বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঈদুল ফিতরের বিধি বিধান

আলাউদ্দীন বিন সিদ্দীক : ‘ঈদ' ইসলামী পরিভাষার একটি শব্দ। আরবী ভাষায় ঈদ শব্দটি ‘এওদোন' শব্দ থেকে গৃহীত। এওদোন এর আভিধানিক অর্থ বার বার ফিরে আসা। ঈদ যেহেতু প্রত্যেক বছরেই ঘুরে ফিরে বার বার আসে এজন্য ঈদকে ঈদ বলা হয়। অভিধানে ঈদ শব্দের আরো যেসব অর্থ দেখা যায় তার মধ্যে একটা হলো ‘অত্যন্ত আনন্দ বা খুশি'। আরেক অর্থ পাওয়া যায় ‘খুশির দিন'। আসলে এ ধরনের একটা খুশির দিন দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম-সাধনা আর ত্যাগের-তিতিক্ষার পর অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। যে ঈদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাহ্র উদ্দেশে বিশেষ মেহমানদারীর জন্য নির্ধারিত। ইসলামী শরীয়াতে ঈদ বলতে শুধু ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহাকেই বুঝানো হয়। এছাড়া অন্যকোনো দিবসকে ঈদের দিন বলে আখ্যায়িত করা শরীয়ত পরিপন্থী। আর মুসলমানদের উৎসবের দিনও এ দুই ঈদ। যে ঈদে মুসলমানরা একত্রিত হয়ে আল্লাহর শোকর আদায়ের উদ্দেশ্যে দু'রাকাত ওয়াজিব নামায আদায় করে থাকে। এ দিনগুলোতে রোজা বা উপবাস জাতীয় কোনো ইবাদত করতে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

হাদীসের ভাষায় ঈদুল ফিতরের রাত্রিকে ‘লাইলাতুল জায়েজা' অর্থাৎ পুরস্কারের রাত্রি বলা হয়। এই ঈদ উপলক্ষে ফেরেস্তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন পুরস্কারের কথা বিশেষ করে তার দয়া, মেহেরবানী এবং ক্ষমাকে স্মরণ করিয়ে তার দিকে ফিরে আসার জন্য আহবান করতে থাকে, আর আল্লাহও তার বান্দাহদের যে যতটুকু পাওনা তার চেয়ে বেশি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। ইবনে আববাসের রা. বর্ণনায় হাদীসের এক রেওয়ায়েতে এসেছে, ঈদুল ফিতরের রাত্রি আগমন করলে (আসমানে) তার নাম ‘লাইলাতুল জায়েজা' অর্থাৎ পুরস্কারের রাত্রি বলে ঘোষণা করা হয়। আর ঈদের দিন সকালে হক্ব তায়ালা শানুহু ফেরেস্তাগণকে সমুদয় শহরগুলোতে প্রেরণ করেন। তারা জমিনে অবতরণ করে সমস্ত অলিগলি ও রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে যান। এবং এমন আওয়াজে আহবান করতে থাকেন যা জ্বীন, ইনসান ছাড়া সমস্ত মাখলুক শুনতে পায়, ‘হে মুহাম্মাদ সা.-এর উম্মত! ওই দয়ালু রবের দরবারের দিকে প্রত্যাবর্তন কর যিনি অনেক বেশি দান করনেওয়ালা এবং অনেক বড় বড় অন্যায়সমূহকে মাফ করনেওয়ালা' তারপর লোকেরা যখন ঈদগাহের দিকে রওয়ানা হয় তখন আল্লাহ্ তায়ালা ফেরেস্তাগণকে জিজ্ঞেস করেন, যে মজদুর স্বীয় কাজকে পরিপূর্ণরূপে সমাধা করেছে তার প্রতিদান কী? ফেরেস্তারা আরজ করেন, হে আমাদের মাবুদ এবং আমাদের মালিক! তার প্রতিদান তো এটাই যে, তার মজদুরি পুরোপুরি দান করা হয়, তখন হক্ব তায়ালা ইরশাদ করেন। হে ফেরেস্তাগণ! তোমরা সাক্ষী থাক আমি তাদেরকে রমজানের রোজা ও তারাবীর বিনিময়ে আমার সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত দান করলাম। এবং বান্দাহ্গণকে সম্বোধন করে ইরশাদ করতে থাকেন, হে আমার বান্দাহ্গণ। আমার নিকট চাও আমার ইজ্জতের ক্বসম, আমার মর্যাদার ক্বসম অদ্যকার এই সমাবেশে আখেরাতের ব্যাপারে আমার নিকট যা কিছু চাইবে তাই দান করব। আর দুনিয়ার বিষয়ে যা সওয়াল করবে তাতে তোমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখব। আমার ইজ্জতের ক্বসম যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমায় খেয়াল রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের অন্যায়সমূহকে গোপন রাখব। আমার ইজ্জত ও মর্যাদার ক্বসম! তোমাদেরকে (কাফিরদের) সম্মুখেও অপদস্থ করব না। এখন তোমরা সম্পূর্ণ নিাপ অবস্থায় গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। তোমরা আমাকে রাজি করেছ। আমিও তোমাদের প্রতি রাজি হয়ে গেলাম। অতএব, ফেরেস্তাগণ ইফতারের দিনগুলোতে (রমযানে) এই উম্মতের যে আজর ও সাওয়াব লাভ হয় তা দেখে খুশি ও আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে।

এ হাদীসখানা শুনার পর আবেগে কে না উদ্বেলিত হবে। কোন সে অকৃতজ্ঞ যে শোকরিয়ার সিজদায় মাটিতে লুটিয়ে না পড়বে। কার এমন পাথরি চোখ টপ টপ করে যার অশ্রু না ঝরবে। প্রকৃতপক্ষে আমরা এমন কী কষ্ট করছি যার বিনিময়ে যাই চাইব তাই পাইব। আসল কথা হলো, যিনি আমাদের স্রষ্টা তিনি পরম করুণাময় অসীম দয়ালু, এটা তারই সাক্ষ্য।

ঈদের দিনের সুন্নাতসমূহ

১. শরীয়াতের সীমার মধ্যে থেকে সাধ্যমতো সাজগোজ করা। আজ আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, যেকোনো কাজে একটু সুযোগ পেলেই সীমাতিরিক্ত করে ফেলি। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের একটা স্বকীয়তা আছে। আমরা এ ব্যাপারেও এমন বাড়াবাড়ি করি যে, তালগোল পাকিয়ে সব নিজের মনমতই করি। মোটেও চিন্তা করি না আসলে কি তখন তার আর ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে কিনা। ২. গোসল করা ৩. মিসওয়াক করা ৪. যথাসম্ভব উত্তম বস্ত্র পরিধান করা ৫. সুগন্ধি লাগানো ৬. অতি প্রত্যুষে বিছানা হতে উঠা ৭. ফজরের নামাজের পরপরই সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া ৮. ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে খুরমা অথবা কোনো মিষ্টান্ন আহার করা ৯. ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে ছদকায়ে ফিতরা দিয়ে দেয়া ১০. ঈদের নামায মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে পড়া অর্থাৎ বিনা কারণে মসজিদে না পড়া ১১. ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করা অন্য রাস্তায় প্রত্যাবর্তন করা ১২. ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া ১৩. ঈদগাহে যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে নিম্নলিখিত তাকবীর পড়া ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ'।

ঈদের নামাজের নিয়ম

নিয়ত : আমি ইমামের পিছনে ক্বিবলামুখী হয়ে ঈদুল ফিতরের দু'রাকাত নামাজ ছয়টি ওয়াজিব তাকবীরের সাথে পড়তেছি, এরূপ নিয়ত করে ‘আল্লাহু আকবার' বলে হাত তুলে তাহরীমা বাঁধবে। তারপর ছানা (ছুবহানাকাল্লাহুম্মা...) পুরা পড়বে। এরপর আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ্র আগে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার' বলে তাকবীর বলবে। প্রথম দু'বার কান পর্যন্ত হাত উঠায়ে ছেড়ে দিবে। কিন্তু তৃতীয়বার বলে হাত বেঁধে নিবে। প্রত্যেক তাকবীরের পর তিনবার সুবহানাল্লাহ বলা যায় পরিমাণ থামবে। তারপর আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ্ পড়ে সূরায়ে ফাতেহার পরে একটা সূরা মিলাবে। এরপর রুকু, সিজদাহ করে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবে। এবার অন্যান্য নামাজের মতো বিসমিল্লাহর পরে সূরা ফাতেহা পড়ে আরেকটা সূরা মিলাবে। তারপর তিনবার ‘আল্লাহু আকবার' বলার মাধ্যমে তিনটা তাকবীর সম্পন্ন করবে। এখানে প্রতি তাকবীরের পর হাত ছেড়ে দিবে। চতুর্থবার ‘আল্লাহু আকবার' বলে হাত না বেঁধে রুকুতে চলে যাবে। এরপর সেজদা এবং আখেরী বৈঠক করে যথারীতি সালাম ফিরায়ে নামাজ শেষ করবে।

ঈদুল ফিতর সম্পর্কীয় মাসায়েল

 ইমাম সাহেব জুমার মতো দু'টি খুতবা দিবেন। তবে জুমার খুতবা দেয়া ফরজ আর ঈদের খুতবা দেয়া সুন্নত কিন্তু ঈদের খুতবা শুনা ওয়াজিব। ওই সময় কথাবার্তা, চলাফেরা ইত্যাদি যেকোনো কাজ নিষেধ।

 ঈদের নামাজের পূর্বে মহিলা হোক কিংবা পুরুষ, বাড়িতে কিংবা মসজিদে অথবা ঈদগাহে নফল নামাজ পড়া মাকরূহ।

 সম্ভব হলে এলাকার সবাই এক স্থানে একত্রে পড়া উত্তম। তবে কয়েক জায়গায় পড়াও জায়েজ।

 ঈদের নামাজ না পড়তে পারলে কিংবা নামাজ নষ্ট হয়ে গেলে তার কাজা করতে হবে না, যেহেতু ঈদের নামাজের জন্য জামায়াত শর্ত। তবে বেশকিছু লোকের ঈদের নামাজ ছুটে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে তারা অন্য একজনকে ইমাম বানিয়ে নামাজ পড়তে পারবেন।

 ১ শাওয়ালের দ্বিপ্রহরের পূর্বে শরীয়তসম্মত কোনো কারণে ঈদের নামাজ না পড়তে পারলে শাওয়ালের ২ তারিখে পড়ার অনুমতি আছে। এরপর পড়া যাবে না।

 কেউ ইমাম সাহেবকে দ্বিতীয় রাকাতে পেলে সালামের পর যখন উক্ত ব্যক্তি ছুটে যাওয়া রাকাতের (প্রথম রাকাত) জন্য দাঁড়াবে তখন প্রথমে ছানা (ছুবহানাকাল্লাহুম্মা...), তারপর আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ পড়ে ফাতেহা ও ক্বিরাতের পর রুকুর পূর্বে তাকবীর বলবে। ফাতেহার আগে নয়।

 ইমাম তাকবীর ভুলে গেলে রুকুতে গিয়ে বলবে, রুকু ছেড়ে দাঁড়াবে না। তবে রুকু ছেড়ে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলে আবার রুকুতে গেলেও নামাজ নষ্ট হবে না। বেশি লোক হওয়ার কারণে সহুসিজদাহ্ও দিতে হবে না।

 কোনো লোক যদি ইমাম সাহেবকে তাকবীর শেষ হওয়ার পরে পায় সে তাকবীরে তাহরীমা বেঁধে প্রথমে ওয়াজিব তিন তাকবীর বলে নিবে। আর রুকুতে পেলে যদি দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, তাকবীর বলেও ইমাম সাহেবকে রুকুতে পাবে তাহলে তাহরীমা বেঁধে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলে নিবে, তারপর রুকুতে যাবে। আর দাঁড়িয়ে তাকবীর পড়তে পড়তে ইমাম সাহেবকে রুকুতে না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাহরীমা বেঁধে রুকুতে চলে যাবে এবং রুকুর তাসবীহ না বলে প্রথমে তাকবীর বলে নিবে, রুকুতে তাকবীর বলার সময় হাত উঠাবে না, এবং সময় পেলে রুকুর তাসবীহ পড়বে, না পেলে না পড়বে। আর তাকবীর শেষ করার পূর্বেই যদি ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলেন তাহলে মুক্তাদিও তুলে ফেলবে। তাকবীর বাকি থাকলে তা ক্ষমাযোগ্য।

শেষ কথা : ঈদ মানে খুশি তা ঠিক। তার মানে এ নয় যে খুশিতে আত্মহারা বা আত্মভোলা হয়ে যাওয়া। বাস্তবে কিন্তু তাই দেখা যায়। ঈদে খুশি প্রকাশ করা বিধর্মীদের সংস্কৃতি অনুসরণ করে এর চেয়ে বড় বোকামি আর কী হতে পারে। চরম লজ্জাজনক বৈকি। এ ধরনের আচরণে মনে হয় ইসলামে আনন্দ বিনোদন বলতে কোনো প্রক্রিয়াই নেই। আসলে কি তাই! ইসলাম শান্তির বিধান। উচ্ছৃক্মখলতা, বেহায়াপনাকে ইসলাম কোনোক্রমেই প্রশ্রয় দেয় না। যারা অতি উৎসাহী ইসলামের মর্ম বুঝে না বলে এ ধরনের বোকামি তাদের দ্বারাই সম্ভব। রমযান মাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, তারাবীহ এবং তাসবীহ-তাহলীলে যাদেরকে দেখা যেত ভিন্ন আকৃতিতে, ঈদের পরে তাদের দেখা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত। কী প্রয়োজন ছিল এ ধরনের সাময়িক ধার্মিতার কিংবা বকধার্মিতার। চিন্তা করা দরকার আদৌ এ ধরনের খুশি পালন করে আমরা কতটুকু লাভবান হলাম। পরিসরের স্বল্পতার কারণে আজ আর নয়। অতএব এই কামনা করে শেষ করছি, আসন্ন মোবারক ঈদ বয়ে আনুক আমাদের সকলের জীবনের নির্মল আনন্দ এবং সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ