॥ এ্যাডভোকেট আবু হাসিন ॥

চামড়া শিল্প খুব সম্ভাবনাময় শিল্প। কিন্তু সরকার সহ সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা, একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির অতিমুনাফাখোরী ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ শিল্প এখন অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ফলে দেশের চামড়ার বাজারে নৈরাজ্য কোন ভাবেই থামছে না বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। একথা কারো অজানা নয় যে, আমাদের দেশে ঈদুল আযহার সময় বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হলেও গত কয়েক বছর ধরে বাজারে ধারাবাহিক দরপতন দেখা যাচ্ছে। আর এ পতনটা রীতিমত পরিকল্পিত বলেই মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। যা এ অতিসম্ভাবনাময় শিল্পকে একেবারে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদের অভাব, ট্যানারি মালিকদের মূলধন সঙ্কট এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া কারসাজি-এসব কারণেই চামড়া শিল্পে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এছাড়াও রয়েছে নানাবিধ কারণ। ফলে এ শিল্প কোন ভাবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না।

এক্ষেত্রে এক বা একক নয় বরং নানাবিধ কারণ। প্রথমত, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডাব্লিউজি) সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চামড়া বা চামড়াজাত পণ্য কিনছে না। সঙ্গত কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত, ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ও কাক্সিক্ষত ঋণ পান না এবং আড়তদারদের পুরনো বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় বাজারে নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনার আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে দিনের পর দিন। তৃতীয়ত, সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের একটি সিন্ডিকেট মৌসুিম ব্যবসায়ীদের আর্থিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনে থাকে। এতে সাধারণ বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসানের শিকার হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ সামগ্রী তথা লবণ ও কেমিক্যালের উচ্চমূল্য চামড়া সংরক্ষণের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবাদিপশুর ল্যাম্পি স্কিন রোগ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতার কারণে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চামড়া শিল্পের সঙ্কট কাটানো সম্ভব নয়। তাই এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অতিদ্রুততার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হলেও নেই কার্যকর তা নেই।

ফলে দেশে চামড়ার বাজার বেশ কয়েক বছর ধরেই নেতিবাচক বৃত্তেই রয়ে গেছে। এবারের ঈদে সে অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর মনে করা হয়েছিলো যে, এবার হয়তো অতীত বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসা যাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে হতাশই হতে হয়েছে। কারণ, পুরনো অবস্থার কোন ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। ফলে চামড়া কেনার ব্যাপারে কারো তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। মূলত, দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম ঊর্ধমুখী হলেও কাঁচা চামড়ার দাম একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। বাজারে পর্যাপ্ত চামড়া থাকলেও ক্রেতা একেবারে নেই বললেই চলে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মে সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হলেও চামড়ার বাজারে তীব্র মন্দা, স্থবিরতা ও নৈরাজ্য আগের মতই রয়ে গেছে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে আরো অবনতিই হয়েছে। বিক্রেতারা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অবিক্রিত চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা ও বর্জের স্তুপে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আড়তদারদের সিন্ডিকেট, দালাল ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের কারণে মাঠপর্যায়ে চামড়ার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন মৌসুমি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বরাবরই উদাসীন।

রাজধানীর পোস্তগোলা, লালবাগ ও আমিনবাজারসহ বিভিন্ন চামড়ার আড়ত ঘুরে এসে সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে এলেও ক্রেতাদের তেমন আগ্রহ নেই। বাজারে চামড়ার ব্যাপক সরবরাহ থাকার পরও বেচাকেনায় দেখা দিয়েছে চরম ধীরগতি। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সমন্বিত সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে কৃত্রিমভাবে এ দরপতন ঘটানো হয়েছে। লোকসান এড়াতে লবণযুক্ত চামড়ার পাশাপাশি কাঁচা চামড়ারও সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে আড়তদাররা সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তীব্র পুঁজি সংকটের কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আগের বকেয়া টাকা না পাওয়ায় তারা কাক্সিক্ষত মূল্যে চামড়া কিনতে পারছেন না। ফলে বিষয়টি নিয়ে রীতিমত ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে চামড়ার বাজারে এমন টানা মন্দা ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকেরা। কাঁচা চামড়া দ্রুত লবণজাত করা না হলে এ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু এ বিষয়ে কারো কোন দায়িত্ব বা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে চামড়ার মত সম্ভাবনাময় শিল্প এখন মুখ থুবরে পড়তে শুরু করেছে।

মূলত, আমাদের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী ও সম্ভাবনাময় খাত হলো চামড়া শিল্প। পর্যাপ্ত কাঁচামালের সহজলভ্যতা, সস্তা শ্রম এবং বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকায় এ খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে। মূলত, প্রতি বছর ঈদুল আযহায় বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করার সুযোগ থাকে,যা এ শিল্পের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম। কাঁচা চামড়া রপ্তানি না করে তা থেকে জুতা ও ফ্যাশনেবল চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করা গেলে বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। দেশে পর্যাপ্ত দক্ষ ও সস্তা শ্রমশক্তি রয়েছে,যা জুতা ও পণ্য তৈরির কারখানার পরিচালন ব্যয় কমাতে সাহায্য করে। একই সাথে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ঊট) এবং আমেরিকায় চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ খাতে বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব (খডএ সনদপ্রাপ্ত) করে গড়ে তোলা জরুরি। সাধারণ চামড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড অনুযায়ী মানসম্মত পণ্য বা ডিজাইন তৈরি করতে পারলে বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা যাবে।

চামড়া শিল্প আমাদের দেশের অতি সম্ভাবনাময় শিল্প। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাব, সংশ্লিষ্টদের উদাসীন ও অসাধু ব্যক্তিদের সিন্ডিকেটের কারণে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর এরাই পরিকল্পিতভাবে চামড়ার দরপতন ঘটিয়ে অপার সম্ভবনাকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু সরকার অজ্ঞাত কারণে এদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ ও যুতসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে চামড়া শিল্প হারাতে বসেছে অতীত ঐতিহ্য।

এমতাবস্থায় দেশের চামড়াশিল্পকে বাঁচাতে এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো সবার আগে চিহ্নিত করে সেসব সমাধানের জন্য গ্রহণ করতে হবে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাঙতে হবে অসাধু সিন্ডিকেট। দেশে বেশি বেশি চামড়া ভিত্তিক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদাকার শিল্প স্থাপন করে বাড়াতে হবে চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদান। এতে যেমন বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, ঠিক তেমনিভাবে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও হবে সমৃদ্ধ। নামমাত্র মূল্যে বিদেশে কাঁচা চামড়া রপ্তানী না করে প্রক্রিয়াজাত করতে নিতে হবে জরুরি পদক্ষেপ। তাহলেই এ শিল্পের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরে আসবে। অন্যথায় এ শিল্পের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।