাসিক গল্পের সঙ্কলন)। এটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়।

ঞ) গবেষণা ঃ বাংলা মঞ্চ-নাট্যের পশ্চাতভূমি (১৯৮৬), বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ প্রসঙ্গে (১৯৯১)।

ট) ইতিহাস ঃ মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা (১৯৮৬), ক্রুসেডের ইতিবৃত্ত (১৯৯৪)।

ঠ) অনুবাদ ঃ বৈষয়িক উন্নয়নের গতিপথে (১৯৬৩), উত্তরণ (১৯৬৪) কাজের দিনের ভোর (১৯৬৫), মার্কিন পুঁজিবাদ (১৯৬৬), আমেরিকার অর্থনৈতিক সাধারণতন্ত্র (১৯৬৭)।

ড) অপ্রকাশিত রচনাবলি ঃ সপ্তডিঙ্গা মধুকর (৭টি কিশোর গীতি-নাট্য, নদী নিরবধি (৭টি সামাজিক নাটক), বাংলাদেশের উদ্ভব কথা, বাংলাদেশে ইসলামের উন্মেষ, পলাশীর পথে ও মীরজাফরী নবাবী এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধের সঙ্কলন প্রভৃতি।

১. বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর, রজত জয়ন্তী (১৯৬৪-১৯৮৯) উপলক্ষে বিশেষ সংকলন, ডিসেম্বর ১৯৮৯, পৃ ৭৩-৭৪

২. আসকার রচনাবলী ১, আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান সম্পাদিত, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯২, পৃ ৪

৩. আসকার রচনাবলী ১, আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান সম্পাদিত, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯২,  পৃ ১৬৩

৪. আসকার রচনাবলী ১, আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান সম্পাদিত, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯২,  পৃ ১৯১-১৯২

৫. আসকার রচনাবলী ২, আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান সম্পাদিত, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯২, পৃ ১৩৫

৬. ড. আসকার ইবনে শাইখ, বাংলা নাট্যের পশ্চাতভূমি, সাতরং প্রকাশনী, একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬, পৃ ৯৬

৭. আসকার রচনাবলী ১, আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান সম্পাদিত, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৯২,, পৃ ১৯২-১৯৩

৮. ওবায়দুল হক সরকার, সেকালে আমাদের নাট্যচর্চা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, সেগুনবাগিচা, রমান, ঢাকা-১০০০, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ